নীলু ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
না কেন বললে? তুমি কি খুবই নিষ্ঠুর?
তুই যদি আমাকে নিষ্ঠুর মনে করিস, তাহলে আমি নিষ্ঠুর। আমি তোর মায়ের কাছে যাব না। মা জানুক যে একদিন মেয়েটা বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছে। মায়ের মনে এই হারানোর ছবিটাই থাকুক। যুদ্ধের সময় এমন অনেক কিছুই ঘটে। মেয়েটি নির্যাতিত হয়েছে, খুন হয়েছে—এত কিছু তাকে আর জানানোর দরকার নাই। তাঁর বুকের বোঝা বাড়িয়ে লাভ কী?
প্রথমে সব মেয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর একে একে ওরা বলে, আমাদের মায়েরা শান্তিতে থাকুক। আমাদের মায়েরা শান্তিতে থাকুক।
কয়েকটি কথামাত্র, কিন্তু গানের মতো ছড়ায়।
পরক্ষণে সেটা আর গানের মতো থাকে না। আর্তচিঙ্কার হয়ে ধ্বনিত হয়—মায়েদের ধোকা দেওয়া যাবে না। মায়েদের বুকের মধ্যে যন্ত্রণা পাথর হয়ে গেছে। বিশাল পাথর। ওই পাথর কেউ নাড়াতে পারবে না। দেশ স্বাধীন হলে পাথরটা একটু নড়বে মাত্র। কিন্তু থাকবে সারা জীবন। মৃত্যু পর্যন্ত।
গমগম করে পুলিশ লাইনের ব্যারাকের বারান্দা। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা মেয়েদের বুকের ভেতরও দম আটকানো পাথরখণ্ড পৃথিবীর যাবতীয় অনুভব আড়াল করে রেখেছে। মৃত্যু ছাড়া আর কোনো চিত্র ওদের সামনে নেই।
তখন ওদের জন্য খাবার আসে। বালতিভর্তি ভাত আর ডাল। ক্যানটিনের লোকেরা খাবার রেখে চলে যাবে। ওদেরকে ভাত খাওয়াতে হবে রাবেয়ার। এখানে আসার পর থেকে ওরা শুধু ভাত আর ডাল খাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মাছ বা মাংস আসে। কখনো তরকারি। তার পরও ওরা হাপুস-হাপুস খায়। যদি বেঁচে থাকতে হয়, তাহলে তো ওদের খেতেই হবে।
ভাত-ডালের বালতি দেখে ওরা চোখ বড় করে বলে, খালা, ভাত এসেছে। আমরা এখানে বসেই ভাত খাব। খুব খিদে পেয়েছে।
ক্যানটিনের মকবুল আর জয়নালের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া আবার বারান্দার রেলিংয়ে মাথা ঠেকায়। মাথা উঁচু করে রাখে। ওদের দেখবে না বলে ওর এই ভঙ্গি।
মকবুল দাঁত কিড়মিড় করে বলে, কী হলো তোমার, এমন করে বসে আছ যে? ওদেরকে ভাত দাও।
ভাতের যা ছিরি। এগুলো মানুষে খায়?
মানুষ খায় না। বেশ্যারা খায়। তুমিও একটা বেশ্যা।
শুয়োরের বাচ্চা, তোর মাথা আমি ফাটিয়ে ফেলব। বেশি বাড় বেড়েছে তোর!
বেশি কথা বললে অফিসারের কাছে তোর নামে নালিশ দেব। তখন বুঝবি ঠেলা।
তুই এখান থেকে যা, মকবুল। আমাকে রাগাস না। তুই ওদেরকে বেশ্যা বলেছিস। এর শোধ আমি উঠাব।
ছাতু করবি। ওদেরকে ভাত-ডাল দে। ওদের জন্য আমাদেরও বুক ভেঙে যায়। কিন্তু কিছু করতে পারি না। একদিন যে ভাগব এখান থেকে, তা-ও পারি না। বুড়া মা যে বিছানায় পড়ে আছে। দেখার তো কেউ নাই। আমি আর বউ ছাড়া।
মকবুলের কথা শুনে ওদের হাত থেমে থাকে।
খুরশিদা মৃদুস্বরে বলে, মকবুল ভাই, আমরা আপনার দুঃখ বুঝি। খাবার নিয়ে আসলে আপনি আমাদের দিকে তাকান না।
মকবুল নিজের চোখ মুছে বলে, আমি যাই। ক্যানটিনের ম্যানেজারকে বলব, কালকে আপনাদেরকে মুরগির মাংস দিতে।
আপনি বললে বকা খাবেন। দরকার নাই বলার।
সব শুয়োরের বাচ্চা। কোনো কোনো বাঙালি কুত্তা আছে ওদের সঙ্গে। ওগুলোও কম শয়তান না। আমি যাই।
মকবুল আর জয়নাল বালতি হাতে ওঠায়। দুজনেই বাম হাতে চোখ মোছে। যাবার আগে মৃদুস্বরে মকবুল বলে, যাই রে রাবেয়া বেশ্যা। রাতে আবার দেখা হবে। রাতে চিচিঙ্গা ভাজি দেবে। আর ডাল। আর বস্তাপচা চালের ভাত। এই বোনেরাও ওদের কাছে আলু। পচবে তো ফেলবে। ফ্রেশ থাকবে তো রাঁধবে।
চলে যায় দুজনে। ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে সবাই। কারও হাত নড়ে না। দেখতে পায়, সিঁড়ির মাথায় গিয়ে ওরা পেছন ফিরে তাকায়। এবং নেমে যায়।
ওরা আবার নিজেদের জগতে ফিরে আসে। থালার মধ্যে হাত ধুয়ে কাছে রাখা বড় গামলায় পানি ফেলে। বারান্দাজুড়ে মুখরিত হয় সময়। নানাজনে নানা কথা বলে, দেখ দেখ, কতগুলো কাঁচা মরিচ দিয়েছে। কী সুন্দর লাগছে দেখতে।
দেখ দেখ, লেবুর টুকরোও দিয়েছে আজ। ডালের সঙ্গে লেবু চিপে ভাত খেলে খুব মজা লাগবে। কাঁচা মরিচ তো এখানে চোখেই দেখিনি। আজ দারুণ হবে খাওয়াটা।
মেয়েরা ততক্ষণে নিজেদের থালা ধুয়ে ভাত নেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল।
রাবেয়া নীলুকে বলে, সবার থালায় তুই ভাত দে, নীলু। আজ আমি কিছু করতে পারব না।
নীলু হিহি করে হাসতে হাসতে বলে, মকবুল ভাই আমাদেরকে বেশ্যা বলেছে তো কী হয়েছে? আমরা কিছু মনে করি না। দেশের স্বাধীনতার জন্য বেশ্যা হতে আমার একটুও খারাপ লাগবে না, খালা। তুমি মন খারাপ করছ কেন? রোজকার মতো তুমিই সবার থালায় ভাত-ডাল দাও।
হিহি করে হাসে অন্য সবাই। মাথা দুলিয়ে বলে, আমরা কিছু মনে করি, আমরা কিছু মনে করি না। ভাত-ডাল চাই। ভাত-ডাল চাই। কাঁচা মরিচলেবু চাই।
ওদের দিকে তাকাতে পারে না রাবেয়া। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের প্রাঙ্গণজুড়ে অন্ধকার নেমে আসে ওর সামনে। পরক্ষণে ওর মাথায় টুং করে শব্দ হয়। বুঝতে পারে, মকবুল ওর রাগের কথা বলেছে। বেশ্যা বলে ও নিজের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছে। আজকের কাঁচা মরিচ আর লেবুর ব্যবস্থা ও করেছে। ক্যানটিন থেকে আনেনি। ক্যানটিন থেকে এসব দেওয়া হয় না মেয়েদের। ওর সামনে থেকে অন্ধকার কাটে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাকের বারান্দা আলোয় ভরে যায়।
তখন সকলের অজান্তে ঝুলিয়ে রাখা আরেকটি মেয়ে মারা যায়। ও নিজের কথা নিজেই বলতে থাকে, আমি মরে গেছি। এই মৃত্যু আমার শান্তি। যে নির্যাতন আমার শরীরের ওপর দিয়ে গেছে, তা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য থাকুক। যেদিন দেশ স্বাধীন হবে, সেদিনও আমি বলব, আজ আমার শান্তি। আমার মৃত্যু স্বাধীনতার জন্য। শান্তি শান্তি।
