সব ছিঁড়ে, ছিটিয়ে গিয়েছে! মুক্তোর মালা হাত থেকে পড়ে গড়িয়ে চলে গিয়েছে চতুর্দিকে! পুশকিন নিজে পড়াশোনা করতে কলকাতার বাইরে চলে যাওয়ার পরে আর যোগাযোগ থাকেনি কারও সঙ্গে। তবে এই বাড়িতে এলেই ওদের কথা মনে পড়ে পুশকিনের। মনে পড়ে দূরের ওই নীলাঞ্জনাদির বাড়ির কথা। এক ড্রপে যার বাড়ির দেওয়ালে লাগলে চার রান হত। আর সোজা বাড়ির মধ্যে বল মারলে ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যেত।
পুশকিন কোনওদিন ওভাবে বল মারেনি। তাও নিজের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, ও আউট হয়ে গিয়েছে! স্মিতা ওকে আউট করে দিয়ে চলে গিয়েছে। যে মেয়েটা ওকে বলত, “আমি তো আছি সোনা।” সে কী করে এমনটা হয়ে গিয়েছিল? তবে কি অভিনয় করত? তা হলে কেন ওকে বিয়ে করতে রাজি হল? পুশকিন তো জোর করেনি। ভালবেসেছিল বলে বিয়ে করতে চেয়েছিল। তখন কেন ‘না’ করল না!
স্মিতা মারা গিয়ে ওর বুকের মধ্যে একটা বৃশ্চিক ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে। পুশকিন জানে এর হুল থেকে কিছুতেই নিস্তার নেই ওর। সারা জীবন শিরায় এই বিষ বয়ে বেড়াতে হবে ওকে।
পুশকিন নিজের ঘরের দিকে এগোল। রান্না হয়নি এখনও। কাজও নেই। কিছু পড়া যায় কি না দেখবে। ওর সব বই এখনও টেবিলের ওপর রাখা আছে। ভাইরা চলে আসবে বিকেলের মধ্যে। তারপর পুশকিন বেরিয়ে যাবে।
কিন্তু নিজের ঘরে যাওয়ার আগেই বেলটা বাজল হঠাৎ। কে এল আবার এখন? সবাই ওপরে আছে। তাই পুশকিন নিজেই সদর দরজার দিকে গেল।
পুরনো কাঠের দরজা। মাথার ওপর লম্বা পেতলের ছিটকিনি। পুশকিন ছিটকিনি নামিয়ে দরজাটা খুলল। আর খুলেই অবাক হয়ে গেল। আরে, নোঈ! ও কী করছে এখানে?
মাথায় নীল-গোলাপি ছাতা। পরনে নীল-সাদার ফুলছাপ চুড়িদার। কপালে সেই অনুস্বর টিপ। পুশকিন নিজের অজান্তেই দু’মুহূর্ত বেশি তাকিয়ে ফেলল। বুকের মধ্যে আচমকা একটা কষ্ট হল পুশকিনের। এমন একটা বৃষ্টি দিয়ে তৈরি মেয়েকে দেখেই কি কষ্টটা হল? কেন হল?
জোর করে নিজের দৃষ্টি নোঈর থেকে সরিয়ে পুশকিন জিজ্ঞেস করল, “তুমি? এখানে?”
নোঈ লজ্জা পেয়ে গেল। নিমেষে রাঙা হয়ে উঠল ওর মুখ। সেটা কি পুশকিনের প্রশ্নে, না ওর তাকিয়ে থাকার জন্য ঠিক বুঝতে পারল না পুশকিন।
নোঈ বলল, “সরি স্যার। আমি আসতে চাইনি। কিন্তু স্মরণ ফোন করে এমন করে বলল যে, আসতে বাধ্য হলাম!”
এই রে! স্মরণ আবার কী বলল? এই ছেলেটাকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল! কর্পোরেটে চাকরি করে, কিন্তু কোনও প্রোটোকল মানে না! স্মরণের অনুরোধেই সোনাঝুরির কাজে ওকে নিজের সঙ্গে রেখেছে পুশকিন। কিন্তু ছেলেটার এত উৎসাহ বেশি! পুশকিন ওর অনেক ওপরের বস। তার বাড়িতে এভাবে আসা যায় নাকি? এটা তো ঠিক নয়!
নোঈ বলল, “ও সকাল থেকে নাকি আপনাকে ফোন করছে। আপনি ধরেননি। ও নিজে সোনাঝুরি গিয়েছে। সেখানে কীসব দরকার আছে নাকি ওর। আমায় বলল আপনার কাছে আসতে। আমি স্যার আপনার বাড়ির ঠিকানা জানতাম না। কিন্তু স্মরণ…”
“আচ্ছা আচ্ছা,” পুশকিন সরে দাঁড়িয়ে বলল, “ভেতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে সব কথা বলে দেবে নাকি?”
নোঈ ইতস্তত করল একটু। ছাতাটা বন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকাল। পুশকিন হেসে নিজেই হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিল ছাতাটা। বলল, “এসো ভেতরে।”
দরজা দিয়ে ঢুকে একটা বড় জায়গা। একপাশে মিটার-বক্স। তার পাশে বড় একটা শু-র্যাক। লম্বা দেওয়ালে কয়েকটা হুক লাগানো। ছাতাটার হাতল থেকে ঝোলা দড়িটা একটা হুকে ঝুলিয়ে দিল পুশকিন। ছাতা ঝোলানোর জন্যই এমন ব্যবস্থা। আর ছাতার তলায় জল ঝরে পড়ার জন্য বালতিও রাখা। বাবার সব দিকে দৃষ্টি।
নোঈ জুতোর র্যাকের পাশে জুতোটা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। পুশকিন বুঝতে পারছে মেয়েটা খুব সংকোচ করছে!
পুশকিন বলল, “এসো আমার সঙ্গে। এই বৃষ্টির মধ্যে এমন করে এলে! খুব সাংঘাতিক কিছু দরকার নাকি? আর স্মরণকে আজ কে বলেছে সোনাঝুরি যেতে। ওকে তো আমি কাল যেতে বললাম।”
“আমি সরি স্যার,” নোঈ বলল, “আমি নিজেও জানি না। ও কী যেন বলছিল, গঙ্গায় নাকি বৃষ্টি দেখবে। কোনওদিন দেখেনি। তাই নাকি গিয়েছিল। কিন্তু গিয়ে কীসব কাজও করেছে!”
কথা বলতে-বলতে ওরা বসার ঘরে এল। বসার ঘরটাও বড়। একটা সোফা সেট ছাড়াও ডিভান আছে। কাচের দুটো আলমারিতে নানারকমের ডাই কাস্ট গাড়ি রাখা। মাথার ওপর একটা ঝাড়ও আছে!
নিজে একটা সিঙ্গল সোফায় বসে পুশকিন নোঈকে সামনের একটা সোফা দেখিয়ে বলল, “এটা অফিস নয়, বাড়ি। পুশকিনদা বলতে পারো আমায়। আমার সারাক্ষণ অত প্রোটোকল ভাল লাগে না।”
নোঈ সোফায় বসে হাসল। মেয়েটা এখনও জড়সড় হয়ে আছে!
পুশকিন আবার বলল, “আমার এই বাড়িতে এলে কী করে?”
নোঈ বলল, “বাসে। ভবানীপুর থেকে তো বেশি দূর নয়।”
“না, না, মানে,” পুশকিন হাসল, “মানে, ঠিকানা পেলে কী করে?”
“আমি জানতাম না। স্মরণ নাকি এইচ আর থেকে নিয়ে নিয়েছিল। ইমার্জেন্সিতে লাগতে পারে বলে!” নোঈ হাতের রুমাল দিয়ে আলতো করে মুখ আর মাথাটা মোছার চেষ্টা করল। যতই ছাতা থাক, জলের ছাট লেগেছে!
পুশকিন বলল, “একটা তোয়ালে দেব?”
“না স্যার, মানে…” হেসে ফেলল নোঈ, “না লাগবে না, খুব কিছু লাগেনি।”
পুশকিন হাসল। আর কী বলবে বুঝতে পারল না। মেয়েটাকে স্মরণ এখানে আসতে বলেছে কেন? কী এমন কথা যে, এক্ষুনি বলতে হবে?
