“আবার?” মণীশ মালপত্তর পায়ের কাছে রাখল। তারপর ভুরু কুঁচকে বলল, “আবার ছেলে ধরা শুরু করেছ? তোমায় বলেছি না এসব বলবে না আমায়! তোমাদের পার্টিতে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই!”
নিশান রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? প্যাডেল মারো। যাও।”
রিকশাটা চলতে শুরু করল। মণীশ পেছন ঘুরে রিকশার পাশ দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “এভাবে কিছু হবে না। এভাবে র্যানডাম ছেলে ধরে লাভ নেই। এই সমাজের একটা টোটাল ওভারহলিং দরকার। সেটা তোমার ওই বিজনদাদুকে দিয়ে হবে না। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হওয়ার দিন গেছে নিশানদা। বিপ্লব এখন ব্যাবসাজীবী, পরজীবী, বুদ্ধিজীবী আর সেলফিজীবীদের বাপের মাল। বুঝলে?”
নিশান হাসল। আশপাশের লোকজন দেখছে। পাশের পানের দোকানের বিহারি লোকটি নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল, “পাগলা গয়া ক্যা ছোঁড়া?”
নিশান মাথা নাড়ল। মণীশ ভুল কিছু বলছে না। কিন্তু চারিদিকে সব দেখেশুনে খুব মনখারাপ লাগে নিশানের। মানুষের মূল্যবোধ বলে ব্যাপারটাই আর নেই। অবশ্য থাকবেই-বা কী করে? বোধেরই কোনও মুল্য নেই আর! কী করে যে সবটাই এমন টাকা আর শো অফ-এর পৃথিবী হয়ে গেল কে জানে!
নিশান পেছনে ফিরল। সাইকেলটা নিতে হবে। সাতটায় দেখা করতে বলা হয়েছে ওকে। তারক চক্রবর্তীর অফিসে যেতে হবে। কেন ডেকেছে কে জানে!
“নিশান!” আচমকা পেছন থেকে ডাকে থমকে দাঁড়াল ও। চেনা লাগছে গলাটা। ও ঘুরল। আরে, বাদল!
নিশান দেখল মেঘলা আর কাকিমাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসছে বাদল।
নিশান হেসে এগিয়ে গেল, “তুই! কেমন আছিস?”
বাদল কিছু বলার আগেই মেঘলা বলল, “তুমি কে? কে অধিকার দিয়েছে এসব জিজ্ঞেস করার? আমরা কেমন আছি জেনে কী করবে তুমি?”
নিশান হাসল। মেঘলাটা খুব অভিমানী। আসলে বেশ কিছুদিন ওদের বাড়ি যাওয়া হয়নি। নানা কাজে আটকে গেছে। তাই মেয়েটা রেগে গেছে খুব!
ও মেঘলার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে একটা কালো সানগ্লাস। চিনতে পারল নিশান। এটা ওরই কিনে দেওয়া। বাইরে বেরোলে এটা চোখে দেয় মেঘলা।
নিশান হেসে মেঘলার মাথায় হাত দিল, “তুই জানিস না, আমি কে?”
“না জানি না,” মেঘলা রেগে গিয়ে মাথা সরিয়ে নিল, “কে তুমি? অচেনা মেয়ের গায়ে হাত দিচ্ছ? লম্পট! মলেস্টেশানের চার্জ আনব তোমার নামে।”
“কীসব বলছিস তুই পাগলের মতো?” বাদল মৃদু স্বরে ধমক দিল মেঘলাকে।
নিশান হেসে বলল, “আরে বলুক না ও, পাগলি তো! আমার আসলে কাজ ছিল রে মেঘলা। খুব কাজ। জানিস তো সোনাঝুরিতে কী হচ্ছে! সেই নিয়ে ব্যস্ত আছি।”
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল, “আমি কিচ্ছু জানি না, জানতেও চাই না। তুমি বাজে ছেলে। দাদা যে বাড়িতে ফিরল, সেটাও কি জানো? আমরা কে হই তোমার? দয়ার পাত্র তো শুধু!”
নিশান চুপ করে গেল। আসলে বাদল যে জেল থেকে ছাড়া পাবে সেটা শুনেছিল, কিন্তু সত্যি বলতে কী ভুলে গিয়েছিল একদম। সোনাঝুরিতে ওই জোনাক-বাড়িসহ জুট মিলের বিক্রির ব্যাপারে একটা ঝামেলা পেকে উঠেছে। সেটা নিয়ে বেশ কিছুদিন হল বেশ ব্যস্ততা বেড়েছে ওর। সেই নিয়ে নানা জায়গায় যেতে হচ্ছে!
কথাটা মনে পড়তেই নিশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল! সামনে ভেসে উঠল একটা দোলনা। শূন্য একটা দোলনা। বারান্দায় একা একা দুলছে।
বাদল এগিয়ে এসে বলল, “তুই বেশ রোগা হয়ে গেছিস নিশান। খাওয়া-দাওয়া করছিস না?”
নিশান হাসল। বাদল ওর চেয়ে সামান্য বড়। তাই দাদা-টাদা বলে না কখনও। বাদলের চেহারাটা খারাপ হয়ে গিয়েছে বেশ। চুল উঠে গিয়েছে। পেকেও গিয়েছে। মুখটা পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছে একদম। দেখে মনে হচ্ছে এই ক’দিনে দশ বছর বয়স বেড়ে গিয়েছে ওর!
নিশান কী বলবে বুঝতে পারল না। বাদলকে তো আর ওর শরীর নিয়ে কিছু বলা যায় না। কারণ, তা হলেই জেলের অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ এসে পড়বে।
ও বলল, “আমার কথা বাদ দে। তোরা গেছিলি কোথায়?”
বাদল মাথার চুলে হাত বুলিয়ে এলোমেলো চুলগুলোকে ঠিক করে নিল একটু। তারপর বলল, “মেঘলাকে নিয়ে গেছিলাম ডাক্তারের কাছে। ওই চোখটা দেখানোর ছিল।”
“তো পজ়িটিভ কিছু হল?” নিশান জিজ্ঞেস করল।
“পজ়িটিভ মানে,” বাদল দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “সাউথে নিয়ে যেতে বলছে। অনেক টাকার ব্যাপার। আমার এখন যা পরিস্থিতি…”
নিশান মাথা নামিয়ে নিল। সত্যি, টাকাটা কোথায় পাবে ওরা?
বাদল এগিয়ে এসে হাত ধরল নিশানের, “তুই কিছু করতে পারবি আমার জন্য? কোনও কাজকম্ম দেখে দিতে পারিস? আমি জানি ব্যাপারটা সোজা নয়। জেল থেকে এসেছি শুনলে কেউ বিশেষ কাজ দেবে না। তাও তুই দেখিস একটু। আমি যা করেছি আগে করেছি। আর কোনও খারাপ কাজে যাব না রে। একটা কাজ দেখে দিস ভাই। খুব অসুবিধেয় আছি।”
কথা বলতে-বলতে বাদলের গলা ধরে এল। চোখে জলও এসে গেল যেন। খারাপ লাগল নিশানের। একসময় ওর কাছের বন্ধু ছিল বাদল। ওকে এই অবস্থায় দেখতে ভাল লাগছে না। তা ছাড়া মানুষ তো ভুল করেই। কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল ভুলটা রিপিট না করা। বাদলকে দেখেই বুঝতে পারছে, অতীত নিয়ে বাদল খুব অনুতপ্ত। কিন্তু নিশান কাজ দেবে কী করে? ও নিজেই কাজ করে না। বাবাকে বলতে পারে, কিন্তু তাতে লাভের চেয়ে গালাগালি খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বাবার সঙ্গে ওর পটে না একদম। নিশান বুঝতে পারল না কী বলবে।
