টেবিলে মোবাইলটা রাখা আছে উলটো করে। ও সেটাকে তুলে নিল। দেখল একটা মিস্ড কল। স্মরণ কল করেছিল। কেন কে জানে! আজ আর ভাল লাগছে না কথা বলতে।
ওদের বাড়িতে টুকুদি রান্না করে। আজ পুশকিন বলেছে খিচুড়ি করতে। সঙ্গে বেগুনি, আলুভাজা আর ইলিশমাছ ভাজা।
ও ঘড়ি দেখল। বারোটা বাজে। সকালে পাঁউরুটি খেয়েছে দু’পিস। এখনও খুব একটা খিদে পায়নি ওর। আর-একটু পরে খাবে!
ও ভাবল একবার দোতলায় যাবে। বাবা কী করছে দেখবে। সকালে দেখেছে বাবার জ্বর নেই। ইজ়িচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল বাবা। বাড়িতে ছ’টা কাগজ রাখা হয়। বাবা খবরের কাগজ পড়তে খুব ভালবাসে। আর ভালবাসে ফুটবল। নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ইউনিভার্সিটি ব্লু ছিল। পরে কয়েকবছর কলকাতার বড় দলেও খেলেছে। এখনও লেকে হাঁটতে গিয়ে বাচ্চারা ফুটবল খেলছে দেখলে বাবা দাঁড়িয়ে পড়ে।
ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল পুশকিন। আর ঠিক তখনই টেলিফোনটা বেজে উঠল আবার। সেই ঝনঝন শব্দ। অবাক হল পুশকিন, কেন ফোন ধরছে না কেউ! কানুদা বাবার সব কাজ করে দেয়। কানুদা কি নেই? কিংবা সকালবেলায় বাড়ির ঠিকে কাজ করে যে মনুদি? আর টুকুদিই-বা কই? কেউ ফোনটা ধরছে না কেন?
পুশকিন এগিয়ে এসে ফোনটা ধরল, “হ্যালো…”
“পরিতোষ আছে?” ওপারের গলাটা বেশ বয়স্ক লাগল।
চট করে চিন্তা করে নিল পুশকিন। বাবা আজকাল খুব বিরক্ত হয় ফোনটোন এলে। বলে, “আর আমার এসব ভাল লাগে না। সারা জীবন অনেক কাজ করেছি। আর পারছি না আমি।”
পুশকিন একবার ভাবল কাটিয়ে দেয় মিথ্যে বলে। এমনিতেই বাবার শরীরটা ভাল নেই। ফোন এসেছে শুনলে আবার রাগ করবে। কিন্তু লোকটার গলার ভেতরে এমন একটা ব্যাপার আছে যে, লোকটাকে মিথ্যে বলতে পারল না পুশকিন।
ও জিজ্ঞেস করল, “কে বলছেন কাইন্ডলি বলবেন? বাবা ওপরে আছে।”
“আমি বিজন সরখেল,” লোকটা সময় নিল একটু, “ও ওপরে? ওকে কি নীচে নামতে হবে? মানে, তেমন হলে না হয়…”
“আপনি একটু ধরুন, আমি বলে দিচ্ছি।”
পুশকিন রিসিভারটা টেবিলের ওপরে রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে গেল। দোতলাটাও বেশ বড়। একপাশে টানা একটা বারান্দা আছে। বাবাকে ঘরে দেখতে পেল না পুশকিন! আরে, গেল কোথায় সবাই! তারপরেই কী একটা মনে হওয়ায় বারান্দার দিকে গেল ও। দেখল হ্যাঁ, যা ভেবেছে ঠিক তাই। বাড়ির তিনজন কাজের লোককে নিয়ে বাবা ওখানে দাঁড়িয়ে। আর শুধু দাঁড়িয়েই নেই, তিনজনকেই বকছে বাবা!
পুশকিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনল ব্যাপারটা। বারান্দার একদিকে পাখির খাঁচা করেছে বাবা। নানারকম পাখি আছে সেখানে। বাবা সবাইকে বকছে, কারণ বৃষ্টির জল লেগে পাখিদের নাকি জ্বর হবে! কেন ঠিকমতো খাঁচাটা ঢাকা দেওয়া হয়নি!
পুশকিনের হাসি পেল। পাখিরা কি বর্ষাকালে ছাতা নিয়ে উড়ে বেড়ায়! নাকি রেনকোট পরে? বাবা মাঝে মাঝে এমন ছেলেমানুষি কাণ্ড করে না!
“বাবা,” পুশকিন ডাকল এবার।
বাবা মাঝপথে কথা থামিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল পুশকিনের দিকে, “কী হল? দেখছিস না আমি কাজ করছি?”
পুশকিন হাসল, “তোমার ফোন এসেছে।”
“আমার?” বাবা অবাক হল।
“হ্যাঁ, ঘরে এসো। আর তোমার না জ্বর! এখানে বৃষ্টির মধ্যে কী করছ? আবার যদি জ্বরটা বাড়ে?”
বাবা বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আবার ফোন করল এখন! আর আমার জ্বরটা ইমপর্ট্যান্ট নয়। ওদের জ্বর হলে কী হবে?”
“তুমি এসো, ফোনটা ধরো…” পুশকিন পাখিদের নিয়ে আর কথা বাড়াল না।
“বলে দে আমি নেই, আমি এখন যেতে পারব না!” বাবা বিরক্ত হল।
পুশকিন তাও বলল, “বিজন সরখেল নামে একজন।”
বাবা এবার ঘুরে দাঁড়াল, “কে?”
পুশকিন নামটা বলল আবার। দেখল, বাবার মুখটা পালটে গেল যেন। সেই বিরক্তি আর নেই।
বাবা আর কথা বাড়াল না। দ্রুতপায়ে হেঁটে নিজের ঘরের দিকে গেল। নীচের ফোনের সঙ্গে ওপরের ফোনের একটা প্যারালাল লাইন করা আছে। ফলে নীচে ফোন এলে ওপর থেকেও ধরা যায়।
পুশকিন বাবার পেছন-পেছন গেল ঘরের দিকে। দেখল, বাবা ফোনটা তুলে কেমন একটা বিহ্বল গলায় বলল, “বিজন! এতদিন পরে!”
পুশকিন আর দাঁড়াল না। বাবার ব্যক্তিগত ফোন। ও কেন থাকবে!
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পুশকিন। রিসিভারটা ক্রেডেলে তুলে রাখল। কানুদারা এখনও ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। পাখিদের কিছুতেই জ্বর আসা চলবে না!
পুশকিন নিজের মনেই হাসল। বাবা এমনিতে গম্ভীর খুব। কিন্তু বাবার ভেতরে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। সে মাঝে মাঝে মানুষটার দখল নেয়!
সামনের গোটা দিনটার দিকে তাকাল পুশকিন। কিছু না করার ফাঁকা একটা দিন। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় কলকাতায় চলে এসেছিল ওরা। তখন এই পাড়ায় আরও অনেক পুরনো বাড়ি ছিল। কলকাতায় নতুন বলে তখনও তেমন বন্ধুবান্ধব হয়নি ওর! এমন বৃষ্টির দিনে ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত ও আর ভাই। চুপচাপ বৃষ্টি দেখত। ওদের পাড়ায় কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে অনেক। বৃষ্টির জলে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে আরও বেশি সবুজ মনে হত ওর। দেখত, কয়েকটা বাড়ি পরে শাক্য বলে যে শান্ত ছেলেটা থাকত, সে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফুটবল খেলছে বৃষ্টিতে।
পুশকিনের ইচ্ছে হত খেলতে। কিন্তু নিজে থেকে যেতে পারত না। পরে অবশ্য শাক্যর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওর। আর শুধু শাক্যই নয়, ওর অন্য বন্ধুরা, পুষ্পল, আয়ানের সঙ্গেও খুব ভাল আলাপ হয়ে গিয়েছিল। আর-একটা ছেলেও আসত। সামান্য চুপচাপ। মনমরা। কিন্তু ফুটবলটা খারাপ খেলত না। ওই ছেলেটার সঙ্গেই পরে সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল পুশকিনের। ছেলেটার নামটা একটু অদ্ভুত। অন্তরীপ। অন্তরীপ মুখার্জি। ওরা সবাই রীপ বলে ডাকত ওকে!
