মা বলেছিল, “এটা এখন বলছ? এই মাঝরাতে বলছ? পরশু মেয়ের জন্মদিন আর আজ বলছ?”
বাবার গলাটা আস্তে ভেসে আসছিল। রাধিয়া শুনেছিল, বাবা বলছে, “আমি কি জানতাম যে, এমন এমার্জেন্সি হবে! আর তেইশ বছর হচ্ছে মেয়ের। খুকি নয়। তোমার কী দরকার আছে, এমনভাবে পার্টি দেওয়ার? কোনও মানে হয়!”
“আমার একমাত্র মেয়ে না? আর টাকার তো অভাব আছে বলে জানি না আমাদের। তা হলে মেয়েটার জন্য যদি একটু খরচ করি আপত্তি কোথায়?”
“আমি কি টাকার কথা বললাম?” বাবার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট টের পেয়েছিল রাধিয়া।
বাবা বলেছিল, “আমি কি সেটা বলেছি? বলছি এমন শো অফ করার কী আছে?”
“কথা ঘুরিয়ো না,” মায়ের গলা শুনেই রাধিয়া বুঝতে পারছিল, মা খুব কষ্ট করে নিজেকে সংযত রাখছে! মা বলেছিল, “তুমি কেন থাকবে না পার্টিতে? কী এমন রাজকার্য পড়ে গেল?”
“রাজকার্য?” বাবা হেসেছিল। ব্যঙ্গের হাসি। বলেছিল, “তোমায় বললেই বুঝবে? বাজে প্রশ্ন করছ কেন? কী মনে হয়, এত বড় বিজ়নেস এমনি চলছে? মা-তো তিনতলায় নিজের ঘরে বসে থাকে। বোর্ডের ডাইরেক্টরদের কে ফেস করে? এত সব কাজ কে সামলাবে? বাড়িতে বসে মেয়ের সঙ্গে কেক কাটলে কি আমার চলবে?”
মা বলেছিল, “আজকাল খুব ট্যুর বেড়ে গেছে তোমার! কী এমন কাজ যে, একদিন দেরি করে গেলে হবে না?”
“জার্মানি থেকে ডেলিগেটসরা আসবে। তাদের তুমি বোলো যে, মেয়ের জন্মদিন, আপনারা পরে আসবেন! কথা বলো এমন!”
“তাও এটা তুমি ঠিক করোনি!” মা কোথাও হেরে যাচ্ছিল যেন। যেন বুঝতে পারছিল বাবা যা বলছে, তা সত্যি হয়েও কোথায় যেন সত্যি নয়! কিছু যে একটা গোলমাল আছে, মায়ের মন যেন বুঝতে পারছিল! রাধিয়ার খালি মনে হচ্ছিল দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলে দেয়, ও কী দেখেছে! বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ওদের মিথ্যে কথা বলে কার কাছে যায়? জিজ্ঞেস করে, কার জন্য কাজকর্ম আর মেয়ের জন্মদিন সব উপেক্ষা করে থাকে! কতদিন ধরে চলছে এসব? কত দিন ধরে সবাইকে এমন করে বোকা বানাচ্ছে বাবা?
কিন্তু রাধিয়া পারে না। কিছুতেই কঠিন কথা কাউকে বলতে পারে না। ঠাকুরমা ওকে বলে, “মনের কথাটা বলতে হয় রাধি। তোর ইচ্ছেটা স্পষ্ট করে বলবি। যা মনে হয় কাউকে অপমান না করে সহজভাবে বলবি। জানবি কেউ তোর মনের মধ্যে ঢুকে কিছু জেনে নেবে না!”
টেরাসে আর যেতে পারেনি রাধিয়া। ঘরেই ফিরে এসেছিল। কেমন একটা খালি-খালি লাগছিল শরীরটা। মনে হচ্ছিল, কয়েক লক্ষ ঝিঁঝিপোকা এসে ঢুকে পড়েছিল ওর শরীরে! বাবা আবার যাবে? কার কাছে যায় বাবা? কী করে সেখানে? ওর মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। খালি মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব ভেঙে গেল! সব নষ্ট হয়ে গেল! আর খুব বেশি করে যেন মনে হচ্ছিল, ওর নিজের কোনও দাঁড়ানোর জায়গা নেই। এত সম্পত্তি, এত ব্যাবসা, এত কিছু আসলে যেন তাসের ঘর! বুঝতে পারছিল মানুষের নিজের অর্জন করা জিনিস ছাড়া তাকে আর কেউ সঙ্গ দেয় না, সাহস দেয় না, ভরসা দেয় না।
“তুই যাবি, না যাবি না? তখন থেকে খুব পাঁয়তারা করছিস!” পলি বিরক্ত হল।
রাধিয়া হাসল জোর করে। আসলে একটুও হাসি পাচ্ছে না। খালি মনে হচ্ছে বাবা কী করছে? কোথায় গিয়েছে? কার সঙ্গে আছে এখন?
“হাসলে হবে?” পলি বিরক্ত হল, “আরে চল। এখানে দাঁড়িয়ে কীসের শোভা দেখছিস? ওই দেখ মেঘ করছে আবার। চল।”
সূর্য সেন স্ট্রিটের পাশে গাড়িটা রাখা আছে। এদিকটা এখন ওয়ান ওয়ে। সব গাড়ি উত্তর দিকে চলেছে। মধুদাকে ফোন করে গাড়ি নিয়ে আসতে বললে দেরি হয়ে যাবে। তার চেয়ে হেঁটে চলে যাওয়া অনেক সুবিধেজনক।
“চল,” বাকিদের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় নামল রাধিয়া।
গাড়ি আসছে হু হু করে। রাস্তা পার হওয়াই সমস্যা। একটা হাওয়া দিচ্ছে আজ। বেশ সুন্দর হাওয়া। গাছ থেকে পাতা আর হলুদ-হলুদ ফুল উড়ে আসছে! আশপাশের দোকানদাররা চিৎকার করছে। লোকজন কেউ ব্যস্ত হয়ে হাঁটছে, আবার কেউ দাঁড়িয়ে অলসভাবে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। কেউ হাসছে, আবার কেউ মনমরা! অদ্ভুত এক শেড কার্ড এই শহর!
সূর্য সেন স্ট্রিটে রোদ নেই। বাঁ দিকে সার-সার দোকান। ডান দিকেও তাই। ওই বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে বেশ জটলা। ওখানে মাঝে মাঝে ওরা কচুরি খেতে আসে। কী ভিড়, কী ভিড়! বুদা তো বলে, “শালা, এভাবে টেনশন নিয়ে লেখাপড়া করে কী হয়! ইংরেজি নিয়ে ঘষে যাচ্ছি! তার চেয়ে এমন একটা কচুরির দোকান করলে তো কাজ হয়!”
আজও দোকানটায় বেশ ভিড়। বসার জায়গা নেই। একটু পাশে আর-একটা দোকান। পরোটা, কাবাব আর রোলের। এসব জিনিস খুব একটা খায় না রাধিয়া। এই নিয়েও ওকে বান্ধবীরা খ্যাপায়।
রাধিয়া পেছন দিকে তাকাল। পলি, বুদা আর জয়তী আসছে পেছনে। সবাই ওর গাড়ি করেই যাবে।
কবিতা পাঠ, গান, গল্প পাঠ এসব হবে। রাধিয়ার যেতে ইচ্ছে করছে না একদম! কিন্তু সবসময় তো আর নিজের ইচ্ছে মতো কাজ করা যায় না! সকলের মধ্যে থাকতে হলে সকলের মতো করেও থাকতে হয়!
“এই রাধি,” পেছন থেকে বুদা এসে কাঁধটা জড়িয়ে ধরল, “কী হয়েছে?”
“কী হবে?” বুদার হাতটা সরিয়ে দিল রাধিয়া।
“আজকাল কেমন যেন হয়ে থাকিস! কেসটা কী তোর?”
“কিছু না তো!” রাধিয়া হাসার চেষ্টা করল!
