পুশকিন কিছু বলার আগেই দরজার কাছ থেকে “বাবু,” বলে ডাক শুনল একটা। পুশকিন তাকাল। বাবা এসেছে! আরে, বাবা নীচে এসেছে? কী ব্যাপার?
পুশকিন উঠে দাঁড়াল। বাবা ঘরে এসে তাকাল নোঈর দিকে। নোঈও উঠে দাঁড়িয়েছে।
পুশকিনি বলল, “বাবা, ও নোঈ। আমাদের কোম্পানিতে নতুন জয়েন করেছে।”
নোঈ কী করবে বুঝতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে গেল! বাবা নোঈর হাত ধরে বলল, “আরে আরে, করো কী? এখনকার ছেলে-মেয়েরা কেউ নমস্কার করে নাকি?”
নোঈ বলল, “আমি করি।”
বাবা হাসল, নোঈকে বসতে বলে পাশে বসল। বলল, “তোমার নামটা আনইউজ়ুয়াল! ভাল বেশ। নোঈ! এই যে সেলফ নিগেশান। এটা খুব ভাল। আমি নোঈ। সাউন্ডস লাইক আমি নই। আমরা যে কেউ নই সেটা আমরা ভুলে যাই! চারিদিকে যা হচ্ছে! সবাই নিজেকে এত বেশি ইমপর্ট্যান্ট ভাবছে যে, গোটা পৃথিবীটাই কেমন যেন হয়ে গিয়েছে! সবাই ভাবছে সেই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র! আরে বাবা, মহাবিশ্বের কোনও কেন্দ্রই তো নেই!”
পুশকিন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। বাবা তো এত কথা বলে না। তা হলে আজ কী হল? আচ্ছা, বাবার কি মনে আছে যে, দীনবন্ধুর সঙ্গে এই মেয়েটার বিয়ের কথা হয়েছিল? নিশ্চয় মনে নেই!
নোঈ হাসি-হাসি মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাবা বলল, “আমাদের ছোটবেলায় এমনটা ছিল না কিন্তু।”
পুশকিনের এই ব্যাপারটা ভাল লাগে না। সব বয়স্ক মানুষ এই একটা কথাই বলে! আমাদের সময়! ওদের সময়ে যেন সব ভাল ছিল আর এখন সব খারাপ হয়ে গিয়েছে! আরে বাবা এই খারাপ সময়টা তো এসেছে আগেকার মানুষগুলোর বদান্যতাতেই। কিন্তু পুশকিন কারও সঙ্গে কোনও বিষয় নিয়ে তর্ক করে না। ও জানে তর্ক করে কিছু হবে না। মনখারাপ হবে শুধু।
বাবা বলল, “আমাদের সময়ে সব ভাল ছিল তা নয়, কিন্তু মানুষের মনে ভাল কিছু করার একটা চেষ্টা কিন্তু ছিল। নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। এখন সেই ইচ্ছেটাই নেই। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো এত বেশি জীবনে ঢুকে পড়েছে যে, মানুষ নিজেকে বিশাল হনু ভেবে ফেলেছে। আমাদের সময়ে একটা ঘড়ি পেলে আমরা বর্তে যেতাম। আর আজ দেখি কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকার ফোন কোনও ব্যাপার নয়। আর প্রায় সবার গলায় একটা করে ডিজিটাল ক্যামেরা ঝুলছে! সবাই রঘু রাই! অল ফ্যাশন, নো সাবস্ট্যান্স!”
নোঈ বলল, “আসলে জিনিসের দাম কমেছে। মানুষ রোজগারও বেশি করছে। আর…”
“কনজ়িউমারিজ়ম!” বাবা মাথা নাড়াল, “আমার এক পুরনো বন্ধু একটু আগে ফোন করেছিল। অনেক পুরনো বন্ধু! বহুকাল যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু আজ হঠাৎ ফোন করল। বিজন সরখেল। সোনাঝুরিতে থাকে।”
সোনাঝুরি? নামটা শুনে পুশকিন নড়ে বসল। আরে, ভদ্রলোক সোনাঝুরি থেকে ফোন করেছিলেন? ও চট করে একবার নোঈর দিকে তাকাল। দেখল, নোঈও ওকে দেখে নিল একবার।
বাবা বলল, “বিজন সোনাঝুরিতেই আছে এখনও। পার্টি করে। বিয়ে-শাদি করেনি! অনেক কথা হল। সেই সূত্র ধরেই মনে পড়ল সব কথা।”
“পার্টি করে?” পুশকিন অবাক হয়ে তাকাল বাবার দিকে, “আগে বলোনি তো!”
“বললে কী করতিস?” বাবা ভুরু কুঁচকে বলল, “বিজন আমাদের সময়ের সোনাঝুরি আর এখনকার সোনাঝুরি নিয়ে কথা বলছিল। শুনলাম, জোনাক-বাড়ি নাকি বিক্রি হয়ে যাবে! বাবু, তোর জোনাক-বাড়ি মনে আছে?”
পুশকিন মাথা নাড়ল, “আছে! আর, কথাটা সত্যি। ওই বাড়ি, জুটমিল সব বিক্রি হয়ে যাবে। কয়েকজন চেষ্টা করছে কেনার। আমাদের কোম্পানিও আছে সেই দলে!”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে নিল। তারপর বলল, “জোনাক- বাড়ি সোনাঝুরির একটা বিশেষ জায়গা ছিল। অত বড় কম্পাউন্ড! চারটে বিরাট-বিরাট বাড়ি! কত গাছ! দেবদারু, শিরীষ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া আরও কত কী। আর রাতে জানিস কী দেখা যেত? জোনাকি। কত যে জোনাকি ছিল ওই বাড়িটার পেছনের ওই গাছপালায়, ঝোপঝাড়ে! আমরা যেতাম মাঝে মাঝে ওই জোনাকি দেখতে। হলদেটে সবুজ আলো। কী অদ্ভুত পোকা! আমাদের দেখতে কী যে ভাল লাগত! আমরা মানে আমি আর বিজন। জোনাকি থেকেই তো বাড়িটার নাম জোনাক-বাড়ি। আসলে কাজুদার কাছে মাঝে মাঝে যেত বিজন, আমিও যেতাম। তবে কাজুদা কখনও কখনও অল্পস্বল্প ধমক দিত আমায়। বিজনের সঙ্গে মিশতে বারণ করত। তাও যেতাম। কাজুদার কাছে যেতে খুব ভাল লাগত। ওদের বাড়ির ছাদে বসে আমরা দেখতাম ওই জোনাকিদের। কাজুদা বলত, ওদের বাড়িটা আসলে জোনাকিদের বাড়ি। নোঈ, তুমি কি জোনাকি দেখেছ?”
নোঈ মাথা নাড়ল, “আমার মামার বাড়ি বর্ধমানে। সেখানে দেখেছি। কলকাতার দেখিনি!”
বাবা বলল, “Although the night is damp, / The little firefly ventures out, / And slowly lights his lamp.”
নোঈ বলল, “এটা কার লেখা? দারুণ তো!”
বাবা মাথা নাড়ল, “কার লেখা আর মনে নেই। পড়েছিলাম। ভুলে গেছি। আসলে বিজন এমন আচমকা ফোন করল যে, হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল সব। কাজুদার মতো মানুষ তো আর দেখলাম না!”
“কাজুদা কে?” নোঈ জিজ্ঞেস করল।
বাবা হাসল। কেমন একটা ম্রিয়মাণ হাসি। তারপর বলল, “বেঞ্জামিন কূজন সরকার। সোনাঝুরির কাজুদা!”
“তিনি এখন কোথায়?” নোঈ তাকাল বাবার দিকে। বাবার নাম বলাটা শুনেই বোঝা যাচ্ছে মানুষটা যেমন-তেমন কেউ ছিল না!
বাবা হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল। এমন ভাব করল যেন শুনতেই পায়নি প্রশ্নটা। বাবা বলল, “দুপুরে এসেছ, না খেয়ে যাবে না বলে দিলাম। আমি ওপরে গেলাম। দেখি, পাখিগুলোকে কী করল ওরা!”
