বুদা বলল, “আরে, কিছু তো হয়েইছে। তোকে কি আজ থেকে দেখছি নাকি? কী হয়েছে? প্রেমে পড়েছিস?”
“কী?” রাধিয়া বিরক্ত হল, “হঠাৎ এমন মনে হওয়ার মানে?”
“আরে, প্রেমে পড়লেই মানুষ এমন করে। দেখিস না? কেমন একটা ক্যালানে টাইপ হয়ে যায়! শালা, প্রেম হল ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো! বহুত ভোগায়!”
রাধিয়া বলল, “না, প্রেমে পড়িনি। কেউ চুপচাপ হয়ে গেলেই কি তাকে প্রেমে পড়তে হবে? তার কি আর কিছু চিন্তা থাকতে পারে না? জানবি সবার জীবনে তার-তার মতো করে ক্রাইসিস থাকে। সে সব নিয়ে কথা না বলাই ভাল।”
“রাগছিস কেন?” বুদা হেসে সামান্য ধাক্কা মারল রাধিয়াকে। বলল, “কাল তো বার্থ ডে। কী নিবি বল?”
“কী আবার নেব?” রাধিয়া ভুরু কুঁচকে তাকাল, “জানিস না আমরা কোনও গিফট অ্যাকসেপ্ট করি না! জাস্ট চলে আসবি সন্ধে ছ’টার মধ্যে!”
“দূর, সে তো এমনি লোকেদের জন্য,” বুদা নাছোড় গলায় বলল, “আমরা সেসব শুনব কেন? আমরা তো কিছু দেবই!”
“মার খাবি,” রাধিয়া হাসল, “কিছু আনবি না।”
বুদা এদিক-ওদিক দেখে চট করে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “ওই সব নিবি?”
“মানে? কীসব?”
“আরে, অ্যাডাল্ট টয়! নিবি?” বুদা তাকাল।
“কী?” অবাক হয়ে গেল রাধিয়া।
“ভাইব্রেটর, ডিলডো। বুঝিস না! আজকাল এখানেও পাওয়া যায়। আমার একটা আছে। তোর শিয়োর নেই। নিবি?”
“কীসব বাজে কথা বলছিস?” নিমেষে কান লাল হয়ে গেল রাধিয়ার।
“লজ্জা পাচ্ছিস কেন?” বুদা ঠোঁট কামড়ে তাকাল ওর দিকে, “উই অলসো হ্যাভ নিডস। ডোন্ট ইউ? আর এসব বানানো হয় কেন? মেয়েদের সেক্সুয়ালিটি বহু-বহু শতক ডিপ্রেসড ছিল। আর কতদিন? আর এটা তো ন্যাচারাল ব্যাপার। এটাকে নিয়ে এমন একটা ট্যাবু বানানোর কী আছে কে জানে! আমাদের দেশে শালা জাত-পাত-ধর্ম নিয়ে সারাক্ষণ মারামারি চলছে আর যৌনতা নিয়ে ছুঁতমার্গ এখনও গেল না। ডিজিটাল ইন্ডিয়া স্লোগানেই হয়েছে। আসলে মধ্যযুগ কাটেনি।”
“বাপ রে!” রাধিয়া বলল, “এমন বড় বক্তৃতা শিখলি কোথা থেকে? পলিটিক্স তো করিস না!”
বুদা বলল, “শিখতে হয় না। যা চলছে চারদিকে, সেই দেখে আপনা থেকেই বুকের ভেতর সব গজিয়ে ওঠে!”
রাধিয়া বাঁ দিকে ঘুরল এবার। সামনেই বিখ্যাত শরবতের দোকান। সামনেই ওদের গাড়িটা দেখতে পাচ্ছে। মধুদা গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কিছু একটা দেখছে। রাধিয়াকে দেখেই মধুদা মোবাইলটা বুকপকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ঘুরে ড্রাইভার ওঠার দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বুদা গিয়ে উঠল সামনে। পেছনে জয়তী, পলি আর রাধিয়া বসল। মধুদা জানত ওরা কোথায় যাবে। সকালে ইউনিভার্সিটি আসার সময়ই বলে রেখেছিল রাধিয়া।
রাস্তায় সাংঘাতিক জ্যাম। এই গলিটা সরু। তার মধ্যে রাজ্যের গাড়ি এসে পার্ক করে। বাঁ দিকে ফুটপাথ বলে কিছু নেই আর। সব দোকানে ভরতি। অবশ্য কলকাতায় ফুটপাথ জিনিসটা আর আছেই-বা কোথায়! কেনার চেয়ে বিক্রি করার লোক এখন বেশি!
মিনিট দশেকের চেষ্টায় গাড়িটা বড়রাস্তায় বের করতে পারল মধুদা। এবার বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটের দিকে এগোচ্ছে গাড়ি। রাস্তার ভিড় থাকলেও খুব একটা আটকাচ্ছে না।
রাধিয়া দেখল মেঘ ঘনাচ্ছে আবার। আকাশ কালো হতে শুরু করেছে। হতেই পারে। বর্ষাকাল। আগস্টের শুরু সবে। তা ছাড়া এবার নাকি বৃষ্টি কম হয়েছে। আবহাওয়ার যা অবস্থা, তাতে আর কী-ই বা হতে পারে! রাধিয়ার মনে হয় মানুষ নিজেই নিজের ঘরে আগুন লাগাচ্ছে আর নিজেই বলছে কী গরম!
“তা তুই কি রেজ়াল্ট বেরোনোর পরেই বেরিয়ে যাবি?” জয়তী অন্যপাশ থেকে ঝুঁকে তাকাল রাধিয়ার দিকে।
“মানে?” পলি অবাক হল।
রাধিয়া দেখল বুদাও সামনের সিট থেকে পেছনে ফিরে তাকিয়েছে।
রাধিয়া সময় নিল। কিছুদিন আগে ক্যান্টিনে বসে এই কথাটা জয়তীকে বলেছিল রাধিয়া। বলেছিল, কথাটা যেন গোপন রাখে। এখনই কাউকে বলার দরকার নেই। আসলে, পলি আর বুদা সব কিছু নিয়েই বড্ড হইচই করে!
“কী রে? কেসটা কী?” পলি খোঁচা দিল।
রাধিয়া হাসল, “তেমন কিছু না। ওই জাস্ট একটা ব্যাপার। বাবা বলেছিল। তাই…”
“আশ্চর্য! এত ধানাইপানাই করছিস কেন? বিয়ে করবি নাকি?” বুদা সামনের সিটে বসে ছটফট করল, “বেরিয়ে যাবি মানে? স্যাটেলাইট তো নোস যে, ইসরো তোকে লঞ্চ করে পৃথিবী থেকে বের করে দেবে! যাবিটা কোথায়?”
“ওই বাবা বলছিল আমেরিকায় পাঠাবে। ম্যানেজমেন্ট পড়তে! তাই…”
“ও বাবা!” পলি বলল, “এটা বলিসনি কেন?”
“আমি যাব কি না, তার ঠিক নেই। তাই…” রাধিয়া কথা শেষ না করে চুপ করে গেল।
বুদা বলল, “যাবি না কেন? তোদের যা পয়সা তাতে তো সারা জীবন তোকে ওখানে রেখেই পড়ানো উচিত ছিল!”
রাধিয়া চুপ করে গেল। এইসব নিয়ে কী আর কথা বলবে! এসব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। সেই এইচএস-এর পর থেকে বাড়িতে এই নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরমার সমর্থন পেয়েছে বলে এখনও ও এই শহরে রয়ে গিয়েছে। মা এই নিয়ে মাঝে মাঝেই ওকে খোঁটা দেয়। বলে, “ঠাকুমার রক্ত গায়ে আছে তো, তাই এমন হয়েছিস! মিডলক্লাসনেস একটা ডিজ়িজ়! এখানে ইংলিশ নিয়ে না পড়ে বাইরে গিয়ে পড়তিস! তা নয়, এখানে টাইম ওয়েস্ট হচ্ছে।”
বাবাও সেদিন খেতে বসে আচমকা এই প্রসঙ্গটা তুলেছিল। এমনিতেই আজকাল বাবার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না রাধিয়ার। আসলে বড় হওয়ার পর বাবাকে খুব একটা কোনওদিনই পায়নি রাধিয়া। ছোটবেলার সেই “আমার পরি!” বলে ওকে জড়িয়ে ধরা মানুষটা যেন আর নেই! তাই সেভাবে খুব একটা সহজ নয় ও বাবার কাছে। আর এখন তো বাবাকে দেখলে ওর রীতিমতো বিকর্ষণ হয়। কেবলই মনে হয় বাবা ওদের ঠকাচ্ছে।
