ডবল ডিমাই সাইজ়ের কাগজ। সঙ্গে কভারের জন্যও মোটা ধরনের কাগজ। এই সব বয়ে আনা চাট্টিখানি কথা নাকি? পথ বেশ অনেকটা। কলেজ স্ট্রিট থেকে শিয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে এই সোনাঝুরি। অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে নিশানের।
সোনাঝুরিকে কলকাতার সঙ্গে আরও দ্রুত মেলানোর জন্য একটা ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাটের হাল খুব খারাপ, তাই ইচ্ছে থাকলেও ট্যাক্সি করে নিয়ে আসা যায়নি কাগজগুলো।
নিশান একা যায়নি। কারণ, এত কাগজ আনা ওর একার পক্ষে সম্ভব নয়। মণীশকে নিয়ে গিয়েছিল সঙ্গে করে। মণীশের এসব কাজ করা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু কেয়াদির সঙ্গে বেশ ঝগড়া করে ছেলেটা।
নিশান কাগজের বান্ডিলগুলো একপাশে রেখে দাঁড়াল। স্টেশনে খুব ভিড়। রাস্তার অবস্থা খারাপ বলে প্রায় সকলেই ট্রেনেই যাতায়াত করে আজকাল। সারাটা পথ এই মালপত্তর নিয়ে ট্রেনে ওঠায় লোকের বিরক্তি আর গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে নিশানকে। এখনও কাগজ নিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখতে গিয়ে নিশান গালাগালি খেয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। ও এদিক-ওদিক তাকাল। ভিড়টা কমে গেলে বেরোবে। মণীশ ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে।
সাতটার সময় ওর একটা কাজ আছে। ও ঠিক করছে কাগজগুলো দিয়ে মণীশকে রিকশা করে কেয়াদির বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। স্টেশনে ওর সাইকেল রাখা আছে। তাই ও আর রিকশায় যাবে না।
সোনাঝুরি আর মফস্সল নেই। কলকাতার কাছে বলে শহরের ভাবভঙ্গি খুব দ্রুত এসে ছুঁয়ে দিয়েছে ওদের ছোট শহরটাকে।
নিশান ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখল। হা-ক্লান্ত মানুষজন কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। পাখি আর মানুষে কী মিল!
“কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?” মণীশের গলায় বিরক্তি।
নিশান বলল, “ভিড়টা বেরিয়ে যাক। এত পেপার নিয়ে যাওয়া যায় নাকি?”
মণীশ নাক দিয়ে একটা বিরক্তির শব্দ করল, “শালা, ঘরের খেয়ে যতসব বনের মোষের পেছনে হাওয়া দেওয়া!”
নিশান হাসল, “কেন? কী হল?”
“লিটল ম্যাগ। সব ব্যাঙের জিনিসপত্র! কেয়াদিদার এত টাকা যখন, তখন গরিবদের বিলিয়ে দিলেই তো পারে! বেকার এসব করার কী মানে?”
নিশান হাসল আবার, “আরে, আবার দিদা বলছিস? কেয়াদি শুনলে হেভি খচে যাবে।”
“তো, তাতে আমার বয়ে গেল! অত বুড়ি একজন, দিদা বলব না তো কি দিদি বলব?”
নিশান বলল, “তুই এমন রেগে থাকিস কেন সারাক্ষণ? কীসের এত রাগ বল তো তোর?”
মণীশ আবার নাক দিয়ে বিরক্তির শব্দ করল, “এ পৃথিবীতে না রেগে মানুষ থাকে কেমন করে সেটাই তো আমি বুঝি না! কী আছে যাতে মাথা ঠান্ডা থাকবে? ট্রেনে করে আসতে গিয়ে দেখলে তো মানুষজন কেমন হয়ে গিয়েছে? সব শালা খেঁকি কুত্তা!”
“কিন্তু এর মধ্যেই তো বাঁচতে হবে। রাগ করলে হবে? কুল থাক। অত রেগে যাস না। চল এগোই…” নিশান হেসে পিঠে হাত রাখল ওর।
ভিড়টা কমে গিয়েছে। টিকিট-ঘরের পাশ দিয়ে নেমে গিয়েছে রাস্তা। একটা পাড়ার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, আর অন্যটা চলে গিয়েছে বড়রাস্তার দিকে। ওই বড়রাস্তার মোড়েই রিকশা-স্ট্যান্ড। আর স্টেশনের পাশে সাইকেলের গ্যারেজ।
নিশানকে দেখে সাইকেল-গ্যারেজের পিন্টু বলল, “কী দাদা, ওই দিকে যাচ্ছ? সাইকেল নেবে না?”
নিশান হেসে বলল, “আসছি দাঁড়া।”
পথটা খুবই এবড়োখেবড়ো। আলো নেই। রাস্তার একদিকে রেলের পুরনো কিছু কোয়ার্টার আর অন্যদিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটা দরমার বেড়ার দোকান। ওই দোকানের আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে পথ। সামান্য অন্যমনস্ক হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে!
নিশান ছোট থেকেই এই রাস্তাটাকে এমন দেখছে। কখনও ঠিক করা হয় না। কেন হয় না কে জানে! মানুষজন এই নিয়ে কিছু বলেও না। নিশান বোঝে আসলে ওরা সবাই আজকাল সেফ খেলতে শিখে গিয়েছে। আর সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নামক ঘরে বসে বিপ্লব করার মতো একটা মাধ্যম এসে যাওয়ায় ড্রয়িংরুম-বিপ্লবীর সংখ্যা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, আসল কাজের কাজ কিছু হয় না। আর এমন চললে আর হবেও না।
ট্রেনের যাত্রীরা চলে যাওয়ায়, মাত্র একটাই রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার ওই পারে অটো স্ট্যান্ডও রয়েছে। সেখানে ঠেসাঠেসি করে লোক নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নেওয়ার নিয়মের কেউ তোয়াক্কা করে না!
কেয়াদির বাড়ি চ্যাটার্জিপাড়ার ভেতরে। অটো নামিয়ে দেবে বড়রাস্তায়। সেখান থেকে হেঁটে প্রায় পনেরো মিনিট লাগবে। তাই রিকশাই ভাল। একদম বাড়ির দরজায় গিয়ে নামবে।
মণীশ রিকশায় উঠে বলল, “কেয়াদিদার কাছ থেকে কি আমি টাকা নিয়ে নেব? মানে রিকশা ভাড়া থেকে আজকের যাতায়াতের খরচ? তুমি চাইবে বলে তো মনে হয় না!”
“আরে, একদম ওসব বলবি না,” নিশান তাড়াতাড়ি বলল, “আমি সেটা ঠিক কথা বলে নেব। আর ক’টাই-বা টাকা! ওসব নিয়ে ভাববি না তুই একদম। আর শোন, লক্ষ্মীভাইটি আমার, সামনে দিদা বলিস না। জানিস তো কেমন রাগী।”
মণীশ ভুরু কুঁচকে বলল, “আশ্চর্য তো! এসব কমপ্লেক্স কেন বলো তো? ডাক্তার দেখায় না কেন? দিদার বয়সি মহিলাকে দিদি বলব কেন? বয়স তো হবেই। সেটা লুকোনোর কী আছে? ডেবিট কার্ডের পিন নাম্বার নাকি?”
“ওরে ভাই রে, একটা কথা অনন্ত তর্ক না করে মেনে নে বাবু!” নিশান পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে রিকশাওয়ালাকে ভাড়াটা দিয়ে মণীশকে বলল, “কাল একবার আসিস বিজনদার ওখানে। কথা হবে।”
