টিটি যতীন দাস পার্কেই নেমে গিয়েছে। কী একটা কাজ আছে নাকি ওর! তাই এখন স্টেশন থেকে তুয়াদি আর মাহির বেরোল।
রবীন্দ্র সরোবর স্টেশন থেকে ওর বাড়ি হেঁটে দশ মিনিট। কিন্তু রাস্তায় বেরোতে গিয়ে থমকে গেল মাহির। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এদিকে ও ছাতা আনেনি। ভাগ্যিস টাকাগুলো প্লাস্টিকে মোড়া আছে! আর দু’হাজার টাকার নোট বলে বিশাল কিছু জায়গাও নিচ্ছে না।
পাশে একটা লোক এসে দাঁড়াল এবার। না, ঠিক লোক নয়। একটা ছেলে। সামান্য এলোমেলো চুল। চোখে চশমা। জামাটা অর্ধেক গোঁজা। এক হাত দিয়ে বোতাম টিপে ছাতা খুলে কানে ধরা ফোনে বলল, “আরে, কাল আমি অফিসে গিয়ে বলব। এখন সময় নেই। প্যাঁও ওয়েট করছে। আমি রাখি। কেমন?”
প্যাঁও! মাহিরের হাসি পেল। দেখল, ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে সামনে এসে দাঁড়ানো একটা বাসে উঠে পড়ল। মাহির ঘড়ি দেখল। সাড়ে ছ’টা বাজে। ভাবল, টাকাগুলো যখন প্লাস্টিকে মোড়া আছে, ও হেঁটেই বেরিয়ে যাবে। একবার বাড়ি হয়ে তারপর রিতুদার অফিসে যাবে। টাকাগুলো দিতে হবে যে।
কথাটা তুয়াদিকে বলতে, তুয়াদি ওকে ছাড়ল না। বলল, “একই জায়গায় যাব যখন, অমন নাটক করার কী আছে? দিন কে দিন ঢ্যামনা হয়ে যাচ্ছিস তুই!”
সামনেই সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখান থেকে রিকশা পেয়ে গেল ওরা। নিজের ব্যাগের সঙ্গে তুয়াদির ব্যাগটাও ধরেছে মাহির। সামনে প্লাস্টিক ফেলা। তুয়াদি যেন কোলের ওপর উঠে আসছে ক্রমে!
মাহিরের দম আটকে আসছে! ও রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করল। তুয়াদি আজকাল এমন করছে কেন! ছোট থেকে চেনে তুয়াদিকে। এমন তো করে না!
পাশ দিয়ে হুস-হুস শব্দে গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে! রবিবার কলকাতার দোকানপাট বেশির ভাগই বন্ধ থাকে। রাস্তায় লোকজনও কম।
তুয়াদি বলল, “তুই অমন করে মুখ ফিরিয়ে আছিস কেন?”
“না, এমনি,” মাহির বিরক্তিটা আর লুকোতে পারল না।
“খুব তেজ হয়েছে, না? রাগ দেখাচ্ছিস কেন?” বলেই মাহিরের থাইয়ের ওপরের দিকটায় একটা চিমটি কাটল জোরে।
মাহির দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করল। চোয়াল শক্ত করে বলল, “কী করছ তুমি?”
তুয়াদি দাঁত ঘষে বলল, “বুঝতে পারছিস না?”
মাহির হতভম্ব হয়ে গেল একদম। কী বলবে বুঝতে পারল না।
তুয়াদি বলল, “আমি মানুষ নই! আমার ইচ্ছে করে না! অনেকদিন ভাল হয়ে থেকেছি, আর নয়। তোর ভাইকে কেন দেখি আমি? বুঝিস না? আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই আর!”
“তুমি তো ভাইকে ভালবাসো নিজের সন্তানের মতো,” মাহির কোনওমতে বলল কথাগুলো!
“শুধু কি সেটাই কারণ ভেবেছিস! আমার বুঝি ইচ্ছে নেই! বিয়ে হয়নি বলে তো আর শরীর মরে যায়নি!” তুয়াদি যেন ফুঁসছে! মাহিরের পা খামচে ধরেছে! তুয়াদি বলল, “আমায় যদি না দিস, আর তোর ভাইকে দেখব না।”
“রিকশাওয়ালা শুনছে! প্লিজ়!” মাহির কাতর গলায় বলল।
তুয়াদি চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত করল। বলল, “দাদাদের কাছে আমি বেগার খাটব! তোর ভাইকে দেখব! সারাক্ষণ সেলাইয়ের কাজ করব! কেন রে? আমার আহ্লাদ নেই? আমার প্রেম-টেম দরকার নেই, কিন্তু ওইটা আমি চাই! তুই ওটা দিবি। ব্যস! আর কিছু শুনব না আমি।”
রিকশা এসে গিয়েছে ওদের বাড়ির সামনে। তুয়াদি নিজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে দুড়দাড় করে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে!
মাহির কেমন যেন থতমত খেয়ে গিয়েছে। এই তো সব ঠিক ছিল। সেখানে তুয়াদির কী হল হঠাৎ! এমন করে এসব কী বলল! তুয়াদি ওর চেয়ে অনেক বড়। সে এমন কথা ওকে বলল কী করে?
মাথা কাজ করছে না মাহিরের। ও কোনওমতে বাড়ির দিকে এগোল।
বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট ঢাকা দেওয়া বারান্দা। তার এক কোণে জুতো খুলল ও। তারপর অন্যমনস্কভাবে ঘরে ঢুকল। সামনের দরজা খোলাই থাকে মা ঘরে থাকলে। তাই ভাবল ঢুকে হয়তো মাকে দেখবে।
কিন্তু ঘরে পা দিয়েই চমকে উঠল মাহির।
“এই যে! কোথায় থাকেন আপনি? ফোন করে করে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল! নট রিচেব্ল, নট রিচেব্ল বলছে! রিচের বাইরে কী করেন সারাক্ষণ! আপনার টিকির দেখা নেই কেন? সেই যে কথা দিলেন, তার কী হল?”
মাহির দেখল ওর মা আর ভাই বসে আছে বিছানায়। আর ওদের পাশে একটা দামি লেডিজ় ব্যাগ রাখা। আর ব্যাগের মালকিন সামনে দাঁড়িয়ে ধমক দিয়ে চলেছে ওকে।
ও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বাইরে কোনও মহাকাশযান দেখল না তো! তা হলে নেপচুন থেকে মেয়েটা এল কী করে ওর এই লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া, নোনাধরা ঘরে!
মেয়েটা এখনও রাগত স্বরে কিছু বলে যাচ্ছে। মা আর ভাই বসে অবাক হয়ে শুনছে মেয়েটার কথা। কিন্তু মাহির কিচ্ছু শুনছে না। কোনও কথাই ঢুকছে না ওর কানে।
ওর শুধু মনে হচ্ছে, মেয়েটা কি একটা সরল সত্যি বুঝতে পারছে না? নেপচুনের নেটওয়ার্ক থেকে এই নোনাধরা পৃথিবীর নেটওয়ার্ক কি কেউ ধরতে পারে?
.
১৯. রাধিয়া
কাল রাধিয়ার জন্মদিন। বাড়িতে বেশ বড় পার্টির আয়োজন হয়েছে। এসব ভাল লাগে না ওর। কিন্তু ওর কোন ভাল লাগাটার মূল্য আছে যে, এটারও মূল্য থাকবে? মা এসব পছন্দ করে, তাই হবে! কী হয় এসব করে ও জানে না। একটা রেস্তরাঁ ভাড়া করা হয়েছে পার্ক স্ট্রিটে। বেশ কয়েকজন নামী মানুষকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে। ওকেও মা বলেছে ওর বান্ধবীদের নেমন্তন্ন করতে। অবাক হয়ে যায় রাধিয়া। মা কী করে এমন বোকা হয়ে থাকতে পারে? বাবা কী করে চলেছে, সেটা কি মা জানে না?
