বেশ গতিতেই হোন্ডা চালাতে চালাতে মানু ঘাড় নাড়িয়ে বলে, কনগ্রাচুলেশন ফর গ্রেট সাকসেস।
গাজী শিস বাজিয়ে বলে, হিপ-হিপ-হুররে।
মায়া ওর ঘাড়ে চাপ দিয়ে বলে, বাড়াবাড়ি হচ্ছে, থাম।
এটা আমাদের বিজয় উৎসব।
ওটা রূপগঞ্জে গিয়ে হবে। শীতলক্ষ্যা নদীর ওপারে, যেখানে গেরিলারা অবস্থান নিয়েছে। আমরা একটা মুক্ত এলাকা গড়ে তুলেছি।
মানু গম্ভীর স্বরে বলে, তোরা কথা থামা। এটা বেশি কথা বলার সময় না। এটা উল্লাসেরও সময় নয়।
উল্লাস জীবনের ধর্ম। যুদ্ধের সময়ও উল্লাস চাই।
বাব্বা, দার্শনিক ভাবনা! তোরা আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেছিস। এখন চুপ করে থাক, নইলে হোন্ডা থেকে ফেলে দেব।
কেউ কোনো কথা বলে না। সামনে লালবাতির সিগন্যাল না মেনে ছুটে বেরিয়ে যায় হোন্ডা। গতি বাড়িয়ে দেয় মানু। টয়োটা কার অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দোকানপাট বন্ধের সময় হয়ে এসেছে প্রায়। ওরা যাবে ভোগে। ওই দোকানেও আজকে অপারেশন। গুলিস্তানের খবর ছড়িয়ে পড়াতে সন্ত্রস্ত মানুষ ছুটছে। খবর পৌঁছাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। রাস্তায় ছোটার সময় সেটাই টের পায় ওরা।
গাজী বলে, হাতে সময় খুব কম। প্রস্তুতি নিতে হবে।
মায়া দ্রুত একটি ফসফরাস গ্রেনেড পিন-আউট করে গাজীর হাতে দেয়। ওরা জানে, এভাবে পিন-আউট গ্রেনেড নিয়ে ছোটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বেশি ঝাকুনি লাগলে পিন-আউট করা ফসফরাস বোমার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তার পরও ওরা নির্ভীক।
খুক করে হেসে মায়া বলে, দুঃসাহসী অভিযান ভয়হীন। ভয় করবি তো পেঁদিয়ে যাবি।
পেঁদিয়ে যাবি কী রে? আগে তো কখনো শুনিনি।
চুপসে যাবি।
মনে এত আনন্দ যে নতুন শব্দও আবিষ্কার করছিস?
চুপ শালা।
আবার বেগে ছুটে চলা। গতি মাপার সময় নেই। তীব্র গতিতে ছুটছে হোন্ডা সিসি। গাজী খুব সতর্কভাবে ফসফরাস বোমাটি ধরে রেখেছে।
দোকানের কাছাকাছি এলে ওরা দেখতে পায়, ভোগের কর্মচারীরা দোকান বন্ধ করার তোড়জোড় করছে। প্রায় বন্ধ করেই ফেলেছে। দোকানের শাটার আর এক হাত মাত্র খোলা। ওরা বুঝে যায়, হোন্ডা থেকে নেমে কাজ করার সুযোগ নেই। তাহলে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
ঘাড় না ঘুরিয়ে মানু বলে, সময় নষ্ট করার সময় নেই। হোন্ডা থামাব না।
আমারও মনে হচ্ছে, থামানোর দরকার নেই।
মায়া চেঁচিয়ে বলে, গেট রেডি গাজী।
দোকানের সামনে এসে হোন্ডা স্লো হয় মাত্র। একমুহূর্ত দেরি না করে চলন্ত হোন্ডা থেকে সেই দরজার ওপর ফসফরাস বোমা ছুড়ে মারে গাজী।
হইচই-আর্তচিৎকার শুরু হয়।
শাঁই করে বেরিয়ে যায় হোন্ডা। দোকানের কাছে আসার আগেই কভার দেওয়া গাড়িটি পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের পিছু নিয়েছিল। হোন্ডা বেরিয়ে গেলে কভার দেওয়া গাড়িও সঙ্গে সঙ্গে ওদের অনুসরণ করে।
ঘড়ি দেখে উন্মুখ হয়ে থাকেন আকমল হোসেন। ভাবেন, এতক্ষণে ওদের অপারেশন শেষ হয়েছে। নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেছে তো ওরা? মেরিনা কাছে এসে দাঁড়ায়। আয়শা খাতুনও। আকমল হোসেন ওদের দিকে তাকিয়ে বলেন, আমরা সবাই একই চিন্তায় আছি, না?
নিশ্চয়ই ওরা এতক্ষণে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেছে।
আমিও তাই ভাবছি, আম্মা।
মেরিনার কণ্ঠস্বরে অস্থিরতা ধ্বনিত হয়। দরজায় এসে দাঁড়ায় আলতাফ ও মন্টুর মা। আয়শা খাতুন বলেছেন, যতক্ষণ ওদের খবর না পাওয়া যাবে, ততক্ষণ রান্নাঘরে চুলো জ্বলবে না। আলতাফ নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ওদের খবর না পাওয়া পর্যন্ত একটি বিড়িও টানবে না।
আম্মা, আমি টেলিভিশন ছাড়ি? মেরিনার অস্থির আচরণ ওর কণ্ঠস্বরেও ধরা পড়ে।
ছাড়তে পারো। তবে এত তাড়াতাড়ি ওরা ওদের ভাষায় দুষ্কৃতিকারীদের কোনো খবর দেবে না।
তার পরও ছেড়ে রাখি। যদি কোনো কিছু শুনতে পাই।
আকমল হোসেন বলেন, ভলিউমটা লো করে রাখিস, মা।
আলতাফ আর মন্টুর মা বারান্দায় আসে। সিঁড়ির ওপর বসে মন্টুর মা। আলতাফ গেট খুলে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। গাড়ির চলাচল খেয়াল করে। ভাবে, যদি কোনো গাড়িতে করে ওরা এ বাড়িতে আসে তাহলে ওদের বলবে, আপনাদের পরের অপারেশনে আমাকে নেবেন। আমি ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হতে চাই। ওরা বলবে, আপনার তো ট্রেনিং নেই, আলতাফ ভাই। আমি বলব, আপনারা আমাকে ট্রেনিং দেন। আমি ত্রিপুরার মেলাঘরে ট্রেনিং নিতে পারব না। ঢাকায় কোন মাঠে যেতে হবে আমাকে বলেন। ওরা তখন নিশ্চয়ই কোনো জায়গায় যেতে বলবে ওকে। ও রাইফেল চালানো শিখবে। গ্রেনেডের পিন খোলা শিখবে।
আলতাফ রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুহাতে মুখ ঢাকে। নিজেকেই বলে, সব সময় বড় ঘটনার সঙ্গী হতে হয়। যে বড় ঘটনার সঙ্গী হতে পারে না, সে অভাগা।
তারপর নিজেকেই বলে, তুমি তো বড় ঘটনার সঙ্গী হয়েছ, আলতাফ মিয়া। তুমি এই দুর্গের পাহারাদার। দরকারমতো অস্ত্র বের করে দাও। দরকারমতো লুকিয়ে রাখো।
হ্যাঁ, তা দেই।
নিজেকেই উত্তর দেয়। তারপর গেটে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি ওরা আসে! একমুহূর্ত দেরি না করে গেট খুলতে হবে। চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়ি-রিকশা। পায়ে হাঁটা মানুষ। কখনো দু-একটা মিলিটারির গাড়ি। সেনাদের মাথায় হেলমেট থাকে। আর রাইফেলের নল উঁচিয়ে রাখে। কত দূর থেকে ওরা এই দেশে মরতে এসেছে। আলতাফ দুহাত ওপরে তুলে বলে, তোমাদের গেরিলাযোদ্ধাদের হাতে মরতে হবে। মরতেই হবে। রেহাই পাবে না।
মন্টুর মা সিঁড়িতে বসে থাকতে পারে না। উঠে রান্নাঘরে আসে। ভাবে, ওরা কখন আসবে? ওরা এলে তো আগে পানি চাইবে। তার পরে চা। মন্টুর মা ট্রের ওপর গ্লাস সাজিয়ে রাখে। পানি ঢালে না। আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ থেকে বোতল বের করে ঠান্ডা পানি ঢালবে। আর একটি ট্রের ওপর চায়ের কাপ সাজায়। চায়ের পাতা, চিনির কৌটা ওপর থেকে নামিয়ে হাতের কাছে রাখে। চায়ের কেটলিতে পানি ভরে কেরোসিনের স্টোভের ওপর রাখে, যেন শুধু আগুন জ্বালালেই হয়। কাজ গুছিয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে পিড়ির ওপর বসে থাকে।
