কাকিমা মেঘলার হাত ধরে এগিয়ে এল এবার, “নিশান, তুই এসব ভাবিস না তো আর। আমার ছেলে, মেয়ে দুটোই তোকে দেখলে খালি মাগুনে মানুষের মতো কথা বলে। অবশ্য আমিও আগে এমন বলতাম! ভাল কথা, তোকে বলা হয়নি, রহিম আমার অর্ডার বাড়িয়ে দিয়েছে। ও লোক দিয়ে মাল নিয়ে যায়। শুনলাম তুই নাকি বলে দিয়েছিস!”
নিশান হাসল। যাক, কাকিমা অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছে। মেঘলার রাগ, বাদলের হাহাকার, ওকে কেমন যেন কোণঠাসা করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ও শ্বাস নিতে পারছে না!
নিশান বলল, “হ্যাঁ, রহিমদাকে বলেছিলাম যেন ব্যাপারটা একটু দেখে নেয়।”
বাদল আবার বলল, “তুই খুব হেল্প করেছিস আমি জানি। তোর ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। শুধু দেখিস ভাই, যদি কোনও কাজ দেখে দিতে পারিস।”
নিশান হেসে বলল, “তুই এভাবে বলছিস কেন? আমি চেষ্টা করব নিশ্চয়ই।”
“আমরা তা হলে আসি। কেমন?” বাদল হাসল।
“আয়।”
“তুইও আসিস বাড়িতে। জানি তুই ব্যস্ত, কিন্তু তার মধ্যেও আসিস প্লিজ়!” বাদলের গলা ধরে এল আবার।
নিশান হেসে মাথা নাড়ল। দেখল, যাওয়ার আগে মেঘলা আন্দাজে ওর দিকে হাত নাড়ল।
রাস্তা পার করে বাদলরা অটোয় উঠল এবার। নিশান ঘড়ি দেখল, পৌনে সাতটা বেজে গিয়েছে। আর দেরি করলে তারকদা রাগ করবে খুব।
আবার স্টেশনের টিকিট-ঘরের দিকে হাঁটা দিল নিশান। সাইকেলটা নিতে হবে গ্যারেজ থেকে। আকাশের দিকে তাকাল ও। মেঘ করে আছে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভাল লাগছে নিশানের। যা গরম পড়েছে! আর পারছে না!
আর-একটা ট্রেন আসবে। গেট পড়ছে, শুনতে পেল নিশান। তাড়াতাড়ি এবার বেরোতে হবে। না হলে খুব মুশকিল আছে। রাস্তায় সাইকেল চালানো দায় হয়ে যাবে ভিড়ের চোটে।
পিন্টুকে সাইকেল রাখার ভাড়া মিটিয়ে পাড়ার ভেতরের পথ ধরল নিশান। আগে এই রাস্তাগুলোয় ইট পাতা ছিল। বর্ষাকালে পিচিক পিচিক করে কাদা উঠত। খুব অসুবিধে হত। এখন সব রাস্তাগুলো কংক্রিটের হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে কোথাও চলটা উঠে গিয়েছে বটে, কিন্তু তাতেও খুব কিছু অসুবিধে হয় না।
আগে যখন ওরা স্টেশনের ওই পারে থাকত, এই পথ দিয়ে নিশান স্কুলে যেত। এখনও চোখ বন্ধ করে সব বলে দিতে পারে ও। একটা বড় কাঁঠাল গাছের পাশের ভাঙাচোরা বাড়িতে একটা বুড়ো পাগল থাকত। জানলা দিয়ে মুখ বের করে বসে থাকত থুত্থুড়ে বুড়োটা। মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে যাওয়া লোকদের দিকে তাকিয়ে পুঁচকি একটা হাসি দিয়ে বলত, “বিলকিস!”
তখন ওই ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ত নিশান। ওর খুব কষ্ট লাগত বুড়োটাকে দেখে। এখনও মনে আছে, শনিবার দিন হাফছুটি হত বলে টিফিন খেত না ও। বুড়োটার জন্য বাঁচিয়ে নিয়ে আসত। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আলতো গলায় ডাকত, “বিলকিসদাদু, ও বিলকিসদাদু।”
বুড়োটা আসত। ফোকলা জানলা দিয়ে হাত বের করে বলত, “দে, বিলকিস দে।”
নিশান টিফিনটা বাড়িয়ে দিত। বুড়োটা টিফিনবাক্স থেকেই খাবার খেত। তারপর বাক্সটা ফেরত দিত নিশানকে।
খাবার খাওয়ার সময় বুড়ো কত কী যে বলত! এখনও কিছু কিছু মনে আছে নিশানের। বুড়ো বলত, “শালা, বিলকিস করেছ কী বিলকিস করে দেবে।” বলত, “শালা লাইফটা পুরো বিলকিস হয়ে গেল!” বলত, “কত বারণ করলাম, কিন্তু শুনলে তো আর মালটার অমন বিলকিসের হাল হত না!”
নিশানের সঙ্গে ওর স্কুলের দু’-তিনজন বন্ধুবান্ধবও থাকত। ওরাও নিশানের দেখাদেখি খাবার দিত। হাসত। মজা করত।
সেই বুড়ো একদিন ট্রেনে কাটা পড়ল। স্কুল যাওয়ার পথে তারপর থেকে ওই ফোকলা জানলাটা দেখলে কেমন একটা মনখারাপ করত নিশানের।
আজ সন্ধের অন্ধকারে ওই জায়গাটা পার হতে-হতে বাড়িটার দিকে তাকাল নিশান। বাড়িটা প্রায় ধসে পড়ার মতো অবস্থায়! সারা গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বট আর অশ্বত্থ জড়িয়ে ধরেছে বাড়িটাকে। আশপাশের বাড়িগুলো থেকে ছিটকে আসা আলোয় এই বাড়িটাকে রুগ্ণ রাক্ষসের মাথার মতো মনে হচ্ছে।
নিশান ভাবল, সময় কেমন দ্রুত চলে যায়! চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় এই তো সেদিন স্কুল যাওয়ার আগে কেমন মায়ের সঙ্গে খেলা করত নিশান! দৌড়ে বেড়াত পেয়ারা গাছের চারপাশে। রোদ এসে গাছের ডালে লেগে ছিটকে কুচি কুচি হয়ে ছড়িয়ে পড়ত উঠোনে। বাবা বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই ‘বাবু’ বলে ডাকত ওকে। হাতে দিত খেলনা জিপগাড়ি। নিবেদনী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিহিদানা। সকাল দুপুরের দিকে গড়ালে ভীষণ ট্যারা ভগবান নাপিত আসত তার অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস নিয়ে। উঠোনে বসে ঠাকুরদার চুলে কাটত। কুচকুচ শব্দ ছড়িয়ে যেত পাড়ার হাওয়ায়। ওর মনে হল, এই তো সেদিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকত এগারো-বারো বছরের নিশান। স্কুলফেরতা পুকুর-বাগানের ঝোপ থেকে রঙ্গন ফুল তুলে মধু খেত। দেখত, একলা টুনটুনি পাখি অস্থিরভাবে লাফিয়ে চলেছে। দামুদার আচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকত সারাটা সপ্তাহ। আর তারপর সৌমিদি, লালিদিদের বাড়ির ওদিকে সূর্য নেমে গেলে বুঝত, আজ আর রোগা বৈষ্ণবদাদু আসবে না এ পাড়ায়। তখন কী সুন্দর হাওয়া আসত। আর তাতে ডুবে, ভেসে এই সব দেখতে দেখতে নিশান ভাবত কী মজারই না এই জীবন! ভাবত, হে ভগবান, এ জীবন যেন শেষ না হয়! আর আজ দ্যাখো, সবটাই কেমন ওই বাড়িটার মতো বাতিল হয়ে গিয়েছে! ইরেজ়ার দিয়ে ঘষে কে যেন মুছে দিয়েছে সব ছবি! শুধু খাতার পাতায় পড়ে আছে পেনসিলের মনমরা গভীর দাগ!
