“কী হয়েছে পেখম? কী হয়েছে মা?” ঠাকুরদা এসে নিজেও বসে পড়েছিলেন মাটিতে। মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হল তোর পাগলি? কাঁদছিস কেন?”
পেখম ঠাকুরদার কোলে মাথা রেখে ঝুঁকে পড়েছিল সামনে।
ঠাকুরদা ওকে ধরে তুলেছিলেন মাটি থেকে। বলেছিলেন, “ঠান্ডা লেগে যাবে। এখানে বোস।”
ঠাকুরদার চৌকিটা বেশ বড়। তার এক পাশে জড়সড় হয়ে বসেছিল পেখম। সামান্য দূরে রাগী বাচ্চা সাপের মতো হিসহিস করছিল হিটারের ওপরে বসানো জলের বাটিটা।
পেখম কিছুতেই যেন নিজেকে আটকাতে পারছিল না।
ঠাকুরদা আবার মাথায় হাত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “সামলা নিজেকে। এভাবে কাঁদতে নেই। কান্নাকাটি করে কার কোন সমস্যার সমাধান হয়েছে? এভাবে হয় না।”
পেখম নিজেকে সামলেছিল অনেক কষ্টে। তারপর কোনওমতে বলেছিল, “মা আমায় বিয়ে দিয়ে দিতে চায় জোর করে! বাবাও বলল না কিছু। এখন আমি…”
ঠাকুরদা চুপ করে তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে। ওর অসমাপ্ত কথা সামান্য তুলোবীজের মতো ঘুরছিল ভোররাতের শহরতলির হাওয়ায়, ওদের মধ্যবিত্ত বাড়ির শেষ শীতের নিস্তব্ধতায়। আর-একটা অদ্ভুত বোঝা-না-বোঝার মতো না-বলা কুয়াশা এসে ধীরে-ধীরে ঘিরে ধরছিল পেখমকে। এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা আসছিল ওর।
ঠাকুরদা বলেছিলেন, “জানিস পেখম, আমার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লায়। বহরিয়া গ্রামে। ছোট ঠাকুরবাড়ি বলা হত আমাদের বাড়িটাকে। বাড়ি থেকে স্কুল ছিল বেশ কিছুটা দূরে। আমরা সবাই মিলে হেঁটে যেতাম সেখানে। শুকনার মাঠ পেরিয়ে, ঢালিবাবুদের পুকুর পার করে, রহিমসাহেবের বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে আমরা যেতাম। আর বাঁশবাগানের পরেই ছিল কটন মিল। সাহেবদের কটন মিল! মিলের পাশেই ছিল বিশাল বড় বাংলো। ফ্লেচারসাহেবের বাংলো। ফ্লেচারসাহেব ছিলেন কটন মিলের বড়সাহেব। আর বাংলোটাও ছিল দারুণ সুন্দর! সাহেবের চার ছেলেমেয়ে ছিল। বড় তিনটে ছেলে আর ছোটটা মেয়ে। মেয়েটা ছোট হলেও কিন্তু খুব কিছু ছোট ছিল না। এই ধর চোদ্দো-পনেরোর মতো। হালকা গোলাপি ফ্রক, আর নীল রিবন দিয়ে চুল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত বারান্দায়। কখনও-বা ওদের বাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে বিশাল-বিশাল ঝাউগাছের তলায় পোষা কুকুরের সঙ্গে ছুটোছুটি করত। আমি আর বলাই যেতাম ওই পথ দিয়ে। আমাদের তখন পনেরো-ষোলো বছর বয়স। বলাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত মেয়েটার দিকে। ওদের বাড়ির এক বেয়ারার কাছ থেকে বলাই জেনেছিল মেয়েটার নাম। এলিজ়াবেথ। লিজ়ি বলেই ডাকত সবাই।
“বলাই ভালবেসে ফেলেছিল মেয়েটাকে। কিছুই না, এমনি মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল। বলতে যায়নি কিছু। চিঠি দেয়নি। খবর পাঠায়নি। কিছুই না। শুধু ওই পথ দিয়ে যেতে-যেতে বলাই তাকিয়ে থাকত ওই বড় বাংলোটার দিকে। রোজ যে লিজ়ি বাইরে আসত, তা নয় কিন্তু। তবু বলাই তাকিয়ে থাকত। এমনকী, ব্যাপারটা এমন জায়গায় গেল, যে বিকেলবেলাও বলাই চলে যেত ফ্লেচারসাহেবের বাংলোর সামনে। একটা বড় শিরীষ গাছ ছিল রাস্তার উলটোদিকে। তার ছায়ায় বসে থাকত। পরে সন্ধেবেলা আমায় এসে বলত লিজ়ি নাকি ওর দিকে তাকায়। হাসে।
“শেষে ফ্লেচারসাহেবদের চলে যাওয়ার সময় হল। সেই খবর পেয়ে তো একদম খেপে গেল বলাই! ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল ও। কিন্তু লেখাপড়া গোল্লায় গেল। সারাক্ষণ খ্যাপার মতো ঘুরে বেড়াত। খেত না, স্কুলে যেত না। এমনকী, শুনলাম সাহেবের বাংলোতেও ঢোকার চেষ্টা করেছে কয়েকবার!
“তারপর এল সেই দিন। আমরা দেখলাম কটন মিলের নতুন সাহেব এসে গিয়েছে। ফ্লেচারদের সব বাক্স-প্যাঁটরা গোছানো শেষ। পরের দিন ভোরে বেরিয়ে যাবে। আর সেই রাতেই ঘটল ঘটনাটা। বলাই লুকিয়ে ঢুকে পড়ল ওদের বাড়ি। আর শুধু বাড়ি নয়, একদম লিজ়ির ঘরের ভেতর! আর বলাই তো চোর নয়, সাবধানও হয়নি। তাই ধরাও পড়ে গেল। কী মারটাই না মেরেছিল! থানা-পুলিশ, নানা খারাপ অভিযোগ, সব কিছু দেওয়া হল। আমাদের সকলের চোখের সামনে ছেলেটা শেষ হয়ে গেল! শুনেছিলাম, বলাই নাকি বলেছিল, ‘লিজ়িকে জিজ্ঞেস করুন, ও আমায় চেনে। আমায় দেখে ও হাসে।’ কিন্তু লিজ়ি অস্বীকার করেছিল সব!”
ঠাকুরদা বলে যাচ্ছিলেন, “জেল থেকে বেরিয়ে কেমন পাগলাটে হয়ে গিয়েছিল বলাই। ওই শিরীষ গাছের তলায় বসে থাকত। ওর মা ছিল না ছোট থেকেই। এই সবের পর-পরই বাবাও মারা যায়। দাদারা এই সুযোগটাই নিয়েছিল। পাগল ভাইকে বের করে দিয়েছিল বাসা থেকে। আমাদের ছোট্ট বহরিয়া গ্রামে ঘুরে বেড়াত বলাই। রাতের জ্যোৎস্নায় একা-একা চিৎকার করত। আর বলত, ‘প্রেম করিস না, ভালবাসিস না। ভালবাসা নরক! আমি সেই নরকের শয়তান!”’
ঠাকুরদা টানা গল্পটা বলে থেমেছিলেন। তারপর তাকিয়েছিলেন পেখমের দিকে।
পেখম কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে ছিল পালটা! ভাবছিল, কেন এই গল্পটা ওকে বললেন ঠাকুরদা! ঠাকুরদা যেন ওর মনের কথাই বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন, “আমি যেটুকু জীবন দেখেছি, তাতে প্রেম খুব কিছু কাজের জিনিস নয় রে মা! কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেয় না। তা ছাড়া সমাজের নিজস্ব একটা রেল লাইন আছে। জীবনে সুরক্ষার একটা ব্যাপার আছে। প্রেম কিন্তু সব কিছু সামলে দিতে পারবে না পেখম!”
পেখমের চোখে জল এসে গিয়েছিল আবার। ঠাকুরদা এমন বলছেন! ও এত ভরসা নিয়ে এল ঠাকুরদার কাছে, সেখানে ঠাকুরদা ওকে এমন করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন!
