“কীসের কাজ?” তুয়াদি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“এমনি ইয়ে…” মাহির দ্রুত মনে মনে কথা বানাতে শুরু করল। কী বলা যায়! রিতুদার কাজে এসেছে সেটা বলা যাবে না। তা হলে আরও নানা প্রশ্ন করবে তুয়াদি। রিতুদাকে সবাই ভয় করে, তেলিয়ে চলে! কিন্তু পেছন ঘুরলেই গুন্ডা বলে। তুয়াদিও সেই দলেই। তাই সবারই রিতুদার কাজকর্ম নিয়ে কৌতূহল আছে!
মাহির বলল, “ওই ওরা বাংলাদেশে কিছু জিনিস এক্সপোর্ট করে। তাই মানে…”
“তো নিজে আসতিস, এই মর্কটটাকে আনলি কেন?” তুয়াদি টিটিকে দেখিয়ে জোরে-জোরেই বলল।
অন্য কেউ হলে টিটি এসব কথার বিনিময়ে গালাগালি দিয়ে তার বাপের শ্রাদ্ধ করে দিত। কিন্তু তুয়াদিকে যমের মতো ভয় করে ও। টিটি তুয়াদির কথায় হি হি করে একটা হাসি দিল। পরিস্থিতি ম্যানেজ করার হাসি।
তুয়াদি বলল, “আর দাঁত দেখাতে হবে না। ওগুলো এমনিতেই দেখা যায়!”
মাহির দেখল ব্যাপারটা অন্যদিকে যাচ্ছে। ও বলল, “তুমি এখানে… মানে…”
“কেন তুই জানিস না? বারাসতে আমার মাসির বাড়ি। তাই এসেছিলাম। কাকিমাকে তো বলে এসেছি। তোকেও তো বলেছিলাম।”
“ও হ্যাঁ তা ঠিক। আসলে ভুলে গিয়েছি আর কী!”
মাহির দেখল দমদম জংশন ঢুকছে। ও তাকাল টিটির দিকে। কী করবে বুঝতে পারল না। মেট্রোয় গেলে তো গেটে চেক করে আজকাল। সেখানে যদি ধরা পড়ে যায়! এই নিয়ে টিটিকে বলেওছিল আগে। ও ভেবেছিল শিয়ালদায় নেমে সাউথ সেকশনের ট্রেন ধরবে বা ট্যাক্সি করে নেবে!
টিটিও ওর দিকে তাকাল। মানে কী করবি?
তুয়াদি উঠে দাঁড়াল এবার, “চল নামবি। এখান থেকে মেট্রো করে রবীন্দ্র সরোবর চলে যাব। তাড়াতাড়ি হবে।”
“আমরা ভাবছিলাম,” মাহির তোতলাতে লাগল, “মানে… শিয়ালদা গিয়ে…”
“চল!” তুয়াদি মাহিরের হাত ধরে টানাটানি শুরু করল।
মাহির বাধ্য হয়ে উঠল সিট থেকে। তুয়াদিকে বিশ্বাস নেই। সিন ক্রিয়েট করতে লজ্জা পায় না!
মেট্রোর টিকিট কাউন্টারের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল মাহির। কী সুন্দর বাঁশি বাজছে! ও দেখল একজন বৃদ্ধ বাঁশিওয়ালা সাইডব্যাগে অনেকগুলো বাঁশি নিয়ে বড় গেটের এক পাশে দাঁড়িয়ে। কী অদ্ভুত বাঁশি বাজান মানুষটি!
তুয়াদিও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর এগিয়ে গেল বাঁশিওয়ালার দিকে। মাহির আর গেল না। তুয়াদির এই এক অভ্যেস। সারাক্ষণ কিছু না-কিছু কিনতেই থাকে! ও দেখল তুয়াদি বাঁশি কিনল একটা। মানুষটার সঙ্গে কথাও বলল একটু।
টিটি পাশে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় বলল, “শালা, এই মালটা জুটে ঝাড় হয়ে গেল তো! এখন মেট্রোয় যদি আটকায়! আমার যা চেহারা, ক্রিমিনাল বলে ধরে নিয়ে কেলিয়ে লাট করে দেবে! তোকেও হাম্পু কম দেবে না! তুই শালা উঠলি কেন?”
মাহির কিছু বলার আগেই তুয়াদি ফিরে এল, “তোরা কি ক্যালানে? টিকিটের লাইনে দাঁড়াসনি কেন? যা টিকিট কাট আগে!” বলেই একটা একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিল টিটির দিকে।
টিটি আর কথা বাড়াল না। টিকিটের লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
তুয়াদি তাকাল মাহিরের দিকে। তারপর আলতো করে ওর কনুইয়ের ওপরটা ধরে বলল, “এত ভাল চেহারা তোর। পুলিশে যাস না কেন?”
মাহির কী বলবে ভেবে পেল না।
তুয়াদি আবার বলল, “ফুটবলে কিছু হবে না। আমি যে-কারখানাটা করব সেখানে আমার সঙ্গে কাজ করবি? আমার তো লোক লাগবেই! তুই বেশ ম্যানেজারি করবি। আমার লোক তুই। তোকে তো বিশ্বাস করি আমি।”
মাহির কথাটা শুনে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল! সেদিন পলিও এমন একটা কথা বলেছিল না ওকে!
পলি! নামটা মনে পড়লেই ওর মনে হয় নিউ মার্কেটের ফুলের বাজারে দাঁড়িয়ে আছে ও! এমন একটা মেয়ে এই কলকাতায় ছিল! পলির কথা মনে পড়লে ভেতরে-ভেতরে গলে যায় মাহির। বড়-বড় বাদামি চোখ। অমন টিকালো নাক! এসব মেয়েকে ভগবান কেন পাঠায় ওর সামনে! ও নিজেদের ওই ছোট্ট নোনাধরা ঘরে, চৌকির ওপর শুয়ে রাতে পলির কথা ভাবে। কোলবালিশ জড়িয়ে মনে মনে আদর করে পলিকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বোঝে পলির কথাই মনে পড়ছে। বোঝে এখন উঠে দাঁড়ানো যাবে না সবার সামনে!
ওল্ড এজ হোমটার নাম ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছের গ্রিক চার্চের পাশের গলি দিয়ে কিছুটা গেলে বাঁ দিকে একটা রাস্তা ঢুকেছে। সেই রাস্তার ওপর একটা দোতলা বাড়িতে এই ওল্ড এজ হোমটা বানানো হয়েছে।
রিতুদা বলেছিল ওকে যেতে। পলির সঙ্গে কথা বলে এক শনিবার বিকেলে গিয়েছিল মাহির। টিটি যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মাহির যেতে দেয়নি।
টিটি বলেছিল, “কেন, আমায় নিবি না কেন?”
মাহির গম্ভীরভাবে বলেছিল, “রিতুদা আমায় একাই যেতে বলেছে। তোকে নিলে রাগ করবে!”
টিটি সরু চোখে তাকিয়ে গাঁজার পুরিয়া বানাতে-বানাতে বলেছিল, “ফরসা মেয়েছেলে বলে আমায় কাটিয়ে দিচ্ছ! আমি কি দেখিনি ভেবেছ? সেদিন এসেছিল রিতুদার অফিসে। শালা কারেন্ট অফ-এ মনে হচ্ছিল পাড়ায় সার্চলাইট ঘুরছে! এমন জিনিসের কাছে এক-একা যেতে চাও! আচ্ছা যাও। আমার শালা ব্রিজের পাশের লতুবউদিই ঠিক আছে।”
হোমটার দুটো তলায় তিরিশ জনের মতো থাকেন। সবারই বেশ বয়স হয়েছে। এটা মহিলাদের হোম। পলির সঙ্গে সব ঘুরে-ঘুরে দেখেছিল মাহির। কীভাবে সবাই থাকেন, কী খান, কোথায় বসে গল্প করেন সবাই, কোথায় রান্না হয়— সবটা দেখছিল।
