.
১৬. পুশকিন
বাথরুম থেকেই ফোনের রিংটা শুনতে পাচ্ছিল পুশকিন। কিন্তু জল গায়ে বেরোতে পারেনি তখন। শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে শুনছিল ক্রিরিরিরিং ক্রিরিরিরিং শব্দ। পুরনো দিনের টেলিফোন। বড়, কালো রিসিভার। গোল ডায়াল। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে নাম্বার ডায়াল করতে হয়। বাবা এটাকে রেখে দিয়েছে। বাবার পুরনো জিনিসের প্রতি কীসের এত মায়া কে জানে! নিজে ইঞ্জিনিয়ার হয়েও টেকনোলজির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ওদের মাইক্রোওয়েভ পর্যন্ত কিনতে দেয়নি। শেষে ভাইয়ের বউ এসে কিনেছে। বাবা যে তাতে খুশি হয়েছে তা নয়। কিন্তু কিছু বলেনি।
মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা অনেক চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির দোতলাতেই থাকে বেশির ভাগ সময়। খুব দরকার না পড়লে নীচে নামে না।
স্মিতাকে বাড়ির অমতে বিয়ে করার জন্য সবাই বয়কট করেছিল পুশকিনকে। ভাই তো ওকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছিল বাড়ি থেকে! কিন্তু এখন যেহেতু স্মিতা আর নেই এই পৃথিবীতে, তাই আবার পুশকিনকে নিজের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বাবা আর ভাই। পুরনো কথা সবাই ভুলে যেতে চাইছে। চাইছে পুশকিনও ভুলে যাক!
পুশকিন সবটাই বোঝে। ও নিজেও বাবার কাছে আসতে চায়। কিন্তু কোথায় যেন আটকায়। কিছুতেই ভুলতে পারে না মায়ের মৃত্যুর জন্য ওকেই দায়ী করেছিল বাবা! ভুলতে পারে না মায়ের দাহকার্যের সময় ওকে দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল! পুশকিনের সবটাই তো ছিল মা। সেখান থেকেই ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হল!
তবে ভেতরে-ভেতরে যাই মনে হোক না কেন, পুশকিন বাইরে কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। ও নিয়মিত বাবার খবর নেয়। এই বাড়িতে আসে। এমনকী, ওর খুড়তুতো ভাই দীনবন্ধু যখন এসেছিল, তখনও পুশকিন ওর সম্বন্ধ দেখতে গিয়েছিল কয়েক জায়গায়।
গতকাল বাবার জ্বরের খবর পেয়ে এই বাড়িতে এসেছিল ও। জুলাইয়ের প্রথম এখন। কলকাতা জুড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। গতকাল সন্ধে থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি আজ এই সকালবেলাতেও হচ্ছে। কমেনি একটুও। জানলা দিয়ে পুশকিন দেখছে, সারা আকাশে গোলা পায়রার ডানার রঙের মেঘ। পাড়ার রাস্তা ডুবে গিয়েছে জলের তলায়। উলটোদিকের রাজাদের বাড়ির নীচের তলায় ভাড়া থাকা পরিবারের দুটো বাচ্চা নীল-হলুদ রেনকোট পরে প্লাস্টিকের খেলনা-নৌকো ভাসাচ্ছে রাস্তার জমে থাকা জলে। পুশকিনের দেখে মজা লেগেছে। ওদের সময় ওরা কাগজের নৌকা ভাসাত।
ওদের এই রাসবিহারীর বাড়িটা বেশ পুরনো। উঁচু সিলিং। লাল মেঝে। বাথরুমে পাথরের বাথটব। বাবা পুরনো দোতলা বাড়িই কিনেছিল। পরে ভাল করে সারিয়ে গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বাড়িতে এলে ভাল লাগে পুশকিনের। বাইরে যতই গরম হোক না কেন, মোটা দেওয়ালের জন্য সব সময় ঠান্ডা থাকে বাড়ির ভেতরটা।
আজ ভাইরা গিয়েছে মধ্যমগ্রাম। ভাইয়ের শ্বশুরবাড়িতে। কী একটা নেমন্তন্ন আছে। পুশকিনকেও বলেছিল যেতে। কিন্তু একটাই ছুটির দিন, তার ওপর এমন ওয়েদার। কার ভাল লাগে! তাই ও পাশ কাটিয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া বাবার কাল জ্বর ছিল। এমন মানুষকে শুধু কাজের লোকেদের ভরসায় রেখে ও যায় কী করে?
গতকাল রাত প্রায় দশটায় এ বাড়িতে এসেছিল পুশকিন। আজকাল অফিসে কাজের চাপ খুব বেড়ে গিয়েছে। সোনাঝুরির প্রজেক্টই শুধু নয়, আপনকে দেওয়া সেই ‘সি ফুড’ কোম্পানির কাজটাতেও ওকে মাথা দিতে হচ্ছে। আপন যদিও গোটা ব্যাপারটা দেখছে, তাও যেহেতু ডিলটা হয়েছিল পুশকিনের হাত দিয়ে, তাই এখনও আপনকে কিছু-কিছু জায়গায় দেখিয়ে দিতে হচ্ছে পুশকিনকে।
ওদের অফিস দু’দিন ছুটি থাকার কথা, কিন্তু পুশকিন শনিবারেও কাজ করে। আসলে ওর মনে হয়, বাড়িতে বসে থেকে কী করবে ও! কে আছে ওর জীবনে? তার চেয়ে অফিসে গেলে, কাজের মধ্যে থাকলে পুরনো কথা ওকে আর চেপে ধরবে না। আসলে ভাল করে ভেবে দেখলে পুশকিনই কোথায় যেন পুরনো কথাদের ছাড়তে পারে না! ও বোঝে, যতদিন ও নিজেকে সরিয়ে নেবে না অতীত থেকে অতীতও ওকে ছাড়বে না!
কিন্তু বললেই তো আর সরে আসা যায় না! মনের মধ্যে তো আর অন-অফ সুইচ নেই! কী করে ও ভুলবে সেই রাতটার কথা! নিজের ঘরের বাইরে এসে দেখা সেই দৃশ্যটির কথা! যাই করুক না কেন, ওটা জীবনেও ভুলতে পারবে না পুশকিন। শুধু প্রতিদিন নানা কাজের মধ্যে ডুবে ভুলে থাকার ভান করে যাবে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে এসে দাঁড়াল পুশকিন। টানা বৃষ্টির জন্য গরমটা আর নেই। বরং ওদের বাড়ির ভেতরে তো বেশ ঠান্ডাই লাগছে।
এই ঘরটা পুশকিনের। ও চলে যাওয়ার পরেও এমনই করে রাখা হয়েছিল। ভাইয়ের কাছে শুনেছে, মা এই ঘরে কাউকে শুতে দিত না।
ঘরটা বেশ বড়। একপাশে ওর বিছানা। আলমারি। অন্যপাশে বড় আয়না আর তার পাশে চেয়ার টেবিল। ঘরের মাঝে বেশ বড় ফাঁকা লাল মেঝে রয়ে গিয়েছে। পুশকিনের এমন ফাঁকা মেঝে খুব ভাল লাগে। মাটিতে বসার মতো, শোওয়ার মতো আরাম ও আর কিছুতে পায় না।
পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে তোয়ালেটা বাথরুমে মেলে দিয়ে এল পুশকিন। তারপর চুলটা আঁচড়ে নিল। কানের পাশে দুটো, তিনটে করে চুল সাদা হয়েছে। এই ছত্রিশেই বয়স গুটিগুটি এসে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। ও চোখ বন্ধ করল। ক্লান্ত লাগছে পুশকিনের। কেন ক্লান্ত লাগছে কে জানে। কাল রাতে তো বেশিক্ষণ জাগেনি! তা হলে? ঘুমের মধ্যে যদিও বেশ আজেবাজে স্বপ্ন দেখছে। তাই কি ভাল ঘুম হয়নি?
