ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমি বলাইকে দেখেছি। ঝিকুকে দেখেছি। তুই পাগলি এসবে ঢুকিস না।”
পেখম কাঁপা গলায় বলেছিল, “আমি পারছি না ঠাকুরদা। আমি কাজুকে ছাড়া…”
ঠাকুরদা উঠে গিয়ে হিটারটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “একদিন আজকের কথা ভাবলে হাসি পাবে তোর। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পেখম। উদ্বাস্তু বলে আরও জানি টাকাপয়সার মূল্য। তোর মাকে আমি এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না রে। জীবনের সব কিছুর একটা মাত্রা আছে। এই ব্যাপারটা আমার মাত্রার বাইরে। আমায় তুই ক্ষমা করে দিস মা!”
পেখম যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল শুধু।
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “আমার প্রথমেই ভুল হয়েছিল কাজুকে এই বাড়িতে পড়ানোর জন্য বলা। স্নেহ নিম্নগামী। তোর প্রতি সেই স্নেহের বশবর্তী হয়ে আমি যা করার করেছিলাম। বুঝিনি তুই ক্রমশ এতটা মায়ায় জড়িয়ে যাবি! আমার ভুল হয়ে গিয়েছে মা। আমায় ক্ষমা করিস!”
পেখম ধীরে-ধীরে ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। ঠাকুরদাকে তো ও স্পষ্ট করে কিছুই বলল না, তার আগেই ঠাকুরদা ওকে এসব বলে দিলেন! কেন? কী করে বুঝলেন সব ঠাকুরদা? মা কি কিছু বলে রেখেছে?
নিজের ঘরে ফিরে এসে পাথরের মূর্তির মতো জানলার দিকে তাকিয়ে বসেছিল পেখম। সারা শরীরে কেমন একটা অসাড় ভাব আসছিল। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকলেও আসলে দেখছিল না কিছু। শুধু বুঝতে পারছিল খুব ধীরে একটা মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে ওর। বুঝতে পারছিল প্রেম আসলে স্বপ্ন দেখার মতো একটা ব্যাপার। যে সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সে-ই জানে। যারা এর মধ্যে থাকে তারাই জানে। সেই দু’জন জানে। মাত্র দু’জন জানে।
“তোর কী হয়েছে বল তো?” মিতুকাকিমা পেখমের থুতনি ধরে ওর দিকে ফেরাল।
পেখম কষ্ট করে একটু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না কিছুতেই।
মিতুকাকিমা বলল, “তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর মা, কাকিমা তোকে ডাকছে।”
আচমকা মাথাটা গরম হয়ে গেল পেখমের। আচ্ছা নাছোড়বান্দা মহিলা তো! বলছে যে, ওর ভাল লাগছে না! সেখানে এভাবে টানাটানি কেন? সব বিষয়ে কি এমন করে ওকে বাধ্য করা হবে? একটু দোকানের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানেও মায়ের আপত্তি! কী করবে ও দোকানে ঢুকে! যে-পাত্রের সামনে ওর বসারই ইচ্ছে নেই, সেখানে শাড়ি দেখে কী করবে? তা ছাড়া যদি ও দেখেও শাড়ি, কিছু পছন্দও করে, তা হলেও কি মা সেটা কিনে দেবে ওকে? এই যে বাবা-মায়েদের একটা ভাব থাকে, আমরা তোমায় স্বাধীনতা দিচ্ছি, কিন্তু সবটাই তো আসলে মিথ্যে! বাবা-মায়েরা সবটাই নিজেদের মর্জিমতো করিয়ে নেয়। সেটা ভাল লাগে না পেখমের। কাজু বলে জীবনের সব কিছুতে রাজনীতি আছে। পাওয়ার স্ট্রাগ্ল আছে। দিন কে দিন সেটাই সত্যি মনে হচ্ছে ওর। বুঝতে পারছে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের ভেতরেও একটা ক্ষমতার, অন্যকে বশ্যতা স্বীকার করানোর দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে!
“কী রে?” মিতুকাকিমা আবার বলল।
পেখম আচমকা এবার ঘুরে দাঁড়াল মিতুকাকিমার মুখোমুখি। তারপর শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “আমি কি অন্য ভাষায় কথা বলছি কাকিমা? যাব না আমি। ভাল লাগছে না। তুমি মাকে বলো, আমি যাব না ভেতরে।”
কাকিমা থতমত খেয়ে গেল একদম। কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। মুখ লাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঠোঁট নাড়াল, কিন্তু কোনও শব্দ বেরিয়ে এল না। তারপর নিজের মনে মাথা নেড়ে ঢুকে গেল দোকানে।
পেখমের খারাপ লাগল। কিন্তু ওর কিছু করার নেই। মা যা শুরু করেছে, আর কিছু সহ্য করতে পারছে না। ও জানে এই যে মিতুকাকিমাকে এরকম বলল, এতে ওর বিপদ বাড়বে বাড়িতে। কিন্তু আর নিতে পারছে না ও। মানতে পারছে না কিছু। বাড়িতে ওকে খেতে-পরতে দেয় বলে কি ওর ওপর বাবা-মা এমন জুলুম করতে পারে! আর বাবা! বাবা এটা মানছে কী করে? পেখম বাবার সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাবা কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে। কিছুতেই সামনে আসছে না, কথা বলছে না। পেখম বুঝতে পারছে না, কী হতে যাচ্ছে সামনে। এমনকী, গত এক সপ্তাহ কলেজেও যেতে দেয়নি মা। মায়ের কথা হল ছেলের বাড়ি থেকে এসে কথা বলে যাক, তারপর সব হবে।
এই ব্যাপারটাতেই আপত্তি আছে পেখমের। এত বছরের ওর জীবন, ওর পড়াশোনা, সবটা আটকে যাবে কোথাকার কে এক হরিদাস পালের জন্য। এটা কি হতে পারে। আর বাবাই-বা এমন করে এইসব অন্যায় কথা মেনে নিচ্ছে কেন?
পাগল-পাগল লাগছে পেখমের। মাথার ভেতর ঘিলু ফুটছে! মনে হচ্ছে এমন করে তো চলতে পারে না! বাড়ি থেকে একা বেরোতে দেওয়াই হচ্ছে না ওকে। কাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না কিছুতেই। কাজুকে যে এসব বলবে তারও উপায় নেই। নয়নাও আসছে না কেন বুঝতে পারছে না। পেখমের মনে হচ্ছে সবাই মিলে ওকে চারিদিক থেকে বেঁধে রেখেছে!
“পেখমদি, তুমি এখানে?” আচমকা একটা চেনা গলা পেয়ে ঘুরে তাকাল ও। আরে, বিজন এখানে কী করছে এই সন্ধেবেলা?
গত ক’দিনের ভেতর পেখমের এই প্রথম ভাল লাগল। মনে হল যেন বন্ধুর মুখ দেখল শ্মশানের মধ্যে! একরত্তি একটা ছেলে, যাকে সেভাবে কোনওদিন পাত্তা দেয়নি, আজ তাকে দেখেই মনে হল সমুদ্রে ভাসমান একখণ্ড কাঠ!
পেখম বলল, “এই দোকানে এসেছি। তুই এখানে বিজু? কী ব্যাপার?”
