সেই বিকেলটার পর থেকে রাধিয়ার আজকাল আর কিছু ভাল লাগছে না। কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না। আসলে কাকে বলবে বুঝতে পারছে না। এই বিষয়ে ওকে কে সাহায্য করতে পারে? মাকে বললে বিশাল একটা গোলমাল হবে ও জানে। ঠাকুরমার বয়স হয়েছে। তা ছাড়া ঠাকুরমা খুব গম্ভীর। বিশেষ কথাবার্তা বলে না কারও সঙ্গে। তা হলে বাকি কে রইল? বুদা? পলি? জয়তী? এদের কি বলা যায়? কিন্তু একটা ব্যাপার মনে মনে জানে রাধিয়া। ওর আসলে বন্ধু বলে কেউ নেই সেভাবে। একটা গ্রুপে থাকে বটে, কিন্তু সেখানেও কাউকেই ঠিক নিজের করে ভাবতে পারে না রাধিয়া। কেউ ওকে ঠিক বোঝে না। তবে এই না-বোঝার ব্যাপারটা বোধহয় পৃথিবীর সব মানুষেরই সমস্যা।
আসলে পলি, জয়তী বা বুদা এরা সকলে ওর সঙ্গে ভাল করে কথা বললেও, একটা জিনিস রাধিয়া বোঝে, ওদের যে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটা ভাল, এটা নিয়ে অনেকেরই একটা প্রচ্ছন্ন হিংসে বা বিরক্তি আছে!
সোনাঝুরিতে একবার লোকাল ট্রেনে করে গিয়েছিল রাধিয়া। সেটা নিয়েও বান্ধবীদের মধ্যে ওকে নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়েছিল! যেন এটা একটা খেয়াল ওর! একটা শখ! যেন নতুন কিছু খেলনা! আসলে রাধিয়ারও যে নিজের মতো থাকতে ইচ্ছে করে, এই পৃথিবীটাকে ওর নিজের মতো করে দেখতে ইচ্ছে করে, সেটার যেন কোনও মূল্য নেই! সবটাই ওকে অন্যের ঠিক করে দেওয়া প্যারামিটার অনুযায়ী করতে হবে।
বান্ধবীদের খ্যাপানোতে ও তেমন কিছু মনে করে না। কিন্তু একটা জিনিস বোঝে, ওকে সিরিয়াসলি কেউ নেয় না।
এই যে বাবার ব্যাপারটার পর প্রায় সপ্তাহদুয়েক ও কোলাপস করে গিয়েছিল, সেটা নিয়ে এখন ভাল করে ভাবলে রাধিয়া বুঝতে পারে, আসলে বিশ্বাস ভাঙার সঙ্গে-সঙ্গে ওর মনের নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করছিল। ঠাকুরমা আর বাবার নামেই ওদের এত সম্পত্তি ও ব্যাবসা। তাই বাবা উলটোপালটা কোনও সম্পর্কে আটকে পড়লে তার প্রভাব পড়বে ওদের জীবনেও। যেটাকে খুব নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ মনে হচ্ছে, আসলে সেটা খুব একটা নিশ্চিন্ত আর নিরাপদ থাকবে না। এখনও কাউকে কিছু বলেনি, কিন্তু ও ক্রমশ বুঝতে পারছে, জীবনে বারবার যখনই নিরাপত্তার ওপর কোনও অনিশ্চয়তা আসবে, তখনই এমন করে ভেঙে পড়বে ও। তাই নিজের নিরাপত্তার দিকটা নিজেকেই দেখতে হবে। ও জানে শেষমেশ সবটাই হয়তো ওরই হবে! কিন্তু ভবিষ্যৎ কে দেখেছে?
“কী রে, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোকে আমরা খুঁজছি!”
পলির ডাকে মুখ তুলে তাকাল রাধিয়া। সারা দুপুর বৃষ্টির পরে এখন আকাশ কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যেন। তার ঢাল বেয়ে সূর্য ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে! মেঘে মেঘে ছিন্নভিন্ন আকাশে এক বাক্স ক্রেয়ন কে যেন ইচ্ছেমতো ঘষে দিয়েছে! কলেজ স্ট্রিটের এই জায়গাটায় দাঁড়ালে এটুকুই আকাশ দেখা যায়। বাকিটা তো, রাধিয়ার মনে হয়, যেন অগোছালো একটা ঘর! মনখারাপ থাকলেই রাস্তার এই জায়গায় এসে দাঁড়ায় ও। পাশেই ফিরোজভাইয়ের বইয়ের দোকান। ফিরোজ চেনে রাধিয়াকে। নিজের টুলটাকে এগিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। কিন্তু রাধিয়া বসতে চায় না। বসে পড়লে আকাশটাকে এই কোণ থেকে দেখা যায় না!
পলি আজ জিন্স আর হাতকাটা কুর্তি পরে এসেছে। ঢেউ খেলানো চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে মাথার ওপর টেনে আটকানো। মুখে একটা হন্তদন্ত ভাব।
“কেন?” নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল রাধিয়া।
“আশ্চর্য!” পলি বিরক্ত হল, “আজকাল এত আতা হয়ে গিয়েছিস! বাংলা অ্যাকাডেমিতে যাবি না? ভুলে গেলি?”
ও তাই তো! রাধিয়ার মনে পড়ে গেল। সুম্পার দাদাদের কীসব অনুষ্ঠান আছে। সেখানে আবার পলিদের ওই ওল্ড এজ হোমের নামটাও জড়িয়ে আছে! সে জন্য সুম্পা আর পলি দু’জনেই ওকে যেতে বলেছে। রাধিয়া প্রথমে ভেবেছিল যাবে না। কিন্তু এখন মন পালটেছে। বাড়ি গিয়েই-বা কী করবে? মা কালকের অনুষ্ঠান নিয়ে মেতে আছে। আর বাবার আজকেও কী এক কাজ আছে, আমদাবাদ যেতে হবে বলে সকালে বেরিয়ে গিয়েছে। গতকাল রাতে বাবার সঙ্গে মায়ের চাপা ঝগড়া শুনেছিল রাধিয়া। আসলে ওর ঘরটা দোতলার কোণে। ঘর থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা করিডর পেরিয়ে দোতলার টেরাসে যাওয়া যায়। রাতে মাঝে মাঝে সেই টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটে রাধিয়া। ভাল লাগে ওর।
গতকাল রাতের বৃষ্টির পরে মেঘ কেটে চাঁদ বেরিয়েছিল আকাশে। সারাক্ষণ এসি-তে থাকতে-থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল রাধিয়া। এমনিতেই ওই ঘটনাটার পরে আজকাল ঘুম আসতে চায় না ওর। গতকালও তাই হয়েছিল। ও ভেবেছিল টেরাসে গিয়ে একা-একা হাঁটবে একটু। বৃষ্টির পরে চাঁদ উঠলে আকাশটা একদম অন্যরকম লাগে।
টেরাসে যাওয়ার বড় কাচের দরজাটা বাবা-মায়ের ঘরের সামনেই। রাধিয়া দরজার হাতলে হাত দিয়ে পাল্লাটা খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মায়ের চাপা গলার চিৎকারটা শুনতে পেয়েছিল ও! একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিল রাধিয়া। মা খুব সচেতন থাকে এমন চিৎকার-চেঁচামেচি করার ব্যাপার নিয়ে। কারণ, ওদের বাড়িতে কাজের লোকজন আছে অনেক। মা চায় না ব্যক্তিগত কোনও ব্যাপার সেই সব লোকের আলোচনার বিষয় হোক!
তাই রাধিয়া অবাক হয়ে গিয়েছিল! মায়ের এমন গলা তো আগে শোনেনি! যদিও রাত একটা বেজে গিয়েছিল। পুরো বাড়ি শুনশান ছিল, কিন্তু তাও মায়ের এমন গলা শুনে খুব ঘাবড়ে গিয়েছিল রাধিয়া। ওর নিমেষের জন্য মনে হয়েছিল, তবে কি মা জেনে গেল সবটা! তা হলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! ও জানে এমনভাবে আড়ি পাতা খুবই অনুচিত কাজ, কিন্তু জীবন নিজে তো সবসময় উচিত আর অনুচিত ভেবে চলে না! তাই তাকে সামলাতে মাঝে মাঝে মানুষই এমন অনুচিত কাজ করে ফেলে। রাধিয়াও তেমনই ঠিক হচ্ছে না জেনেও দাঁড়িয়ে পড়েছিল দরজার সামনে। খুব লজ্জা করছিল আর খারাপও লাগছিল। কিন্তু কেমন একটা জান্তব প্রবৃত্তি যেন তাড়া করছিল ওকে! ক্রেভিং হচ্ছিল, কী কথা হয় জানার জন্য। ভয়ের মধ্যেও যে একরকমের থ্রিল থাকে সেটা বেশ বুঝতে পারছিল!
