আর তখনই ওদের চোখে পড়ল পেখমের। দুটো-চারটে করে অন্ধকারের পরদা সরিয়ে উঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে ওরা। জোনাকিরা। সবুজ-হলুদ আলো জ্বেলে সামনের ঝোপ থেকে লাজুক মুখে বেরিয়ে আসছে জোনাকিরা। যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে তারা! যেন মনের না-মেটা ইচ্ছের আলোবিন্দু! যেন সন্ধে নামক নারীর ফেলে যাওয়া টিপ!
পেখম তাকিয়ে রইল ওই আলোর বিন্দুর দিকে। ওর মনে পড়ে গেল কাজুর কথা। এমনই এক সন্ধেবেলা কাজু জোনাকি দেখে বলেছিল:
‘অন্ধ আমার জীবন জুড়ে রাত্রি একা নামে
তোমার বাড়ির মাথায় এসে কাদের আকাশ থামে?
কাদের শহর চমকে ওঠে তোমার ধ্রুবতারায়
কোথায় কারা ভিজল, যখন বৃষ্টি তোমার পাড়া
সাজিয়ে তোলে বর্ষাতি আর একলা বকুল দিয়ে?
তোমার মুখের হলুদ আভা নিজের পিঠে নিয়ে
বন্ধু নামের বিন্দু যেন আলোর মতো ভাসে
তোমার কথা ভাবলে আমার জোনাক মনে আসে!
“দিদি, তুই এসে গেছিস?”
পেখম সামান্য চমকে উঠল টেটুর ডাকে। ও চট করে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিল। তারপর নিজেকে সামলে তাকাল টেটুর দিকে।
টেটু কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল এবার, “তুই কাঁদছিস দিদি?”
“কই, না তো!” পেখম হাসার চেষ্টা করল।
টেটু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল পেখমের দিকে। তারপর বলল, “আমি জানি তুই কাঁদছিস। আমি কি বুঝি না? আমিও বড় হয়েছি।”
পেখম হাত বাড়িয়ে ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, খুব বড় হয়েছিস! রাতে একা বাথরুমে যেতে ভয় পায়, আবার বড় হয়েছে!”
টেটু বলল, “আরে, সে তো সবাই ভয় পায়। তাতে কেউ ছোট হয়ে যায় নাকি? এই যে জেঠু পুলিশে আছে। সেই জেঠুও তো ভয় পায় পাগলা কুকুর দেখলে। আমার বাবা যে বাবা, বাবা তো ভয় পায় মাসের শেষ এলে। আর আমার মা, সেদিন আচমকা ঘুম ভেঙে শুনি মা বাবাকে ফিসফিস করে বলছে, ‘এমন শুধু-শুধু কোরো না, আচমকা কিছু হয়ে গেলে… আমার ভয় লাগে।’ তা হলে?”
এই সেরেছে! টেটু কীসব বলছে! পেখম উঠে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরল। ছেলেটা এখনও বাচ্চাই আছে। বলল, “কী বলবি বল।”
“জেমা ওই ঘরে ডাকছে তোকে। খুব দরকার বলল।”
“মা ডাকছে?” অবাক হল পেখম।
“চল, দেখ না কীসব হচ্ছে তোকে নিয়ে…” টেটু আর না দাঁড়িয়ে দৌড়ে চলে গেল!
ওকে নিয়ে! ওকে নিয়ে আবার কী হচ্ছে! পেখম ধীরে-ধীরে মায়ের ঘরের দিকে গেল।
পেখম দেখল ঘরে মা, মিতুকাকিমা, ছোটকাকিমা ছাড়াও বাবা রয়েছে আজ।
ও জানে আজ বাবার অফ ডে। কিন্তু অফ থাকলে তো বাবা দোকানে যায়। আজ যায়নি?
“আয় আয়,” পেখমকে ডেকে ধরে নিয়ে নিজের পাশে মোড়ায় বসাল ছোটকাকিমা। পেখম বুঝতে পারল না কী হয়েছে। এভাবে ওকে ধরে-ধরে বসাচ্ছে কেন?
পেখম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে।
মায়ের মুখটা ঝলমল করছে। মা হাসছে। কতদিন পরে মা হাসছে। আর বাবা? বাবা কেমন যেন একটা মুখ করে বসে রয়েছে! ব্যাপারটা কী?
মিতুকাকিমা নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে পেখমের পাশের টুলে বসল। তারপর বলল, “এভাবে পাগলির মতো থাকিস কেন? একটু সাজগোজ করতে পারিস না?”
“কেন?” পেখম অবাক হয়ে তাকাল মিতুকাকিমার দিকে।
ছোটকাকিমা বলল, “সাজগোজ না করেই তো এই! আর সাজলে কী যে হবে!”
“তা ঠিক…” মিতুকাকিমা হাসল, “এমনি-এমনি কি আর এটা হয়েছে?”
“কী হয়েছে?” পেখম বুঝতে পারল না।
মা ঝলমল করে বলল, “মিতুদি তোর বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে!”
“আমার? বিয়ের?” পেখমের মনে হল কেউ যেন ঠাস করে ওকে একটা চড় মেরেছে!
মিতুকাকিমা ওর হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, তোর। জানিস, কে তোকে বিয়ে করতে চেয়েছে?”
পেখম কিছু না বলে তাকিয়ে রইল মিতুকাকিমার মুখের দিকে।
মিতুকাকিমা হেসে বলল, “সুদর্শন মালিকের ছেলে সুজিত মালিক। ওই জুট মিলের মালিক, ওই জোনাক-বাড়ির মালিক। বুঝতে পারছিস?”
পেখম স্থির হয়ে গেল নিমেষে। মিতুকাকিমার মুখটাও মায়ের মতো হয়ে উঠছে ক্রমশ। ঘরের আলোয় কাকিমার ছোট্ট নাকছাবিটা চকচক করছে। পেখমের সামনে থেকে সব কেমন যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। শুধু চোখের মধ্যে যেন বিঁধে আছে ওই নাকছাবিটা। একলা তারার মতো নাকছাবিটা। পেখম মনে মনে আরও অনেক তারা খুঁজল। কিন্তু আর তারা নেই। আর কোনও তারা নেই। শুধু ওই একটা তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে।
পেখমের মনে পড়ল, একটা তারা দেখে ঘরে ফিরতে নেই। অমঙ্গল হয়। পেখম বুঝল ঠাকুরদা ঠিকই বলেন।
১৫. নিশান
ট্রেন থেকে নেমে ঘড়িটা দেখল নিশান। সাড়ে ছ’টা বাজে। রাতে স্টেশনে যতটা আলো থাকার কথা ততটা আলো নেই। তার ওপর মানুষ নামলেও তার গায়ের জামাকাপড় নামতে পারবে না ধরনের ভিড় এই ট্রেনটায়! এইভাবে কি কাগজ কিনে আনা যায়? কেয়াদিকে বলেছিল, “এমন করে কেন জেদ করছ! কলেজ স্ট্রিটে ডিটিপি করে সেখানেই ছাপতে দিয়ে দাও না। কেন শুধু-শুধু গাধার খাটনি খাটাচ্ছ?”
কেয়াদি কানের বড়-বড় ঝোলা দুল নাড়িয়ে উত্তর দিয়েছিল, “গাধাকে মানুষের মতো খাটাব নাকি? যা বলছি, কর। খালি তর্ক! পার্টি করা মানুষগুলোকে এই জন্য দু’চক্ষে দেখতে পারি না আমি। আর হবি নাই-বা কেন! ওই দেড়েলটার সঙ্গে মিশে-মিশে তুই গেছিস!”
কেয়াদির পত্রিকার নাম ‘সন্দর্ভ’। বছরে তিনটে করে বের করে। এটা বর্ষা সংখ্যা। কেয়াদি পত্রিকাটা সোনাঝুরি থেকেই ছাপাতে চায়। এখানে কম্পোজ় করে, এখানেই ছাপিয়ে, বাঁধাই করে বের করতে চায়।
