পলি বুঝিয়ে-বুঝিয়ে দিচ্ছিল নানা জিনিস। আর মাহির মাথা নাড়ছিল খুব। মানে খুব বুঝতে পারছে আর কী, এমন একটা ভাব। কিন্তু আসলে তেমন কিছুই মাথায় ঢুকছিল না! পলির মতো মেয়েদের এত কাছে কোনওদিন আসেনি মাহির।
ওর তো বয়েজ় স্কুল ছিল। তাও সব তেমনই ছাত্র! যেমন তাদের আচার-ব্যবহার তেমন মুখের ভাষা! মেয়েরা চিরকাল ছিল নেপচুন-প্লুটোর বাসিন্দা! তার ওপর মাহির ছিল লাজুক। তাই আরওই কিছু হয়নি!
শুধু স্কুল যাতায়াতের পথে ও বড়-বড় স্কুলের নীল বর্ডার দেওয়া হলুদ বাসগুলো দেখত, দেখত সেই বাসের জানলায় নেপচুন আর প্লুটোর মেয়েরা বসে আছে। দেখলেই যেন মনে হত, এদের কাছে যাওয়া মানা। এদের ভাষা, খাবার, পোশাক সব আলাদা। একদমই ওদের পৃথিবীর মতো নয়।
সেই নেপচুন থেকে পলি যেন নেমে এসেছিল মাহিরের পাশে! হাসলেও যেন ঝকঝকে দাঁতে বিজ্ঞাপনের তিরিশ সেকেন্ড ঝলসে উঠছে! পাশে দাঁড়ালে কী দারুণ সেন্টের… মানে ইয়ে, পারফিউমের গন্ধ! হাত নেড়ে কথা বলার সময় আঙুলগুলো দেখছিল মাহির। নখটাও কি স্কেল দিয়ে মেপে কেটেছে! নেলপলিশ না পরেও কী করে এমন হালকা গোলাপি হয় নখগুলো? সাজেনি একটুও, কিন্তু তাও কেমন যেন ইন্টিরিয়ার ডিজ়াইনার দিয়ে সাজানো একটা মেয়ে! মাহিরের মাথা সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। ও শুধু স্প্রিং-এর ঘাড়ওয়ালা পুতুলের মতো মাথা নাড়ছিল! বুঝতে পারছিল, ওর বারোটা বেজে গিয়েছে! ওই মেঘের ওপারের লোকটা কাঙালকে শুধু শাকের খেতের সামনে দাঁড় করায়নি, গড়িয়াহাট বাজারের রমরমে সবজির দোকানগুলোর সামনে মাটির সঙ্গে পুঁতে দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে!
সব ঘুরে দেখার পরে গেটের কাছে এসে ওরা দাঁড়িয়েছিল। পলি বলেছিল, “ওই সামনে যে-মাঠটা দেখলেন, ওটা আমাদের ছিল। একটা ক্লাব ইদানীং দখল করে নিয়েছে। ওটা যদি খালি করিয়ে দিতেন একটু, তা হলে বাড়ি আর মাঠটা নিয়ে পাঁচিল তুলে দিতাম আমরা। বয়স্ক মানুষগুলোর একটু হাঁটার জায়গা হত। আর-একটা উইংও খুলতে পারতাম। বেশির ভাগ মানুষ তো এই বয়স্কদের ফুরিয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে যাওয়া ব্যাটারি মনে করে! জীবনে মানুষ তো গুডনেসের পেনশন পায় না!”
মাহির যত না কথা শুনছিল, তার চেয়ে বেশি দেখছিল পলিকে। এমন একটা মেয়ে এসব করে! শুনেছে মাস্টার ডিগ্রিও করছে! এত কিছু সামলায় কী করে? ওর তো একটুতেই সব কিছু জড়িয়ে, গিঁট পাকিয়ে যায়!
পলি কথা বলতে-বলতে নিজের অজান্তেই আলতো করে ছুঁয়েছিল মাহিরের হাতটা। বলেছিল, “আমরা নিজেরা টাকাপয়সা নিই না। তাই যদি রিতুদাকে একটু বলেন ব্যাপারটা। প্লিজ়!”
মাহিরের মনে হয়েছিল, ওর হাতে থাকলে সারা ভারতবর্ষের বাজেট এই হোমের পেছনে দিয়ে দেয়! কিন্তু ওর হাতে তো কুড়ি টাকার মিষ্টি কিনে দেওয়ারও ক্ষমতা নেই!
মাহির বলেছিল, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব, কথা দিলাম।”
কথা দিল? শেষের দুটো শব্দ বলেই মনে হয়েছিল, এই রে! বেশি বলে ফেললাম কী? মেয়েটা কি ওর হ্যাংলামো বুঝে ফেলল? শুনেছে মেয়েরা নাকি খুব বুঝতে পারে এসব জিনিস। মাহির মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। নিজের সস্তার জামা, রং নিভে আসা প্যান্ট, চল্টা ওঠা স্নিকার্স দেখে মনে হচ্ছিল, ওর নিজেরই তো ত্রাণ আর সাহায্য দরকার। এখানে ও কিনা এসব নিয়ে আর্জি শুনছে!
“আপনি চেষ্টা করলেই হবে, আমি জানি আপনি চেষ্টা করবেন, আমি ভরসা করছি আপনার ওপর… বিশ্বাস করছি,” পলি কথাটা বলে আকাশজোড়া বড়-বড় চোখ তুলে তাকিয়েছিল মাহিরের দিকে। আর মাহির বুঝেছিল এমন আকাশ আছে বলেই মানুষের মাঝে মাঝে পাখি হতে ইচ্ছে করে!
রিতুদা ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছিল পঁচিশ সেকেন্ডে। বলেছিল, “আরে, মেয়েটা মাথা খেয়ে নেয় একদম! তাই তোকে পাঠিয়েছিলাম। ও পরে দেখব। এখন সোনাঝুরির দিকে মন দে। শালা ওখানে টাকার বৃষ্টি শুরু হল বলে! শোন, আমাদের দেশে আসল রেন ওয়াটার হারভেস্টিং হোক আর নাই হোক, টাকার বৃষ্টি হলে সেই হারভেস্টিং-এর জন্য লোক সবসময় রেডি থাকে!”
“আমি কিন্তু দেখলাম রিতুদা, ওদের ফান্ডের দরকার। কত বয়স্ক মহিলারা থাকেন! প্লাস ওদের ওখানে একটা ক্লাব জবরদখল করে…” মাহির উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল একটু।
রিতুদা তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে তাকিয়েছিল ওর দিকে। তারপর হেসে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে দেখলে অনেকেই পিছলে যায় খোকা। কিন্তু কাজের সময় আলুবাজি নয়! প্রফেশনাল ফিল্ডে আলুবাজি করেছ কি গেছ! এখন আমাদের সোনাঝুরিতে মন দিতে হবে, কেমন?”
মেট্রো থেকে রবীন্দ্র সরোবরে নেমে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মাহির। রবিবার বলেই কি না কে জানে, ট্রেনে কী ভিড়! দমদমে এত ভিড় যে, গেটে কোনও চেকিং হয়নি আজ। ট্রেনটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা কোনওমতে দৌড়ে উঠেছিল কামরায়। এসি রেক পায়নি, তাই সারাক্ষণ বিকট শব্দ আর গরমে সেদ্ধ হতে হতে এসেছে। তুয়াদি লেডিজ় সিটে জায়গা পেয়ে গিয়েছিল বলে আর সারাটা রাস্তা গায়ের ওপর পড়েনি ওর।
ট্রেন থেকে নামার সময় একদম ওর পেছনে এসে লেপটে ছিল গায়ের সঙ্গে। কিন্তু সেটা ভিড়ের ঠেলায় না ইচ্ছে করে, তা জানে না মাহির। আর সত্যি বলতে কী, জানতেও চায় না। বেকার এসব জিনিস নিয়ে মাথা ভরতি করে নিলে আর বাঁচা যাবে না।
