মাহির হাঁ হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। দুপুরের বনগাঁ লোকাল। গাড়ি দুর্গানগর ছেড়ে গিয়েছে। ভিড় যা ছিল মোটামুটি নেমে গিয়েছে মধ্যমগ্রাম স্টেশনে। এখন যারা আছে, সব বসেই আছে। সেখানে এই লোকটি সুর করে একটানা বলে গেল এসব! এসব কী?
লোকটাকে দেখল মাহির। বেঁটে, শুকনো চেহারা। সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে। জামাকাপড়ও ময়লা। কাঁধে একটা ঝোলা। তাপ্পিমারা। আর হাতে প্লাস্টিকের সস্তা খেলনা। একটা সবুজ রঙের ব্যাঙ। ব্যাঙের সামনের পা দুটোতে করতাল লাগানো। খেলনার নীচের একটা ‘ইউ’-আকৃতির লিভারে চাপ দিলে ব্যাঙের পা দুটো তালির মতো করে কর্তালটা বাজায়!
খুবই সাধারণ খেলনা। মাহির বহুবার দেখেছে। কিন্তু সেটাকে যে কেউ এভাবে বিক্রি করতে পারে, সেটা ওর চিন্তাতেও ছিল না!
মাহির দেখল সবাই লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ-কেউ হাসছেও। কিন্তু লোকটার তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বলেই চলেছে এসব জড়ানো-প্যাঁচানো কথা!
মাহির শুনল একজন তো বেশ চেঁচিয়েই বলল, “মালটাকে ট্রেন কাত করে ফেলে দে তো!”
কিন্তু লোকটা পাত্তাও দিল না! সে কর্তাল বাজাতে-বাজাতে এসব বলে চলেছে!
“মালটা এখানেও এসে জুটেছে?” পাশ থেকে টিটি চাপা গলায় বলল।
“মানে?” মাহির তাকাল টিটির দিকে।
“আরে, নকুর সেই পাগলা দাদাটা! বলেছিলাম না, লেক মার্কেটে একজনকে কেলিয়েছে বলে পুলিশ ধরেছিল! রিতুদা তারপর ছাড়ায়। সে মাল দেখছি বই ছেড়ে এখন খেলনা ধরেছে।”
মাহির অবাক হল। লোকটা যা বলছে সেটা কতদূর সত্যি তা জানার মতো বিদ্যে ওর নেই, কিন্তু লোকটা নিজে এত কিছু জানল কী করে? আর সামান্য একটা খেলনা কেউ যে এমন করে বিক্রি করতে পারে, সেটাই তো ভাবতে পারে না ও!
লোকজন হাসাহাসি করলেও মাহির দেখল চারজন কিনল খেলনাটা!
“এই যে ভাই, এদিকে আসবেন তো!” পাশ থেকে তুয়াদি হাত তুলে ডাকল খেলনাওয়ালাটাকে।
মাহির ঘাবড়ে গেল। তুয়াদির আবার কী হল? ও এসব কিনছে কেন?
মাহির চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হল তুয়াদি? তুমি কী করছ?”
তুয়াদি বিরক্ত হয়ে তাকাল, “খেলনা কিনব। কেন? তোর আপত্তি আছে?”
মাহির চুপ করে গেল। ও কেন আপত্তি করবে! ও আপত্তি করার কে! কিন্তু তুয়াদি নিজে বিয়ে করেনি। ভাইদের সংসারে থাকলেও আলাদাই খায়। তা হলে কার জন্য কিনবে এসব? তুয়াদি সেলাই করে ভালই রোজগার করছে এখন! কে এক লোক নাকি জামাকাপড় এক্সপোর্ট করে এমন কিছু ছোট কোম্পানির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে। তারা ভালই কাজ দিচ্ছে। এমনকী, সেদিন তো মাহিরকে বলছিল রিতুদাকে বলে একটা ঘর দেখে দিতে। গেঞ্জির ফ্যাক্টরি দেবে।
“গেঞ্জি!” মাহির খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল, “তুমি ফ্যাক্টরি দেবে? বিক্রি করবে কোথায়?”
“তোর জেনে কাজ কী! আমার নিশ্চয় কানেকশন আছে! আমি তো ছাগল নই যে, এমনি-এমনি জায়গা দেখছি!”
মাহির আর কথা বাড়ায়নি। আসলে আজকাল কী হয়েছে তুয়াদির কে জানে! আগে তো এমন করত না! কয়েকমাস যাবৎ ওর সঙ্গে দেখা হলেই কেমন একটা ঝাঁজি মেরে কথা বলে। চিমটি কেটে উত্তর দেয়। যেন পছন্দ করছে না। আবার নিজের যা কাজ ওকেই ডেকে করায়। মাহির কথা না বললে রাগ করে। ওর গায়ে আচমকা হাত দেয়। এসব কী করছে তুয়াদি? কিছুই বোঝে না মাহির। ও যথাসম্ভব এড়িয়ে থাকে।
কিন্তু মা রাগ করে। বলে, “তুয়া আছে, তাই তোর ভাইটা বেঁচে আছে। আমি কাজে বেরোই। তুইও টইটই করে বেড়াস। তুয়া না থাকলে তোর ভাইকে কে দেখবে? ও যা বলে করে দিবি। আমায় যেন আর বলতে না হয়!”
মা আজকাল সারাক্ষণ রেগে থাকে। ভাইয়ের জন্য যে মায়ের দুশ্চিন্তা হয় সেটা ও বোঝে। কিন্তু তার সঙ্গে ও যে রিতুদার হয়ে এটা-ওটা কাজ করছে সেটা মা মানতে পারে না। ভাইয়ের ডায়ালিসিস শুরু হয়েছে। রিতুদাই বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। তাই মা খুলে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে মায়ের একটা আশঙ্কা আছে যে, মাহির খারাপ পথে চলে যাচ্ছে!
রিতুদা কিন্তু মাহিরকে কোনও খারাপ কাজে পাঠায় না। নানা ব্যাবসা আছে রিতুদার। সে সব জায়গায় টাকা কালেকশনের কাজটা করতে হয় ওকে। কেউ দিতে দেরি করলে একটু কড়াভাবে বলতে হয়। সেটা অবশ্য পারে না ও। মাহির কাউকেই কড়াভাবে কিছু বলতে পারে না। সেই কাজটা করে দেয় টিটি।
মাঝখানে টিটি যে নিজের অটোটা চালাত, সেটা আর চালায় না। ভাড়ায় একটা লোক চালায় এখন। মাস গেলে একটা টাকা নেয় টিটি। ওরা বলে বাতচিৎ। টিটি নিজে এখন রিতুদার কাছেই সারাক্ষণ কাজ করছে।
টিটি ওকে বলেছে, “দ্যাখো কাকা, তুমি হলে হাওয়া-ভরা মাল! শরীরটাই বড়। মুখ খুললে একদম ন্যাদাবোদা, চার অক্ষরের বোকা! কেউ টাকা না দিলে বা লেবাররা ট্রাবল করলে তোকে কিছু বলতে হবে না। আমি যা ফাটাবার ফাটাব। তুই শুধু বিশাল চেহারাটা নিয়ে ভুরু কুঁচকে, রাগী মুখ করে তাকিয়ে থাকবি! সাইলেন্ট সিনেমা হয়ে থাকবি কিন্তু। বুঝলি! একদম দাতা কর্ণের মতো মুখ খুলবি না! বুঝেছিস?”
মাহির কথা শোনে টিটির। মুখ খোলে না। চোখমুখ খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে!
“ক’টা দেব দিদি?” লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে!
“দুটো,” তুয়াদি কুড়ি টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল সামনে।
লোকটা দুটো খেলনা একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে দিল। তারপর এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট আসছে সামনে।
