পায়ে হেঁটে এসব দেখে তিনি কপালের ঘাম মুছলেন। বুঝলেন, এই অপারেশন সাকসেসফুল না হলে মৃত্যু। তার পরও সময় এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই। তিনি গাড়িতে ফিরলেন। আলতাফ বসে আছে গাড়িতে। এসব ক্ষেত্রে তিনি ওকে নিয়ে আসেন। তিনি গাড়িতে উঠলে আলতাফ সরাসরি বলে, কালকে আমি ভাইয়াদের সঙ্গে থাকব, স্যার।
এখন কথা না। আগে বাড়ি যাই।
তিনি গাড়িতে স্টার্ট দেন। তিনি আলতাফের মনোভাবের কথা জানেন। ও বারবারই বলে। কিন্তু গেরিলা অপারেশন তো পাড়ার খেলার মাঠে ফুটবল খেলা নয় যে, যে কেউ খেলায় অংশ নেবে। বলের গায়ে দু-চারটি লাথি মেরে বলবে, ফুটবল খেলেছি।
চা খাওয়ার ফাঁকে তিনি ছেলেদের নিজের রেকি করার কথা বলেন। ওরা মনোযোগ দিয়ে তার বিবরণ শোনে। কথা থামিয়ে তিনি সামাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, এবার তোমার কথা শুনব। কারণ, তুমি ভেতরে ঢুকে দেখে এসেছ।
আমি হোটেলে ঢোকার সুযোগ করে নিয়েছি জামাল ওয়ারিসের মাধ্যমে। তিনি একজন অবাঙালি। ঢাকাতেই থাকেন। আমি তাঁর কাছ থেকে থাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের নতুন অফিসঘরে নিয়ন সাইনবোর্ড লাগানোর অর্ডার সংগ্রহ করতে যাই। সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোথায় কী করব, সেই বিষয়ে রেকি করি। আমার মনে হয়, যেভাবে বিস্ফোরক রাখার চিন্তা করেছি, তা ঠিকমতো রাখতে পারলে আমাদের অপারেশন সাকসেসফুল হবে।
সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল। থামতেই মেরিনা বলে, ইনশাআল্লাহ, আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম। এর পরের অপারেশনে আমি যাব। আম্মা আমাকে একটা ট্রাউজার আর শার্ট কিনে দেবেন। আব্বা, কী বলেন?
তোমার ট্রেনিং দরকার, মা।
আমি ভাইয়াদের কাছ থেকে যা শুনছি এবং দেখছি, তাতে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হচ্ছে। আমি পারব।
বাকের হাসতে হাসতে বলে, তুমি তো এমনিতেই গেরিলা। তুমি আমাদের সবকিছুর সঙ্গেই আছ।
আরও কিছু করতে চাই।
আয়শা খাতুন গম্ভীর স্বরে বলেন, ওকে করতে দেওয়াই উচিত। আমার বিশ্বাস, ওকে যে কাজ দেওয়া হবে, তা ও পারবে।
আকমল হোসেন অন্যদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, ওকে দিয়ে কী করানো যায়, তা আমাকে ভাবতে দিয়ো। আমাদের কালকের অপারেশন শেষ হোক।
সবাই মাথা নেড়ে সায় দেয়।
রূপগঞ্জে মারুফ ভালো আছে তো, মতিন?
হ্যাঁ, ভালো আছে, খালাম্মা। ও প্রায়ই বাড়ির কথা মনে করে। ওর বাড়িটা একটা দুর্গবাড়ি—এ নিয়ে ওর মনে গর্ব আছে।
আয়শার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মৃদু হেসে বলেন, ভয় পাই শারীরিক অসুস্থতার। জ্বর, আমাশা, নিউমোনিয়া…
যুদ্ধের সময় এসব ভাবা ঠিক নয়, আয়শা। হলে হবে। আবার সুস্থও হবে।
ঘরে একমুহূর্ত নীরবতা। আকমল হোসেন যা বললেন, তার বিপরীতে কেউ আর কোনো কথা বলে না। সময় যে কত গভীর এবং মন্ময় হতে পারে, সকলে তা উপলব্ধি করে। সময়ের গভীরতায় নিমগ্ন মানুষের কথা অকস্মাৎ ফুরিয়ে যায়। কতক্ষণ কেটে যায় কেউ জানে না।
মতিন বলে, আমরা এখন যাই। কাল আসব।
এসো। সাবধানে যেয়ো। ভালো থেকো।
ঘরে কথা নেই। জেগে ওঠে পদশব্দ। দরজায় দাঁড়িয়ে মতিন বলে, পুরো রূপগঞ্জ গেরিলা ক্যাম্প হয়েছে। ওখানে গেলে আমাদের শক্তি দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তোমাদের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তোমাদের সুস্থ রাখুন।
তোমাদের মঙ্গল হোক।
আয়শা খাতুন ওদের পিছু পিছু বারান্দা পর্যন্ত যান। মেরিনা গেট পর্যন্ত আসে। আলতাফ গেট সামান্য ফাঁক করে একজনকে যেতে দেয়। তারপর চারটি গেটের আরেকটি দিয়ে আরেকজনকে। সবশেষে দুজনকে পেছনের গেট দিয়ে। এখান থেকে ভিন্ন পথে বের হয়ে ওরা আবার মিলিত হবে এক জায়গায়।
আকমল হোসেন জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকান। সেই কবে এই শহরে তাঁর জন্ম, সেই কত বছর ধরে এই শহরে তার বেড়ে ওঠা—শহরের সঙ্গে জানাজানি কতভাবে! এই জানা থেকে ধুলোবালি এবং পোকামাকড়ও বাদ নেই। ঘাস-গাছ-লতাপাতাও বাদ নেই। এখন এই শহর তার সামনে নতুনভাবে জেগে উঠেছে। সামনে সুদিন। শহরের ভৌগোলিক অবস্থান বদলাবে, শহরটি যুদ্ধ করে স্বাধীন করা একটি দেশের রাজধানী হবে। উপমহাদেশের মানচিত্র বদলে দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে নেবে। তার বুকের ভেতর আনন্দের জোয়ারধ্বনি। আগামীকাল তিনি নিজে ছেলেদের হাতে বিস্ফোরক উঠিয়ে দেবেন।
পরদিন সামাদের ব্রিফকেসে ঢোকানো হয় ২৮ পাউন্ড পিকে এবং ৫৫ মিনিট মেয়াদি টাইম-পেনসিল। ওরা দ্রুত গাড়িতে উঠে রওনা হয়। কোনো কথা নেই। বিদায় নেই। আকমল হোসেন হাতঘড়িতে সময় দেখেন। দেয়ালঘড়ির দিকেও তাকান। তারপর গেরিলা পত্রিকায় শান্তি কমিটির ওপর লিখবেন বলে টেবিলে গিয়ে বসেন।
ততক্ষণে গাড়ি পৌঁছে গেছে ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছে। আগেই ঠিক করা ছিল যে তারা মেইন গেট দিয়ে ঢুকবে না। দুজন ঢুকবে ভেতরে, দুজন গাড়িতে অপেক্ষা করবে স্টেনগান হাতে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুইস এয়ার অফিসঘরের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে সামাদ আর বাকের। ওদের সহযোগিতা করে ওই অফিসে কর্মরত বন্ধু। ফিসফিসিয়ে বলে, সাবধানে যা। ফেরার পথ অন্যদিকে।
জানি। তুই সাবধানে থাকিস।
এক সেকেন্ড মাত্র। বন্ধুর হাত ধরে ছেড়ে দেয় ওরা। বুঝতে পারে, চারপাশে ওরা আছে বলে কাজ সহজ হয়ে গেছে। ওরা আছে বলে প্রসার জায়গা তৈরি হয়। দুজনে পেছন ফিরে তাকায় না। বুঝতে পারে, ওদের বন্ধু নিজের চেয়ারে গিয়ে বসেছে। আর কিছুক্ষণ পর অফিস ছুটির সময় হয়ে যাবে। বন্ধু বলেছে, ছুটির আধঘণ্টা আগে ও অফিস ছেড়ে চলে যাবে অন্যত্র কাজ আছে এই অজুহাতে।
