পুশকিন বলল, “ব্যাপারটা কী? কে যোগাযোগ করছে ওদের সঙ্গে?”
“যোগাযোগ শুধু নয় স্যার। সঙ্গে নানা কিছু দেওয়ার কথাও সে গিয়ে বলে এসেছে। আমাদেরও তাড়াতাড়ি যেতে হবে ওঁর ওখানে।”
পুশকিন এবার সামান্য অধৈর্য হল, “আরে, কে গিয়েছে বলবে তো!”
স্মরণ থমকাল একটু। তারপর বলল, “হোমওয়ার্ড বাউন্ড রিয়েলটরস-এর রিপ্রেজ়েন্টেটিভ। আইকা বাসু।”
.
১৭. পেখম
মেয়ে দেখতে আসবে বলে তার জন্য কেউ কোনওদিন মার্কেটিং করেছে বলে তো পেখম শোনেনি! এটা কী রে বাবা! বিয়ে যে হবে তারই তো নিশ্চয়তা নেই। সেখানে মার্কেটিং!
পেখমের অদ্ভুত লাগে। মিতুকাকিমার যে কীসের এত উৎসাহ কে জানে! পেখমের তো মনে হচ্ছে মরে যায়! সারাক্ষণ মনে হয় শরীরে ঝিঁঝি ডাকছে! হাত-পা কেমন যেন অবশ লাগে। খেতে ইচ্ছে করে না। ঘুমোতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় এভাবে কেন বাঁচতে হবে ওকে? কী দোষ করেছে ও?
আকাশের দিকে তাকাল পেখম। রাতের আকাশে ঝকঝক করছে তারা। মনে হচ্ছে মাথার ওপরের অসংখ্য ফুটো দিয়ে অন্য কোনও এক জগৎ থেকে ছিটকে আসছে আলো! আকাশের দিকে তাকিয়ে পেখমের মনে হচ্ছে আকাশের ওপারের যে পৃথিবী, সেখানকার জোনাকিদের আলো কি নীল রঙের!
“কী রে, কী দেখছিস বাইরে দাঁড়িয়ে? দোকানে আয়।”
মিতুকাকিমার ডাকে পেছনে ফিরল পেখম। মিতুকাকিমার চোখেমুখে কেমন একটা তাড়াহুড়ো! যেন খুব দরকারি কোনও কাজে দেরি হয়ে গিয়েছে পেখমের জন্য।
এই জায়গাটার নাম সারেংনগর। সোনাঝুরি থেকে পাঁচ-ছ’ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু দোকানবাজার বেশ জমজমাট। পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরো বাজার সবটাই এখানে। তা ছাড়া জামাকাপড়ের বড় দোকানও এখানেই আছে।
পেখম কলকাতার কলেজে পড়তে যায়। সেখানে কিন্তু কেউ মার্কেটিং বলে না, বলে শপিং! আরও অনেক কিছু বলে না, যা মফস্সলের লোকজন অনায়াসে বলে দেয়। কলকাতাকে দেখতে ভাল লাগে পেখমের, কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কোথায় যেন কী একটা কম আছে। কী যে কম আছে সেটা নিজেও বুঝতে পারে না। কিন্তু মনে হয় যে কিছু কম আছে, কী একটা যেন মিলছে না।
জামাকাপড়ের দিকে খুব একটা মন নেই পেখমের। যেমন-তেমন শাড়িতেও চলে যায় ওর। শুধু একটা ব্যাপার খুব টানে ওকে। পারফিউম। সুন্দর গন্ধের মতো ভাল ওর অন্য কিছু লাগে না।
ঠাকুরদা কলকাতা থেকে যখন দোকানের মাল আনতে যায়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট বোতলে সুগন্ধী কিনে আনে পেখমের জন্য। কাজুরও গন্ধ কী পছন্দ! ওদের দু’জনের মধ্যে যে কী মিল!
“কী রে! হাঁ করে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস?” মিতুকাকিমা বিরক্ত হল আবার, “দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
পেখম বলল, “তোমরা দ্যাখো না। আমায় ডাকছ কেন? তোমরা যেটা পছন্দ করবে সেটাই তো হবে!”
মিতুকাকিমা হাসল, “কেন, তোর পছন্দ নেই বুঝি!”
পেখম চোয়াল শক্ত করল সামান্য। তারপর বলল, “আমার আবার পছন্দ!”
“এভাবে বলছিস কেন? এই বয়সেই সাত বুড়ির এক বুড়ির মতো কথা!” মিতুকাকিমা রাগ করল সামান্য।
পেখম নির্লিপ্তভাবে তাকাল মিতুকাকিমার দিকে। মানুষ নিজের মতোই ভাবে অন্যদের। ভাবে, তার যাতে খুশি অন্যরাও তাতেই খুশি হবে। তার যা চাই অন্যরাও সেটা পেতে চাইবে। তার যা পছন্দ, অন্য মানুষজনের পছন্দও একইরকম হবে। মিতুকাকিমাদের মতো হতে পারলে বেঁচে যেত পেখম। মনের মধ্যে এত কিছু ‘ফিলিং’ এসেই যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সেদিনের পর থেকে তো ভাল করে খেতেই পারছে না পেখম। খালি কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ লাগছে, বাবাও কিছু বলছে না। মা যেমন খুশি বলছে, করছে। এমনকী, বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্যও অস্থির হয়ে উঠেছে। পেখমের বিয়ের কথা হচ্ছে, কিন্তু ওকে কেউ কিছু বলছে না। এ কি পুতুলখেলা নাকি? আর বাবা! বাবাই-বা এমন করে কী করে!
সেই রাতে ভাল করে ঘুমোতে পারেনি পেখম। খালি জল এসে যাচ্ছিল চোখে। শেষরাতের দিকে নিজের বিছানায় উঠে বসেছিল ও। কী করবে বুঝতে পারছিল না। চোখ বন্ধ করলেই কাজুর মুখটা মনে পড়ছিল। চোখ দুটো মনে পড়ছিল। খালি মনে হচ্ছিল, কাজু তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। কিছু যেন বলতে চাইছে!
পেখমের মনে হয়, ও কেন আর পাঁচজনের মতো হতে পারে না! কেন এত কিছু অনুভব করে! ও বোঝে, যে যত বেশি ফিল করে তার জীবনে কষ্ট তত বেশি। ও ভাবে এত বড়লোকের বাড়ি থেকে সম্বন্ধ এসেছে, তাও ও খুশি হতে পারছে না কেন? খুশি হতে পারলে তো জীবন সহজ হয়ে যেত। আমাদের অনুভুতিগুলো কি আসলে আমাদের জীবনকে জটিল করে দেয়?
ভোরের দিকে বাইরের ঘরে শব্দ হয়েছিল। পেখম বুঝতে পেরেছিল ঠাকুরদা উঠে পড়েছেন ঘুম থেকে। ও বিছানা থেকে উঠে পায়ে-পায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের সামনে। দেখেছিল, ঘরের কোনায় রাখা হিটার জ্বালিয়ে ঠাকুরদা চা চাপিয়েছেন। পাশে পটল বিস্কিটের টিনটা খোলা।
সারা রাত না আসা কান্নাটা আচমকা বুকের মাটি ফুঁড়ে যেন উঠে এসেছিল এবার! দরজার কাঠে মাথা রেখে সামান্য ফুঁপিয়ে উঠেছিল পেখম।
ঠাকুরদা ঘুরে তাকিয়েছিলেন। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন খুব, “কী রে! ঘুমোসনি?”
ঠাকুরদার প্রশ্ন শুনে আরওই যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি পেখম। এবার মাটিতে বসে পড়ে কান্নায় টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ও।
