“নে ঢুকিয়ে রাখ,” তুয়াদি মাহিরের দিকে বাড়িয়ে দিল প্যাকেটটা।
হাতের ব্যাগটায় খেলনাটা ঢুকিয়ে ব্যাগটা কোলের ওপর নিল মাহির। এতে সাড়ে ছ’লাখ টাকা আছে। বারাসতের একটা পার্টির কাছ থেকে কালেকশন। কীসের কালেকশন সেটা জানে না মাহির।
রিতুদা গতকাল ডেকেছিল মাহিরকে। বলেছিল, “কাল সকালে বারাসত চলে যাবি। টিটি আর তুই। পেমেন্ট আছে একটা। নিয়ে আসবি। ক্যাশে দেবে। ফলে সেভাবে আনবি। মনে থাকে যেন!”
“ঠিক আছে রিতুদা,” মাথা নেড়েছিল মাহির।
“আর শোন,” রিতুদা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, “ব্যাগটা তোর কাছে রাখবি, টিটির হাতে দিবি না। গাড়ি করে চলে আসিস।”
কিন্তু গাড়ি করতে পারেনি মাহির। বারাসতে কী একটা ঝামেলা হয়েছে। রাস্তা অবরোধ। তাই গাড়ি করা যায়নি। তার ওপর আবার তুয়াদি এসে জুড়ে বসেছে! কী যে জ্বালা!
টাকা কালেকশন করে কোনও গাড়ি না পেয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে বারাসত স্টেশনে এসেছিল মাহিররা। ভয় লাগছিল ওর। সঙ্গে এতগুলো টাকা। কিছু হয়ে গেলে রিতুদা আস্ত রাখবে না।
টিটি বলেছিল, “রিতুদাকে একটা ফোন করে জানাবি যে, এখানে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না?”
“না!” মাহির মাথা নেড়ে বলেছিল, “রিতুদা টেনশন করবে। তার চেয়ে ট্রেনে বেরিয়ে যাই চল।”
স্টেশনে লোকের মাথা লোকে খাচ্ছিল! মাহিরের আরও ভয় লাগছিল দেখে। এত লোক! কী যে ভিড় হবে ট্রেনে! আর ব্যাগটা যদি ছিনতাই হয়ে যায়!
আকাশের দিকে তাকিয়েছিল মাহির! মেঘ করছে আবার। জুলাই মাস। ভরা বর্ষা চলছে। এখন বৃষ্টি এলেই মুশকিল হবে, ভেবেছিল মাহির।
“এত ভিড়ে ট্রেনে ওঠা খতরনাক হয়ে যাবে কাকা!” টিটি বলেছিল, “তার চেয়ে কয়েকটা ট্রেন ছেড়ে দিই চল। খিদেও লেগেছে। কিছু সাঁটিয়ে নিই চল।”
চারটে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল ওরা। স্টেশনেই একটা দোকান থেকে পরোটা আর আলুর তরকারি খেয়েছে এর ফাঁকে। মাহির খেলাধুলো করে, তাই এমন তেলজবজবে খাবার ও খেতে চায় না। কিন্তু উপায় নেই। খিদে বড় বালাই। তা ছাড়া আজকাল খেলাটা কেমন যেন জীবন থেকে আস্তে-আস্তে সরে যাচ্ছে ওর। সাতাশ হতে চলল, এখনও সেকেন্ড ডিভিশনে পড়ে আছে। বড় ক্লাবে ডাকে না। ট্রায়াল হয় না। পতাদার ঢপবাজি শুনে-শুনে কান পচে গেছে। মাহির ক্রমশ বুঝতে পারছে যে, আমাদের দেশে লোকে বিদেশি ফুটবল দেখে আর ক্রিকেট খেলে। এখানে কিছু হওয়া যায় না ফুটবল খেলে।
খাবার খেতে-খেতে এ সবই সাতপাঁচ ভাবছিল আর ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ একটা আলতো করে থাপ্পড় মেরেছিল পিঠে! ও খাবারের প্লেট হাতে ঘুরে দেখেছিল, তুয়াদি!
“কী রে, ব্যাগটাকে ওরকম প্রেমিকার মতো জড়িয়ে বসে আছিস কেন?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।
এই কামরার শেষ সিট এটা। টানা লম্বা। সাতজন বসতে পারে। কিন্তু ন’জন বসেছে! সব জায়গাতেই এমন অবস্থা! অটোয় কলকাতার একটু কোণের দিকে গেলেই উপচে পড়া মানুষ তুলে নেওয়া হয়। জেলাগুলোয় ট্রেকার চলে, নাকি আঠার বিজ্ঞাপনের সেই মানুষঠাসা গাড়ি চলে কে জানে! বাসে লোক ঝুলছে! মেট্রোতেও মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করা যায় না! দূরপাল্লার ট্রেনে পর্যন্ত রিজ়ার্ভ সিটকে বাপের সম্পত্তি ভেবে ঠেসে বসে যায় সব। ভাগ্যিস প্লেনে ঝুলে যাওয়া যায় না! গেলে পাইলটকে যে ক’জন মানুষকে কোলে বসিয়ে নিয়ে যেতে হত কে জানে! মাহির বোঝে, গোটা দেশ তেঁতুল পাতার কনসেপ্টে চলছে!
তুয়াদি একদম লেপটে বসেছে মাহিরের সঙ্গে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে ওর। আজকাল তুয়াদির যে কী হয়েছে! নানা অছিলায় মাহিরের গায়ে হাত দেয়! এত বিরক্ত লাগে ওর! কিন্তু কিছু বলতে পারে না। ও জানে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু-শুধু ওকেই ভুল বুঝবে!
এখনও ভাল লাগছে না মাহিরের। তুয়াদির বুকটা ওর ডান দিকের কনুইতে লাগছে। ও টিটির দিকে সরে যেতে চাইছে, কিন্তু জায়গা নেই বলে পারছে না। আর ওর মনে হচ্ছে, তুয়াদি যেন ইচ্ছে করে ওর কনুইতে নিজের শরীরটা ঘষছে!
“কী রে বল, কী আছে তোর ব্যাগে? এখানে কী করতে এসেছিলি?” তুয়াদি জিজ্ঞেস করল।
টিটি অন্য সময় ফটফট করে, কিন্তু আজ চুপ। তুয়াদিকে খুব ভাল করে চেনে টিটি। আর ভয় পায়। সেই প্রপোজ় করতে গিয়ে মার খেতে-খেতে বেঁচে যাওয়ার ব্যাপারটা এখনও ভোলেনি! তুয়াদি টিটিকে দেখলেই নানাভাবে কথা শোনায়! আজও স্টেশনে বলেছিল, “এই মর্কটটার সঙ্গে এসব গিলছিস? ওর সাপের বিষও হজম হয়ে যায়। কিন্তু তুই? ভাইটা অসুস্থ হয়েছে, এবার কি তুই হবি?”
তাই টিটি একটু সরে-সরে থাকছে। তুয়াদির সঙ্গে যাতে কথা না হয় এমন করে মুখ ঘুরিয়ে রাখছে।
মাহির বলল, “না, আমার কিছু সার্টিফিকেট আছে। সেই কাজেই এসেছিলাম এখানে…”
“সেই কাজে মানে? কী কাজে?” তুয়াদি আরও চেপে এল মাহিরের কাছে।
হালকা সেন্ট আর পাউডার মেশানো একটা গন্ধ পাচ্ছে মাহির। কানের পেছনে দেখছে পাউডার লেগে আছে একটু। কেন জানে না, মাহিরের ইচ্ছে করছে উঠে চলে যেতে!
“কী কাজে এসেছিস বল। আজ রবিবার, আজও কাজ!” তুয়াদি মাহিরের থাইতে হাত দিয়ে ঠেলল।
মাহির কুঁকড়ে গেল একদম। বলল, “হ্যাঁ, ওই একটা চাকরির জন্য। এখন আর রবিবার মানেই সব ছুটি এমন নয়। ইন্টারভিউ ছিল একটা তাই…”
