রাস্তাটা এখান থেকে ডান দিকে বেঁকে গিয়েছে। সামনে জামতলা আছে একটা। চারটে বিরাট বড় জাম গাছ। আগে জায়গাটা খোলা থাকত। কিন্তু এখন একটা মন্দির হওয়ায় চাতালের মতো জায়গাটাকে করোগেটেড টিনের শেড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আগে, গরমকালে রাস্তাটা জাম পড়ে বেগুনি হয়ে থাকত।
এইসব জায়গা দিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে হারিয়ে যাওয়া সোনাঝুরির কথা খুব মনে পড়ে নিশানের। সেখানে এই যে চটকল বিক্রি করে দেওয়া হবে, জোনাক-বাড়িসহ বিশাল জায়গাটা বিক্রি করে বড় ফ্ল্যাট উঠবে, গলফ কোর্স হবে, আরও কত কী হবে! কিন্তু এটা ঠিক মানতে পারে না ও। কষ্ট হয়।
সেই কারণেই তো সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান। বিজনদার সঙ্গে পরামর্শ করেই গিয়েছিল!
আসলে ওদের পার্টির হয়ে বিজনদা যতই আত্মত্যাগ করুক না কেন, এখন তারক চক্রবর্তীই সোনাঝুরির শেষ কথা। কলকাতায় পার্টির হাইকম্যান্ডের সঙ্গে তারকদার নাকি খুব দহরম-মহরম। সেই তারক চক্রবর্তী নাকি চায় এসব কর্মকাণ্ড এখানে হোক। শুনছে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য জুট মিলটাতেও খুব গোলমাল বাধানোর চেষ্টা হচ্ছে!
পার্টির ভেতরে থেকে কিছু করা যাবে না সেটা ওরা বুঝেছে। বিজনদাকে কেউ সামনে অসম্মান না করলেও পাত্তাও খুব একটা দেয় না।
বিজনদার পরামর্শেই নিশান আর কেয়াদি মিলে ‘সেভ সোনাঝুরি’ নামে একটা মঞ্চ করেছে। আর নিশান দেখেছে, বেশ কয়েকজন মানুষ এসে যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে।
প্রতিসপ্তাহে একটা করে মিটিং আয়োজন করছে ওরা। বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছে। একটা পিটিশন তৈরি করেছে। সকলের সই নিয়ে সরকারের কাছে যাওয়ার ইচ্ছেও আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, কতদূর কী হবে সেটা জানে না ও। এখনকার অর্গানাইজ়ড ওয়েলথের কাছে এসব প্রতিরোধ-টোধ তেমন কাজে দেয় না। তাও নিশান চেষ্টা করছে। আর সেই চেষ্টার ফলশ্রুতি হিসেবেই জুনের প্রথম দিকে সেদিন কলকাতায় গিয়েছিল নিশান।
যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিজনদা বলেছিল, “মিলের আর জোনাক-বাড়ির যারা মালিক, একবার তাদের বাড়িতে যা। অফিস-টফিস নয়। সোজা বাড়িতে একদম। নিজেদের কথাটা বল।”
“বাবা! একদম সোজা বাড়িতে?” নিশান একটু অবাক হয়েছিল।
“হ্যাঁ, তাতে কী? আমি ঠিকানা দিচ্ছি। সকলের ওপরে যিনি আছেন, উনি একজন ভদ্রমহিলা, দীপমালা দেবী। গিয়ে কথা বল। দেখ কী হয়, আমার মনে হয় উনি আর-পাঁচজনের মতো নন।”
“কী করে তুমি সেটা বুঝলে? আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। সে না হয় যাব। কিন্তু তুমি যাবে না?” নিশান তাকিয়েছিল বিজনদার দিকে।
বিজনদা চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল জানলায়। ধু ধু দুপুরের দিকে চোখ রেখে বলেছিল, “না, আমি যাব না।”
“কেন? তুমি চলো। জোর হবে। বয়সের তো একটা ওয়েট আছে না কি?”
বিজনদা সময় নিয়েছিল একটু। তারপর ওর দিকে ঘুরে বলেছিল, “সব কিছু তোকে জানতে হবে না। যা বলছি কর। আর-একটা কথা। আমার নাম বলবি না কিন্তু। এটা মনে থাকে যেন। বিজন সরখেল নামটা উচ্চারণ করবি না।”
গিয়েছিল নিশান। সঙ্গে বুচা বলে একটা ছেলেও ছিল। বুচা ওদের পাড়ায় থাকে। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে যায়। তা ছাড়া ‘সেভ সোনাঝুরি’ প্রোজেক্টেও ওর সঙ্গে আছে।
আলিপুরে বিশাল বাড়ি দীপমালা দেবীর। উঁচু পাঁচিল। পেল্লায় লোহার দরজা। বাড়ির ভেতরে বিশাল লন। একপাশে সুইমিং পুল। দেখে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল নিশানের!
প্রথমে দরোয়ান ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। কিন্তু সোনাঝুরি থেকে এসেছে, খুব জরুরি দরকার বলায় ভেতর থেকে বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল।
বসার ঘরটায় ঢুকেই তাক লেগে গিয়েছিল নিশানের! একটা ছোটখাটো ফুটবল মাঠ যেন! ঘরের একপাশ দিয়ে শ্বেতপাথরের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপরে। ঠিক হিন্দি সিনেমায় এমন দেখা যায়।
একজন মহিলা ওদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে এসেছিল। তারপর সোফা দেখিয়ে বলেছিল বসতে।
বুচা তো চোখ গোলগোল করে এদিক-ওদিক দেখছিল। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলেছিল, “এ কোথায় আনলে গুরু? আমি যা জামাকাপড় পরে এসেছি, মাটিতে বসব কি?”
নিশান বলেছিল, “চুপ কর। কীসব হাবিজাবি বলছিস?”
বুচা বলেছিল, “আমায় এরা দত্তক নেবে? শালা ডাল, রুটি আর চারাপোনা গিলে-গিলে পেট যোগেন সর্দারের পুকুর হয়ে গিয়েছে! এরা এত টাকা কী করে রোজগার করে গো?”
“তোর কি টাকার দরকার?”
হেসেছিল বুচা, “মাইরি নিশানদা। যা কমিক করো না তুমি! শাহরুখ খানকে জিজ্ঞেস করো, দেখবে ওরও টাকার দরকার। আমার শালা বিড়ি চুষে-চুষে গালে পাঁচশো চাল ধরার মতো গর্ত হয়ে গেল! আর বলে কিনা, টাকার দরকার আছে!”
নিশান কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারেনি। আচমকা সিঁড়ির কাছে একটা গলা পেয়েছিল। যে-মহিলাটি ওদের বসতে বলেছিল, সে কথা বলছিল আর-একজনের সঙ্গে। সেখানে নিশান নিজের নামটাও শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু অন্যজন কিছু না শুনে তরতর করে উঠে গিয়েছিল সিঁড়ি বেয়ে।
আর পেছন থেকে হলেও মেয়েটাকে দেখে চমকে গিয়েছিল নিশান। রাধিয়া!
নিশানের বুকের রক্ত যেন চলকে উঠেছিল মাথা পর্যন্ত! ও ভূতে পাওয়া মানুষের মতো উঠে এগিয়ে গিয়েছিল সিঁড়ির দিকে। দেখেছিল, মেয়েটা ক্ষণিকের জন্য যেন থমকে দাঁড়াল। কিন্তু তারপরেই আবার উঠে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বাড়ির ভেতরে।
