সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল নিশান। জিজ্ঞেস করেছিল, “রাধিয়া না?”
মহিলাটি বলেছিল, “হ্যাঁ। আপনি চেনেন?”
নিশান বলেছিল, “হ্যাঁ তো। খুব ভাল করে চিনি।”
কিন্তু আর কথা হওয়ার আগেই ওপর থেকে একজন বয়স্ক ভৃত্যস্থানীয় মানুষ খবর নিয়ে এসেছিল, আজ দেখা হবে না দীপমালাদেবীর সঙ্গে। হঠাৎ খুব জরুরি কাজ এসে পড়েছে। ম্যাডাম দুঃখিত।
নিশান কিছু মনে করেনি। সত্যিই তো, ও তো আর আগে থেকে সময় নিয়ে আসেনি। এমন করে এলে দেখা হওয়া মুশকিল।
তবে আসার আগে মহিলার হাতে একটা চিরকুটে নিজের মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে এসেছিল। বলেছিল, “এটা রাধিয়াকে দেবেন প্লিজ়। আমি নিশান, বললেই হবে।”
মোবাইল নাম্বার দিয়ে এসেছে নিশান। কিন্তু রাধিয়ার ফোন আসেনি।
তারক চক্রবর্তীর বাড়ির নীচের তলাতেই অফিস। বাইরে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে গুজগুজ করছে। একটা বড় আলো জ্বলছে গেটের কাছে। বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে ঢুকলে একটা উঠোনমতো। সেখানেও কয়েকজন লোক প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বসে আছে আর কয়েকজন বসে পাশের বারান্দায় ওঠার সিঁড়ির মুখে।
এই লোকগুলোর আসলে কী কাজ কে জানে! সিনেমার এক্সট্রার মতো সারাক্ষণ তারকের পেছন-পেছন ঘুরে বেড়ায়। অনেকটা সেই পুরনো দিনের হিন্দি ছবির গাঁও-ওয়ালোর মতো। এমন ‘নন-প্রোডাক্টিভ মাস’ বোধহয় এই তৃতীয় বিশ্বেই সম্ভব!
নিশান দেখল ওদের। অনেককেই চেনে ও। কিন্তু আজ কেমন যেন সবাইকে একরকম লাগল ওর। সেই ছুঁচোর মতো মুখ করে বসে থাকা মানুষ! তারক চক্রবর্তী কখন কী ছুড়ে দেবে সেটা কুড়োবে বলে যেন বসে আছে!
বাড়িতে ঢোকার কোলাপসিব্ল গেটের কাছে মোতি দাঁড়িয়ে ছিল। মোতিলাল শর্মা তারকের ডান হাত। অবশ্য শুধু ডান হাত নয়— নাক, কান, চোখ, পা সবই বলা যায়!
লোকটাকে দেখলে আচমকা নানা পটেকরের কথা মনে পড়ে যায়। নিশান মাঝে মাঝে ওকে মজা করে ‘নানা’ বলেও ডাকে।
মোতি পান খায় খুব। কথা বলার সময় মুখটাকে সামান্য আকাশের দিকে তুলে বাটির মতো হাঁ করে কথা বলে। স্বরের ভেতরে কেমন একটা সামান্য তরল শব্দের মতো আওয়াজ পাওয়া যায়!
নিশান মোতিকে দেখে হাসল।
মোতি মুখটা তুলে সামান্য কলকল শব্দ মিশিয়ে বলল, “এত দেরি করলি? দাদা বসে আছে। তাড়াতাড়ি যা।”
দেরি? ঘড়ি দেখল নিশান। সাতটা পাঁচ বাজে। আশ্চর্য! ও কথা না বাড়িয়ে ঢুকে গেল ঘরে।
তারকের বাড়িটা আগে একতলা ছিল। কিন্তু পরপর দু’বার ভোটে জিতে সোনাঝুরির কিছু হোক না হোক, তারকের বাড়িটা তিনতলা হয়েছে। বাড়ির পেছনে বসবাস করা পুরনো মানুষদের হটিয়ে তাদের জমি কিনে নিয়েছে। সেখানেও একটা মাল্টি স্টোরেড বিল্ডিং বানানো হচ্ছে। সবাই সব জানে, কিন্তু কারও কিছু করার নেই! নিশান মাঝে মাঝে ভাবে, আজকাল মানুষ বোধহয় এইসব কারণেই ইনসেনসিটিভ হয়ে গেছে! সব জায়গায় দুর্নীতি আর নোংরামো দেখে দেখে মানুষের মন আর বোধ দুটোই ভোঁতা হয়ে গেছে। এমন একটা মেনে নেওয়া, হচ্ছে-হবে ধরনের সমাজ তৈরি হয়েছে যে, মানুষ আজকাল রাস্তায় পড়ে মরে যাচ্ছে দেখলেও কেউ এসে দাঁড়ায় না তার পাশে! যারা এইসব ছবি খবরের কাগজে দেখে হা-হুতাশ করে, নিশান জানে, তারাও এমন অবস্থায় পড়লে পাশ কাটিয়ে, গা বাঁচিয়েই পালাবে!
তারকের অফিসরুমটা বেশ বড়। কাচের দরজা দিয়ে সামনেটা ঢাকা। ভেতরে এসি চলছে।
তারক দু’হাত দিয়ে ধরে ট্যাবটা নিয়ে কী একটা দেখছিল। ওকে দেখে সেটা রেখে হাসল। তারকের বয়স পঞ্চাশের মতো। মাথায় বড় টাক। মোটা কাঁচাপাকা গোঁফ। কপালে সব সময় কমলা তিলক কাটা থাকে।
নিশান বসে তাকাল তারকের দিকে। তারক সময় নিয়ে পাশের ড্রয়ার খুলে একটা বইয়ের মতো দেখতে স্টিলের কৌটো বের করল। সেটা খুলে একচিমটে জরদা মুখে পুরে চিবোল চোখ বন্ধ করে। তারপর চোখ খুলে শান্ত গলায় বলল, “শুয়োরের বাচ্চা, সোনাঝুরিতে বিপ্লব মারাচ্ছ? আলিপুর অবধি গিয়ে দরবার করার তাল ছিল? কী ভেবেছিস আমি জানব না? তোদের খেদিয়ে দিয়েছে কেন জানিস? আমি ফোন করে বলেছিলাম তোদের যেন পাত্তা না দেয়। কী ভেবেছিস? আমি ঘাস কেটে বেড়াই! তোকে আর তোর ওই বিজনকে না পোঁদে বাঁশ দিয়ে গঙ্গার পাড়ে টাঙিয়ে রাখব! এই প্রোজেক্ট হবে। যে-কোনও মূল্যে হবে। দেখি তোর কোন বাপ আটকায়! বেশি পেঁয়াজি করলে জোনাক-বাড়ির পেছনে পুঁতে দিয়ে কংক্রিট করে দেব। কেমন! এবার ফোট শুয়োর! শালা বিপ্লবী! বোকা…”
নিশানকে কেউ যেন পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে চেয়ারের সঙ্গে। এসির মধ্যে বসেও কুলকুল করে ঘামছে ও! কান লাল হয়ে গিয়েছে! এসব কী শুনল ও! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে যেন! তারকের চেহারাটা কেমন যেন কাঁপছে। শান্ত গলায় কেউ এমন করে বলতে পারে?
নিশান কোনওমতে উঠল। পা টলছে ওর! হাত কাঁপছে! একটা রাগ লাভার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা শরীরে! নিশানের মনে হচ্ছে এই সময়ই হয়তো মানুষ বোমার মতো ফেটে পড়ে!
ও আর-একবার তাকাল তারকের দিকে। তারক নির্লিপ্তভাবে জরদা চিবোচ্ছে। নিশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। ও জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। শুনল কড়কড় করে বাজ পড়ল একটা। নিশান সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে সেই তীব্র বিদ্যুৎ টেনে নিল নিজের ভেতরে। তারপর টলতে-টলতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
