মেরিনা রান্নাঘরে আসে।
ফ্রিজে কয় বোতল পানি আছে, তা দেখতে এলাম।
মন্টুর মা বসে থেকেই বলে, ওনারা যদি দশজনও আসে, তা-ও ঠান্ডা পানি দিতে পারব।
ভালোবাসা আপনাকে, খালা।
ফ্রিজে পনির আর পায়েস আছে।
ব্যস, অনেক। আমার মা তো মা না, এই বাড়ির সেনাপ্রধান। বন্দুক-গুলিগ্রেনেড-বোমা-ভাত-মাংস-পায়েস-পনির-কমলা-আপেল-বিছানা-বালিশ সব তার হাতের মুঠোয়। মা যে কী পারে না, তা আমি বুঝতে পারি না। আমাদের প্রিয় নবীর স্ত্রী আয়শা উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধ করেছিলেন। আমার মায়ের নাম আয়শা। যুদ্ধ তাঁর কাছেও ভাবনা।
মন্টুর মা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, শুধু ভাবনা না, শক্তিও। মনের শক্তি।
ঠিক বলেছেন। মেরিনা হাত তুলে নিজেকে ঝাঁকায়।
মন্টুর মায়ের মনে হয়, মেরিনার চেহারায় আলোর ঝলকানি। মেরিনা এক গ্লাস পানি খেয়ে ড্রয়িংরুমে চলে যায়। মন্টুর মা আবার বারান্দার সিঁড়িতে গিয়ে বসে।
সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ এই বাড়িতে আসে না।
এতক্ষণ ধরে আকমল হোসেন অনবরত নিজেকে সামলেছেন। মাগরেবের আজান ভেসে আসছে। তিনি উঠে আলম হাফিজকে ফোন ঘোরালেন। দিলু রোডের তাঁর বাড়িটিও একটি দুর্গ। ফোন ধরল তার মেয়ে সোমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী। আকমল হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, মা, তোমার আব্বা কোথায়?
আব্বা নামাজ পড়ছেন, চাচা। নামাজ শেষ হলে আব্বাকে বলি আপনাকে ফোন করতে।
না, আমিই করব। তুমি ছোট্ট করে উত্তর দাও—
আকমল হোসেন কথা শেষ করার আগেই সোমা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, ওরা সবাই ভালো আছে, চাচা। একেকজন একেক বাড়িতে চলে গেছে। একসঙ্গে নেই। মোটরসাইকেল মগবাজারের রেললাইনের ধারের গলিতে ফেলে গেছে। আপনি কিছু ভাববেন না। চাচা, আপনি ভালো আছেন তো?
হ্যাঁ মা, ভালো আছি।
তিনি কথা বলার সময় তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আয়শা খাতুন আর মেরিনা। তিনি মুখ ফিরিয়ে আয়শা খাতুনকে বললেন, তোমার চুলোয় আগুন দিতে পারো। অপারেশন সাকসেসফুল। ছেলেরা বিভিন্ন বাড়িতে হাইডে চলে গেছে।
আমার ছেলেটা ফোন করেনি।
আহ্ আশা, এমন করে বলতে নেই। সব সময় মনে করবে, ওরা কোনো কাজে আছে।
তা ঠিক। কখনো পরিস্থিতি মানতে না পারা নেহাতই ছেলেমানুষি।
আয়শা সরে যান। মেরিনা মৃদু স্বরে বলে, মা দুঃখ পেয়েছেন।
তুই মায়ের কাছে যা। তার স্বস্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কর।
এখন মা একা থাকতে চাইবেন। আমি আমার নিজের ঘরে যাচ্ছি।
তখন আলতাফ নিজের ঘরে ঢুকে বিড়ি জ্বালায়। মনের সুখে টানতে টানতে পা নাচায়। ভাবে, একটা অপারেশনে যোগ দিতেই হবে। নইলে জীবন বৃথা। বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনিরা যুদ্ধের গল্প শুনতে চাইলে তখন কী বলবে? শুধু অস্ত্র পাহারা দেওয়া নয়, আরও বেশি কিছু চাই।
সেই সন্ধ্যায় আলতাফ একজন চেইন স্মোকার হয়। আয়শা খাতুন রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন, কেরোসিনের চুলা জ্বলছে। সে আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে মন্টুর মা। তিনি ফিরে আসেন ডাইনিং স্পেসে। ফ্রিজ খুলে পানির বোতল বের করেন। ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে পানির চেয়ে আগুনই তার বেশি প্রিয়। তিনি শুরু করেন গুনগুন ধ্বনি-আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…। গানের সুর শুনে আকমল হোসেন মাথা তোলেন। কিন্তু না, আয়শা খাতুন এ ঘরে নেই। মেরিনা পড়ার টেবিলে বসে দরজার দিকে তাকায়—মা কি এ ঘরে আসছেন?
আয়শা খাতুন মেয়ের ঘরে ঢোকেন না। তিনি পেছনের বড় বারান্দায় এসে বসেন। আকাশ দেখেন। আকাশের পটভূমিতে আগুনের শিখা বুকের মধ্যে জাগিয়ে রাখেন।
মায়ের গুনগুন ধ্বনি শুনে মেরিনার মনে হয়, এই ধ্বনির মধ্যে শুধু সুর আর বাণী নেই, অন্য কিছু যোগ হয়েছে। আকমল হোসেনও এমন ভাবনাই করেন। টেবিলের ওপর রাখা নিজের কাগজপত্র দেখতে দেখতে ভাবেন, পরের পরিকল্পনা সামাদ বলেছে ইন্টারকন্টিনেন্টালে অপারেশন। প্রথম অপারেশনের পর এখানে পাহারার খবরদারি কড়াকড়ি হয়েছে। তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়েছে। হোটেলে অনায়াসে প্রবেশ দুঃসাধ্য। সে জন্য হোটেলে ঢুকতে হবে। দেখাতে হবে যে, আমরা পারি।
তিনি মাথা সোজা করে চেয়ারে হেলিয়ে দিয়ে চোখ বোজেন। একেকটি পরিকল্পনার কথা চিন্তা করলে তার ভেতরে প্রশান্তি ছড়ায়। তিনি মনে করেন, ক্ষণিকের জন্য হলেও ওই প্রশান্তি উপভোগ করা উচিত। আজও সেই শান্ত-স্নিগ্ধতায় শুনতে পান আয়শা খাতুনের পায়ের শব্দ। তিনি মৃদু স্বরে ডাকেন, আশা।
বলো।
তোমার গুনগুনে আজ ভিন্ন কিছু পেয়েছি। শুধু সুর আর বাণী না।
তুমি যে আগুন জ্বালাতে বললে?
তাহলে এ বাড়ির সবকিছুতে আজ আগুন?
আমি তো সেরকমই মনে করছি।
এই মনে করা আমাদের জীবনে সুন্দর হোক। মৃত্যু ও ধ্বংসের সৌন্দর্য।
আয়শা খাতুন কথা বলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। ঘরে এসেছেন টাকা নিতে। আলতাফকে দোকানে পাঠাবেন। সে কথা ভুলে যান। দাঁড়িয়েই থাকেন। চেইন স্মোকার আলতাফের ছোট অ্যাশ-ট্রেতে আরও দুটুকরো সিগারেটের পোড়া জমা হয়। মন্টুর মা স্টোভের ওপর থেকে ভাতের পাতিল নামালে আগুন ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশে কোথাও কেউ নেই। শুধু মন্টুর মা মাড় পালানোর জন্য ভাতের পাতিল উপুড় করে।
একদিন ক্র্যাক প্লাটুনের পাঁচজন বাড়িতে আসে। আগামীতে ওরা ইন্টারকন্টিনেন্টালের বাথরুমে বিস্ফোরক রাখবে বলে ঠিক করেছে। গতকাল আকমল হোসেন নিজেও হোটেলের চারপাশ রেকি করে এসেছেন। দেখেছেন পাহারার পরিমাণ কেমন এবং কতটা ডিঙাতে হবে। হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় পাহারার জন্য অসংখ্য মিলিশিয়া রাখা হয়েছে। আগের চেয়ে তিন গুণ বেশি। হোটেলের তিন দিকের কোনায় বালির বস্তা দিয়ে প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। সেই বস্তার ওপর লাইট মেশিনগান নিয়ে সারাক্ষণ পাহারায় থাকছে সেনাবাহিনীর সদস্য।
