নোঈ তাড়াতাড়ি বলল, “আমি কিন্তু বাড়ি গিয়ে খাব। মানে…”
বাবা ঘুরে তাকাল। এবার গলাটা সামান্য শক্ত করে বলল, “আমি কিন্তু রাগী মানুষ নোঈ। আমার কথা কেউ না শুনলে খুব রেগে যাই। বাড়িতে ফোন করে বলে দাও, তুমি আজ এখানে খাবে দুপুরে। খিচুড়ি, ইলিশভাজা। তোমরা কি বাঙাল না ঘটি?”
নোঈ সামান্য অপ্রস্তুত হল। পুশকিন ব্যাপারটা দেখেও কিছু বলল না। মজাই লাগছে ওর। আর সত্যি বলতে কী, ভালও লাগছে। বাবাকে কারও সঙ্গে এমন করে কথা বলতে দেখেনি কোনওদিন। আর নোঈ সামনে থাকলে কেন কে জানে ওর মন ভাল থাকে। অন্ধকারগুলো ওকে ঘিরে রাখে না। নোঈ যেন আস্তে-আস্তে ওর জীবনের স্কাইলাইট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা তো ঠিক হচ্ছে না। ওর চেয়ে অনেক ছোট মেয়েটা। এখনও নোঈর গোটা জীবন পড়ে। আর সেখানে পুশকিনের একটা অতীত আছে। দম বন্ধ করে দেওয়া অতীত। তাই বেশি কিছু ভাবে না পুশকিন। আসলে ভাবনা এলেও এড়িয়ে যায়। মনে বসতে দেয় না।
কিন্তু আজ এই বৃষ্টির শহরে, আচমকা নোঈকে দেখে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। নোঈর বড় চোখ, অদ্ভুত সুন্দর হাসি, নাকের ভাঁজ, সামান্য টোলপড়া থুতনি… পুশকিনকে নরম মাটির মধ্যে বসিয়ে দিচ্ছে। ভাললাগা চোরাবালির মতো নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে ওকে। মনে হচ্ছে আজ তো ডুবে যাওয়ারই দিন।
“কী হল বলো…” বাবা আবার বলল।
কিন্তু এবার নোঈ কিছু বলার আগেই পেছন থেকে একটা গলা পেল পুশকিন।
“আমরা উডেন বাঙাল স্যার। বাবা কুমিল্লা। মা ঢাকা।”
পুশকিন কিছু বলতে গিয়েও হেসে ফেলল। স্মরণ এসে গিয়েছে। কিন্তু ঘরে ঢুকল কী করে?
বাবা সামান্য চমকে গিয়ে পেছনে তাকাল, “তুমি কে? কী করে ঢুকে পড়লে?”
স্মরণ বলল, “স্যার, আমি স্মরণ। পুশকিনস্যারের কোম্পানিতেই কাজ করি। মেন গেট খুলে একজন বাইরে কিছু জিনিস ফেলছিলেন। সেই ফাঁকে ঢুকে পড়েছি।”
পুশকিন বলল, “এসো এই ঘরে।”
স্মরণ বাবাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকল। বলল, “আমি ছাতাটা ওই বাইরে রেখে এসেছি!”
বাবা হাসল স্মরণের কথা বলার ভঙ্গিতে। তারপর বলল, “তুমিও খেয়ে যাবে। তোমরা কথা বলো, আমি উপরে যাই।”
নোঈ আচমকা এগিয়ে গেল বাবার দিকে তারপর বলল, “আমি একটা শর্তে খেতে পারি।”
“শর্ত?” বাবা অবাক হল।
নোঈ বলল, “হ্যাঁ, আপনাকে আমাদের সঙ্গে বসে খেতে হবে!”
বাবা অবাক হল, “কিন্তু আমি তো একা খাই… মানে…”
নোঈ সামান্য হেসে বলল, “না হলে আমি খাব না। আমি কিন্তু বাঙালবাড়ির মেয়ে। গোঁ খুব বেশি! আর মুখরাও!”
বাবা এবার হেসে ফেলল, নোঈর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “কখন খাবে আমায় বোলো, আমি তোমার সঙ্গেই বসে খাব!”
বাবা চলে যাওয়ার পরে পুশকিন তাকাল স্মরণের দিকে। স্মরণ নোঈর পাশে বসে পড়েছে।
পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার তোমার? আজ এভাবে হঠাৎ?”
স্মরণ বলল, “স্যার, এমন ওয়েদারে প্যাঁও চাইল নদীর ধারে বৃষ্টি দেখবে! তাই ওকে নিয়ে সোনাঝুরি গিয়েছিলাম। তো, গিয়েছি যখন একবার দেখা করলাম স্থানীয় পলিটিকাল পার্টির লোকজনের সঙ্গে। সেখানে কথায়-কথায় জানতে পারলাম উনি আপনার বাবাকে চেনেন। বিজন সরখেল লোকটির নাম। আমি তখন আপনার এই বাড়ির নাম্বার ওঁকে দিলাম আর কী। বললেন আপনার বাবাকে ফোন করবেন। বহুদিন নাকি যোগাযোগ নেই।”
পুশকিনের এবার পরিষ্কার হল ব্যাপারটা। ও জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই বাড়ির ঠিকানা, ফোন নাম্বার পেলে কী করে?”
“অফিস থেকে স্যার। এইচআর থেকে। আপনার টিমে আছি, এটা না জানলে ইমার্জেন্সিতে কী করে আপনাকে পাব?” স্মরণ এমন করে বলল যেন এটাই স্বাভাবিক। তারপর একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। দেখলাম তুলছেন না। তখন নোঈকে বললাম আপনার কাছে আসতে। ও আপনার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর এখানে এসেছে!”
নোঈ বলল, “পুশকিনদা, আপনাকে একটা কথা আমার বলা হয়নি।”
পুশকিন দেখল নোঈ ওকে এভাবে ডাকায় স্মরণ সামান্য চোখ গোল করেও আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল!
পুশকিন পাত্তা দিল না। ও নোঈকে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“আমার এক কাজ়িন থাকে সোনাঝুরিতে। এটা আপনাকে জানানো হয়নি।”
“তো কী হয়েছে! সোনাঝুরিতে অনেকেই থাকে!” পুশকিন এবার স্মরণের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী বলতে চাও?”
“স্যার, আর-একটা পার্টি কিন্তু ওই প্রজেক্টের জন্য খুব উঠে পড়ে লেগেছে! আমি খবর পেলাম। বিজনবাবুর ওখান থেকে আমি তারক চক্রবর্তীর কাছে গিয়েছিলাম। তারকবাবু ছিলেন না। মোতিবাবু বলে একজনের সঙ্গে কথা হল। তাকে লাইন করে এসেছি। সে-ই বলল, আর-একটা কোম্পানি থেকে একজন এর মধ্যে একবার মিটিং করে এসেছে তারকবাবুর সঙ্গে।”
নোঈ মাঝপথে বলল, “আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, গোটা সম্পত্তিটা মালিক গ্রুপের। আমরা তাদের চেয়ে কেন বেশি লোকাল পলিটিকাল পার্টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি?”
পুশকিন হাসল। মেঘলা দিনের আলো ঘরের পরদা ছুঁয়ে আলতো ভাবে এসে পড়েছে নোঈর গালে। ফ্যানের হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছে ওর। কথা বলতে-বলতে নোঈ হাত দিয়ে চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে কানের পেছনে।
“কারণ চটকল, তাদের ইউনিয়ন। লোকাল ঝামেলা। এসব কে সামলাবে?” স্মরণ যেন সামান্য বিরক্ত হল নোঈর এমন বাচ্চাদের মতো প্রশ্নে!
