দুজনে টয়লেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রথমে ঢোকে সামাদ। চারদিক দেখেশুনে বেরিয়ে আসে। তারপর ব্রিফকেস নিয়ে ঢোকে বাকের। ব্রিফকেস কমোডের পেছনে রাখে। তারপর টাইম-পেনসিল প্রেস করে। দ্রুত দরজা বন্ধ করে বের হয়ে আসে। দুজন দুপথে বের হয়ে গাড়িতে ওঠে। সামান্য সময় মাত্র। গাড়ি শাঁই করে ছেড়ে যায় হোটেলের এলাকা।
বিকেল পাঁচটা ৫৬ মিনিটে ঘটে বিস্ফোরণ। ৫৫ মিনিট মেয়াদি টাইমপেনসিল ছিল। ওদের বাড়িতে পৌঁছাতে অসুবিধা হয় না। ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ধানমন্ডি ৫ নম্বর বাড়িটি বেশি দূরে নয়। ধানমন্ডি ২৭ এবং ২৮-ও ওদের টার্গেট ছিল। যে যার মতো পৌঁছে গেল বাড়িতে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আকমল হোসেন বুঝলেন, ওরা যদি বিপদে না পড়ে, তবে এতক্ষণে নিরাপদে বাড়িতে চলে গেছে। তার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। ওদের ফোনের অপেক্ষা।
সন্ধ্যার পর মিজারুল ফোন করে।
চাচা, অপারেশন সাকসেসফুল। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠেছে হোটেল। শপিং আর্কেড, লাউঞ্জ এবং আশপাশের ঘরের জানালার কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বাথরুমের দেয়ালও ভেঙে পড়েছে। আহত হয়েছে। কয়েকজন।
তোমাদের অভিনন্দন, বাছারা।
আমরা কাল সকালে রূপগঞ্জ চলে যাব। সবাই একসঙ্গে না। ভাগে ভাগে। বিভিন্ন সময়ে।
সাবধানে যেয়ো, বাছারা। তোমরা আমাদের সোনার ছেলে। দোয়া করি, ভালো থাকো।
আকমল হোসেন ফোন রেখে দেওয়ার পর দুহাত ওপরে তুলে নেচে ওঠে মেরিনা।
কী আনন্দ, কী আনন্দ! আব্বা, ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিক থাকলে তারা নিশ্চয় এই খবর ছড়িয়ে দেবে সারা দুনিয়ায়।
সেটাই তো করা উচিত। ঢাকা শহরের গেরিলাযুদ্ধ…
আকমল হোসেন আর বাক্যটি শেষ করেন না। আয়শা খাতুন বলেন, তুমি কি চা খাবে? বিকেলে তো খাওনি।
হ্যাঁ, তোমার চুলায় জ্বলে উঠুক আলো। আগুন জ্বালো।
আজ আগুন আমি জ্বালাব।
মেরিনা একছুটে রান্নাঘরে আসে। মন্টুর মা পিড়ি পেতে বসে আছে। মেরিনাকে দেখে চোখ বড় করে বলে, বুঝেছি। ওরা জিতেছে।
হ্যাঁ, দারুণ জয়। আজ আগুন আমি জ্বালাব।
না, আমি। আমি জ্বালাব।
মন্টুর মা ঘুরে স্টোভের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশলাইটা নিজের মুঠিতে নেয়। মেরিনার দিকে তাকিয়ে বলে, সব সময় তো আমি জ্বালাই। আজ খুশির দিনে আমি জ্বালাব না কেন? আমিও তো যুদ্ধ করতে চাই।
মেরিনা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মন্টুর মায়ের দিকে। মন্টুর মা স্টোভ জ্বালিয়ে পানি বসায়। মেরিনা ছুটে ড্রয়িংরুমে এসে বলে, আব্বা, খালা আমাকে আগুন জ্বালাতে দেয়নি। বলেছে, এই আগুন জ্বালানো তার যুদ্ধ। আরও বলেছে, এই যুদ্ধ তাকে করতে দিতেই হবে।
আকমল হোসেন হা-হা করে হাসেন। অনেক দিন পর তার এই প্রাণখোলা হাসি দেখে আয়শা খাতুন ভ্রু কুঁচকে বলেন, হাসছ যে? কিসের এত আনন্দ?
যুদ্ধ সবখানে পৌঁছে গেছে। আমাদের আর ভয় নাই। আমরা জয়ী হবই।
আকমল হোসেন আবার হাসিতে ভেঙে পড়েন। হাসতে হাসতে সোফার গায়ে মাথা ঠেকান।
মেরিনা বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে মৃদুস্বরে ডাকে, আব্বা।
বল, মা।
এটা কি আনন্দের সময়?
সবকিছুর সময়। কোনোটা বাদ দিয়ে কোনোটা নয়। তোর মা যেমন গুনগুন ধ্বনিতে আমাদের ভরিয়ে দেয়, তেমন এই হাসি দিয়ে আমি গেরিলাদের বিজয়ের আনন্দ করব। অবশ্যই এটা আনন্দের সময়।
এখন আমরা সবাই মিলে তোমার সঙ্গে হাসব।
অবশ্যই হাসবি। এই হাসি দিয়ে আমরা জেবুন্নেসার মৃত্যুর উৎসব করব। ও এই পরিবারের একজন হতে পারত। হয়নি। তাতে কিছু আসে-যায় না। আমার ছেলের ভালোবাসা ও পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ও একজন শহীদ। বীর নারী। শত্রুর গায়ে থুতু ছিটিয়ে জীবন দিয়েছে।
আকস্মিকভাবে ঘরে স্তব্ধতা নেমে আসে। কারও মুখে কথা নেই। আয়শা সোফায় মাথা হেলিয়ে চোখ বোজেন। মেরিনা অপলক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা কী আশ্চর্য সৌন্দর্যে ইতিহাসের পাতায় রং মাখালেন। ওর বুকের ভেতর তোলপাড় করে। নিজেকে বলে, জেবুন্নেসা, তুমি অমর।
০৫. রাজারবাগ পুলিশ লাইন
রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাকের বারান্দায় বসে রাবেয়া রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে মুখটা উঁচু করে রাখে। যেন সার্বিক দিকে তাকানোর ইচ্ছা ওর আর নেই। পৃথিবীকে ও আর দেখতে চায় না। ওর দৃষ্টি আকাশের দিকে নিবদ্ধ থাকবে শুধু। রাবেয়ার চোখ জল দিয়ে ভরে উঠতে চায় না।
কিছুক্ষণ আগে ঝুলিয়ে রাখা মেয়েদের পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করার কাজ শেষ করেছে। তখনি টের পেয়েছে ঝুলন্ত অবস্থায় মরে আছে সাফিনা। মাত্র গতকাল বিকেলে ওই অবস্থায় ওর চুল আঁচড়ে বিনুনি করে দিয়েছিল রাবেয়া। মাথার চারদিকে উল্টে থাকা চুলের গোছায় ওর মুখ আড়াল হয়ে থাকা রাবেয়ার পছন্দ ছিল না। মাত্র দুদিন আগে ওকে এখানে এনে ঝোলানো হয়েছে। ঝুলন্ত অবস্থায় বেত দিয়ে মারাও হয়েছে। তার পর থেকে ওর কথা বন্ধ ছিল। মৃত্যুর পর শীতল হয়ে যাওয়া শরীরটি ওর পুরো শরীরে শীতের প্রবাহ ছড়িয়ে দিয়েছিল। ও প্রথমে ওকে ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল। তারপর হাউমাউ করে কেঁদেছিল। কিন্তু না, ও বেশিক্ষণ কাঁদেনি। শুধু স্তব্ধ হয়ে ভেবেছিল, মমতার জায়গাটি এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তা ও ভাবেনি। পরক্ষণে মনে হয়েছিল, মরে গিয়ে ভালো হয়েছে। ওর যন্ত্রণা শেষ হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়ে গেল! লোকে ওর ত্যাগের কথা মনে রাখবে তো?
