রাবেয়া ওর দুপা বারান্দায় ছড়িয়ে দেয়।
যে পাঞ্জাবি সেনারা এই সব ঘরের পাহারায় থাকে, তারা এখন কেউ নেই। ক্যানটিনে গেছে চা খাবে বলে। রাবেয়া ওদের কাছে শুনেছে, সাফিনা অফিসারের সঙ্গে বেয়াদবি করেছে। তার মুখে খামচি দিয়েছে। সে জন্য এই শাস্তি।
রাবেয়া পা গুটিয়ে নেয়। হাঁটুর ওপর মাথা রাখে। আবার মাথা তোলে। ভাবে, ওরা মেয়েদের ওপর দিয়ে যুদ্ধের শোধ ওঠাচ্ছে। বাঙালিকে স্বাধীনতার সাধ বোঝাচ্ছে। ও আবার পা মেলে দেয়। ইচ্ছে হয়, এই পা দিয়ে সেনাদের কাউকে কষে লাথি দিতে।
ঘরের ভেতর থেকে কান্নার ধ্বনি আসে। কিন্তু যে ঘর থেকে কান্নার শব্দ আসছে, সে ঘরে তালা দিয়ে রেখেছে সেনারা। ওরা জানে, এই সব মেয়ে এখান থেকে পালাতে পারবে না। তার পরও।
ও দরজার গায়ে মুখ লাগিয়ে বলে, কাঁদবেন না। আপনাদের কিছু লাগলে আমাকে বলেন। আমি সুইপার। তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, আমি আপনাদেরই একজন। আমাকে বিশ্বাস করেন।
আমি মায়ের কাছে যেতে চাই। আপনি আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দিন।
ঘরের ভেতর থেকে ভেঙে ভেঙে শব্দ আসে। কিছু শব্দ স্পষ্ট, কিছু অস্পষ্ট। সব মিলিয়ে রাবেয়া বুঝে নেয়। আসলে বোঝার কিছু নেই। ও তো অনবরত এই একই কথা শুনে আসছে। সেই পঁচিশের রাত থেকে। মেয়েরা মায়ের কাছেই যেতে চায়। প্রথমে এই কথাটি বলে, একটা কিছু অস্ত্র পেলে এদের একটাকে শেষ করতে চাই। আমি কোথায় একটি অস্ত্র পাব?
ওদের কাছে এমন কথা শুনলে নিজের দিকে তাকায় রাবেয়া। ওর যুদ্ধ তো এদের নিয়ে। ও দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে পায়, লালু ডোমকে নিয়ে সেনা দুজন ফিরে আসছে। ওরা সাফিনার লাশ ফেলে দেওয়ার জন্য পায়ে রশি বেঁধে টেনে নিয়ে যাবে। এর আগেও এভাবে লাশ সরানো হয়েছে। খুব কাছ থেকে দেখা দৃশ্য। সেনাদের একজন প্রথমেই বন্ধ ঘরের তালা খোলার জন্য দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রাবেয়া দ্রুত সরে যায় দরজার কাছ থেকে। দরজা খোলা হচ্ছে দেখে খুশিও হয়। মেয়েগুলোর সঙ্গে কথা হবে। দরজা খুলে দিয়ে সেনাসদস্য রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে হুকুম দেয় মেয়েগুলোকে বারান্দায় সারি করে দাঁড় করাতে। রাবেয়া বুঝে যায়, মরে যাওয়া মেয়েটিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এদের দেখাবে। বোঝাতে চায়, বেয়াদবির শাস্তি এমন। বাঁচতে চাইলে আর এমন করবে না।
লাশ নামানোর জন্য লালু ডোমকে হুকুম দেয় সেনা। লালুর সঙ্গে পরদেশী আছে। দুজনে মিলে লাশ নামায়। পায়ে দড়ি বাধে। তারপর টেনে নিয়ে যায়। মেয়েরা দুহাতে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সারা শরীরে যন্ত্রণা। নির্যাতনের যন্ত্রণা। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ধপ করে বসে পড়ে। কান্নার রোল ওঠে। চাবুক হাতে ছুটে আসে সেনা। রাবেয়া ওর পা জড়িয়ে ধরে বলে, মেরো না। ওদের মেরো না। আমাকে মাররা। সেনা ওর পা ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কষে লাথি দেয়। রাবেয়া দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের পায়ের কাছে ছিটকে পড়ে।
সাফিনার পায়ে দড়ি বেঁধে লাশ নিয়ে বের হয় লালু ডোম। দেখতে পায় রাবেয়াকে, তখনো কাত হয়ে পড়ে আছে। ওঠার চেষ্টা করছে না। ও ইচ্ছে। করেই টানার সময় সাফিনার হাত ওর মাথায় ঠেকায়। মাথা তোলে রাবেয়া।
অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলে, ও যেন আমাকে কী বলে গেল রে?
তোমাকে উঠতে বলেছে। বলেছে, পড়ে থাকলে চলবে না।
আমি তো ওর জন্য কিছু করতে পারিনি।
ওকে যত্ন করেছ। ওর শরীর সাফ করেছ। ওর চুল বেঁধে দিয়েছ।
তোরা মন খুলে কথা বল, মেয়েরা। এখানে এখন আর কেউ নেই।
ওরা থাকলেই বা আমাদের কী? মারবে? মারুক।
মেয়েরা রাবেয়ার চারপাশে গোল হয়ে বসে।
যুদ্ধ বাধলে মেয়েদের এভাবে ধরে এনে শাস্তি দিতে হয়, খালা?
আমরা ওদের কী ক্ষতি করেছি, খালা?
তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ না কেন, খালা? তুমি চুপ করে আছ। কেন?
ওদের কাছে আমাদের একটাই অপরাধ।
কী? কী? কী? কী? কী? কী?
ওদের সবার মুখ থেকে কী ধ্বনি বের হতে থাকে।
বলো, আমাদের অপরাধ কী?
আমরা স্বাধীন দেশ চাই। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছি।
যুদ্ধ! যুদ্ধ!
কারও কারও পা বেয়ে তখন রক্ত গড়ায়। ভিজে যায় পায়জামা। স্যানিটারি ন্যাপকিন নেই ওদের জন্য।
একটা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার খুব কষ্ট। আমি আর পারি না। আমি মরে যেতে চাই।
তোকে পুরোনো কাপড় দেই? আমি এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।
না না, তোমার যেতে হবে না। ওগুলো দেখলে ওরা আমাকে মারবে। নীলুকে মেরে আধা মরা করেছিল।
রাবেয়া ঘাড় নাড়ে। ও জানে বিষয়টা। ও এটাও জানে যে ওর কিছু করার নেই। নীলু নিজেকে টেনে এনে রাবেয়ার মুখখামুখি হয়। খালা, তোমাকে বলেছিলাম আমাকে একটা ছুরি দিয়ে।
দেব। রাবেয়ার কঠিন স্বর মেয়েদের কানে বাজে।
দেবে? কবে? দেবে দেবে বলছ, আনছ না। তোমার কাছে ছুরি কেনার পয়সা নাই?
কালই দেব। শুধু তোকে একা না। সবাইকে একটা করে ছুরি দেব।
তাহলে আমি একটাকে শেষ করব। তারপর নিজে মরব। তাহলেই। আমার শান্তি হবে। আর কষ্ট থাকবে না।
তুমি আমার মাকে বলবে, নীলু আপনাকে খুবই ভালোবাসে। মরার আগে ও আপনার মুখ স্মরণ করেছে। বলবে তো, খালা? আরও বলবে, ও বলেছে যে আপনি যেন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মনে করেন যে আপনার মেয়েটি যুদ্ধে জীবন দিয়েছে। ও কোনো অন্যায় করেনি। তুমি যাবে তো আমার মায়ের কাছে?
না। রাবেয়া অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়।
