“আরে, বোলো না, আমাদের একটা পার্টির মিটিং আছে। তাই এসেছি কাজুদার সঙ্গে।”
“কাজুদা এসেছে!” পেখম না চাইতেও কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে! সারা গায়ে কদম ফুটে উঠল যেন!
“হ্যাঁ তো,” বিজন বলল, “আমায় তো আসতে দিতেই চায় না। শেষে আমি জোর করে এলাম। আসলে আমাদের পার্টির ব্যাপার তো। আমি দূরে থাকি কেমন করে! বিমলদা বলেছেন আমাদের আরও তৈরি হতে হবে! না হলে…”
“কাজুদা কই রে?” পেখম এদিক-ওদিক তাকাল।
এই জায়গাটায় বেশ ভিড়। তা ছাড়া আজ শুক্রবার। আশপাশের কারখানাগুলোর উইকলি পেমেন্টের দিন। মানুষজন বাজারহাট করে আজ। তাই ভিড়ে জায়গাটা গিঁট পাকিয়ে আছে সামনে। সন্ধে ঘন হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে লোকজন আরও বাড়ছে!
“এইখানেই তো কোথায় ছিল!” বিজন ঘুরে ভিড়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
পেখম সামান্য এগিয়ে গেল রাস্তার দিকে। এত লোক! তার মধ্যে কোথায় আছে কাজু! ও দ্রুত পৃষ্ঠা ওলটানোর মতো করে মানুষের মুখগুলোকে পালটে দেখতে লাগল। কাজু কই? দেখা পেলে দ্রুত যাবে ওর কাছে। কাজুকে যে বলতে হবে সব কিছু। ওর সঙ্গে কী হচ্ছে, সেটা যে জানাতেই হবে।
বিজন আরও কিছু বলত, কিন্তু কিছু একটা দেখে থমকে গেল। পেখম বুঝল ওর পেছনে কাউকে দেখেছে বিজন। ও মুখ ঘোরাল। দেখল মা বেরিয়ে এসেছে দোকান থেকে। মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে রাগে।
“তুই… তুই… মিতুকে কী বলেছিস?” মা যেন কাঁপছে! যেন ভুলে গিয়েছে ওরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে!
মা আবার বলল, “এত বাড় বেড়েছিস? এতটা বাড়? ভেতরে চল। চল ভেতরে। মিতুর কাছে ক্ষমা চাইবি চল!” মা এগিয়ে এসে পেখমের হাতটা ধরতে গেল। আর ঠিক তখনই পেখম শুনতে পেল বিজন যেন অস্ফুটে বলল, “কাজুদা!”
পেখম কথাটা শোনামাত্রই মায়ের বাড়ানো হাত থেকে সরিয়ে নিল নিজের হাত। তারপর এক ঝটকায় ঘুরে তাকাল রাস্তার ওই পারের দিকে। দেখল ভিড়ের ভেতর সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কাজু।
পেখমের যে কী হল, ও নিজেও যেন বুঝতে পারল না। মায়ের রাগ, মানুষের ভিড়, সব কিছু যেন নিমেষে মুছে গেল ওর সামনে থেকে! ওপাশ দিয়ে আসা রিকশার সারিকে তুচ্ছ করে দৌড়ে গেল অন্য পারে।
“কাজুদা!” পেখম আর্তনাদের মতো করে ডাকল।
কাজু সামান্য চমকে তাকাল ওর দিকে।
“কাজুদা আমি… আমি তোমায়…”
পেখমের সমস্ত কথা একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল যেন। কিন্তু কোনও কিছু ঠিকমতো বলার আগেই দেখল কাজু কেমন যেন শক্ত হয়ে গিয়েছে।
কাজু স্থির চোখে একবার পেখমকে দেখল। তারপর দ্রুত সাইকেলে উঠে পড়ল। পেখমকে কিছু বলতে না দিয়ে ভিড়ের ভেতর সাইকেলের বেল বাজাতে-বাজাতে যতটা দ্রুত সম্ভব অদৃশ্য হয়ে গেল।
পেখম তাকিয়ে রইল ভিড়ের দিকে। কাজু কথা বলল না ওর সঙ্গে! এভাবে চলে গেল! কেন গেল? কী চায় কাজু? কী শুনেছে ও যে, এমন করে চলে গেল?
চারদিকের ভিড় আর হট্টগোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল পেখম। আর অবাক হয়ে দেখল, ওর সামনে থেকে আস্তে-আস্তে ঝাপসা হয়ে মুছে যেতে শুরু করেছে মানুষজন, গাড়িঘোড়া, দোকান-বাজারসমেত সকল দৃশ্যপট!
এক নির্জন, জনহীন প্রান্তরে যেন দাঁড়িয়ে রইল পেখম। যেন দেখতে পেল বহু বছর আগের এক গ্রামে উন্মাদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে এক তরুণ। বলছে প্রেম নেই! আর প্রেম নেই কোথাও!
.
১৮. মাহির
“আমি আজ আপনাদের সামনে ইতিহাস থেকে উঠে আসা এমন এক জিনিস বিক্রি করতে এসেছি, যার বয়স চার হাজার বছরের বেশি! রামায়ণ-মহাভারত থেকে শুরু করে সিন্ধুসভ্যতার খননকার্যে উঠে এসেছিল অসাধারণ এই বস্তুটি। আর কী তার ইতিহাস! মহামতি সম্রাট অশোক থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার হয়ে তৈমুর লং, তারপর সেই বংশের জাহাঙ্গির হয়ে টিপু সুলতান থেকে নেপোলিয়নের হাত ঘুরে সেটি এসেছে বাচ্চা হিটলারের হাতে। আর সেখানেই থেমে থাকেনি, বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক ও নেত্রীর ছোট বয়সের একমাত্র সঙ্গী ছিল বস্তুটি। তাদের সেই শিশু অবস্থার মনন নির্মাণের সঙ্গী ছিল এটি। মাটি, পাথর, কাঠ, ব্রোঞ্জ পেরিয়ে কাচ হয়ে এখন প্লাস্টিক ও পলিমারে এসে থেমেছে বস্তুটি। ইতিহাসের ছোট্ট এটিল্লার মতো আপনার বাচ্চারও মনখারাপের, একাকিত্বের আর ভালবাসার সঙ্গী এই বস্তু। চিলেকোঠায় আটকে থাকা অ্যানা ফ্র্যাঙ্কের সেইসব দিনগুলোয় তার পাশে এই বস্তুটি যেমন ছিল, তেমনই আপনার সন্তানেরও নিভৃত সময়ের সঙ্গী হওয়ার সমস্ত যোগ্যতাই আছে তার। প্রাচীন সময় থেকে বর্তমান সময়ে আসার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে জাতিধর্ম নির্বিশেষে শিশু-কিশোরদের একমাত্র সঙ্গী এই বস্তুটিকে আজ এই বনগাঁ লোকালে আমি আপনাদের সামনে এনে হাজির করেছি। এর মাধ্যমে আপনি আপনার স্নেহের সন্তানের হাতে শুধু মনোরঞ্জনের বস্তুই তুলে দিচ্ছেন না, তুলে দিচ্ছেন হামুরাবি থেকে বর্তমান সময় অবধি বয়ে আসা এক ঐতিহ্যের অংশকে। তাই আমার ঝোলার স্টক থাকতে-থাকতে আপনারা সংগ্রহ করে নিন ‘ডায়মন্ড টয়েজ়’-এর একমাত্র খেলনা ব্যাঙে বাজায় কত্তাল! সম্রাট আকবর যেমন তাঁর প্রিয় সেখুবাবার হাতে তুলে দিতেন, তেমন আপনিও আপনার সন্তানের হাতে তুলে দিন সিন্ধু নদ থেকে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়া এক ইতিহাসের টুকরো! এই ব্যাঙ, যা বিজ্ঞানের বইয়ে বুফো মেলানোস্টিকটাস নামে আপনাদের জ্বালিয়ে এসেছে, তাকে একবার আপন করে নিয়ে নিজেকে ও নিজের প্রিয় সন্তানকে করে তুলুন ইতিহাসের অংশ! আর কেউ আপনাকে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে এমন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেবে না। তাই দেরি না করে মাত্র দশ টাকার বিনিময়ে ইতিহাসে নাম ওঠাতে তৎপর হন।”
