সেদিন কাজু কেমন যেন একটু গম্ভীর হয়ে ছিল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আশপাশে খোলা মাঠ পেরিয়ে শীত শেষের হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছিল ওর চুল।
“কেন ডেকেছ?” কাজু দূরের দিকে তাকিয়েই মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।
“কেন মানে? তুমি জানো না কেন? আগে সপ্তাহে একদিন দেখা হত তোমার সঙ্গে আর এখন… এখন কী করে দেখা করব?”
কাজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “পেখম আমাদের সম্পর্ক নিয়ে সবার যখন এত আপত্তি তখন আর কী হবে?”
“মানে?” পেখম স্থান কাল ভুলে এগিয়ে গিয়ে কাজুর হাত ধরে টান মেরেছিল, “এটা কী বলছ তুমি? কার মা-বাবা এসব মেনে নেয়? সবাই প্রথমে আপত্তি করে। পরে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কাজু এবার তাকিয়েছিল পেখমের দিকে। হাওয়া এসে মিশে যাচ্ছিল ওর চুলে। ওর কোঁকড়া চুলগুলো নেমে আসছিল কপালে। পেখম বলেছিল, “সামনের বছর আমি পাশ করে যাব। তারপর একটা চাকরি দেখে নেব ঠিক। তুমিও কিছু চেষ্টা কোরো। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই তো আমাদের সমাজে দরকার। সেটা আমাদের থাকলে দেখবে, কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। আমরা নিজেদের মতো করে সংসার করব।”
কাজু বলেছিল, “আমার পরিবার? তাদের কী হবে? তাদের তো ছেড়ে আমি যেতে পারব না! আর তোমার বাবা মা…”
“ছাড়তে বলছি না তো! আমরা থাকব একসঙ্গে। আর আমার বাবা-মা কড়া মানুষ। কিন্তু খারাপ নয়। ওরা ঠিক মেনে নেবে।”
কাজু কিছু না বলে হেসেছিল, “জীবন কি উত্তম কুমারের সিনেমা, পেখম?”
পেখম এগিয়ে গিয়ে কাজুর বুকের কাছে দাঁড়িয়েছিল। হাওয়া এসে আরও যেন মিশিয়ে দিচ্ছিল ওদের। অদ্ভুত এক সুন্দর গন্ধ পাচ্ছিল পেখম। ও মুখ তুলে তাকিয়েছিল কাজুর দিকে। ওই বড়-বড় চোখ। বাদামি মণি। নরম পশমের মতো দাড়ি। পেখম যেন অতল এক কুয়োয় পড়ে যাচ্ছিল! বুকের ভেতরে কেমন একটা করছিল! মনে হচ্ছিল হাজার হাজার হরিণ দৌড়ে যাচ্ছে ওর শরীর দিয়ে! মনে হচ্ছিল কোথায় যেন ঝনঝন করে রুপোর বাসন পড়ে যাচ্ছে হাত ফসকে!
কাজু আচমকা সরে গিয়েছিল, তারপর হাত দিয়ে পেখমকেও সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আমার সামনে অনেক দায়িত্ব পেখম। অনেক-অনেক দায়িত্ব। অনেক কাজ। তা ছাড়া এভাবে হয় না। এত হোস্টিলিটি তোমার মায়ের! তোমার বাবা-মায়ের একটা মানও তো রয়েছে। আমার মনে হয় এভাবে কিছু করতেও নেই। তুমি এসো এখন।”
মাথা ঘুরিয়ে আবার ঝিকুদাকে দেখল পেখম। ঝিকুদা এখনও তাকিয়ে রয়েছে ফাঁকা প্যান্ডেলের দিকে। আসলে ঝিকুদা নয়, যেন নিজেকেই দেখল ও!
নয়না বলল, “সোজা হয়ে বোস। আর মুখের ওরকম জিয়োগ্রাফি চেঞ্জ কর। তোকে তো যা বলার বলেই দিয়েছে কাজুদা। আর ভাবিস না। তোকে এত সুন্দর দেখতে! সোনাঝুরির প্রায় সবাই তোর পেছনে লাইন দেবে বলে ইট হাতে ঘুরছে! আর সেখানে এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছিস?”
পেখম কিছু বলল না। এই নয়নাকে ওর কাজুর সঙ্গে দেখা হওয়া আর কথা হওয়ার ব্যাপারটা বলাই ভুল হয়েছে। ও ভেবেছিল নয়না কিছু উপায় করবে। কিন্তু নয়না যেন পাত্তাই দিচ্ছে না। পেখমের মনে হল, এভাবে সবার বিরুদ্ধে একা কী করবে ও?
বারুদার স্টুডিয়োর সামনে নেমে গেল নয়না। বলল, “আমার প্যাকেটগুলো তুই নিয়ে যা তো! আমি সাতটা নাগাদ আসব তোদের বাড়ি।”
প্যাকেটগুলো নিয়ে মাথা নাড়ল পেখম। কিছু জামাকাপড় কিনেছে নয়না। কেন কিনেছে কে জানে! মাঝে মাঝেই এসব কেনে ও। জিনিসপত্র কেনাটা ওর বাতিক। ওর বাবা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। পশার খুব বেশি নয়। কিন্তু নয়নার দাদা খুব ভাল চাকরি করে মার্চেন্ট নেভিতে। অনেক টাকা রোজগার করে। বোনের সব শখআহ্লাদ দাদাই মেটায়।
বাড়ির সামনে রিকশা ছেড়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকল পেখম। আজ সদর দরজা খোলা। কোলাপসিবল গেটটাও পুরো হাট করা। কী ব্যাপার! একটু যেন অবাকই হল ও। সেভাবে ওদের সদর বন্ধ করা না হলেও কোলাপসিবল গেটটা টানাই থাকে। আজ সেটা খোলা কেন?
গেট দিয়ে ঢুকে থমকে গেল পেখম। সামনের লম্বা করিডরের এক পাশে খুলে রাখা জুতো দেখে বুঝল মিতুকাকিমা এসেছে!
কাকিমা সাধারণত সন্ধেবেলা সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ আসে। এমন ছ’টার সময় তো আসে না! আর এলেও চুপচাপ কথা হয় মায়ের সঙ্গে। এভাবে জোরে-জোরে হাসি-ঠাট্টা তো কোনওদিন শোনেনি!
জুতোটা খুলে নিজের ছোট ঘরের দিকে গেল পেখম। হাতের কাগজের প্যাকেটগুলো রেখে গায়ের পাতলা চাদরটা খুলে রাখল। একটু পরে পড়তে বসবে। মানে, পড়ার চেষ্টা করবে আর কী। আজকাল কিছুতেই পড়ায় মন বসে না! তাও বসে, চেষ্টা করে।
পেখমের ঘরের জানলার সামনেই অনেকটা ঝোপের মতো। তারপরই পুকুর। সর্দারদের পুকুর।
ওর ঘরে একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। কিন্তু বাইরেটা বেশ অন্ধকার। পুকুরের ওই পাড়ে কলাবাগান। তার আড়ালে একটা বাড়ি আছে। সেখানে অন্যদিন আলো থাকে। কিন্তু আজ ওই বাড়িতেও আলো জ্বলছে না।
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল পেখম। কীসের যে টান অন্ধকারের, ও বোঝে না! কিন্তু এমন করে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে ওর। মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায় ক্রমশ। অন্ধকার যেন ধীরে-ধীরে গুলে যেতে থাকে ওর মধ্যে। ওর সব মনখারাপ কেমন যেন আলোহীনতার সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
