পেখম কিছু বলতেই পারছিল না। মাথা নিচু করে বসেছিল ওই হলুদ আলোর বলয়ের পাশে। চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। পেখম ঝগড়া করতে পারে না। চিৎকার করতে পারে না। কাজু বলে, পেখম এক্সপ্লোড করে না, ইমপ্লোড করে!
এখানেও তাই হচ্ছিল। ভেতরে-ভেতরে যেন ভেঙে পড়ছিল ও। তুবড়ে যাচ্ছিল। আর মাইলের পর মাইল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল জনপদ! বুকের ভেতর জ্বালা করছিল পেখমের। কয়েক হাজার মোম যেন একসঙ্গে পুড়ে যাচ্ছিল নিমেষে! আর তার গলন্ত ফোঁটা টপটপ করে খসে পড়ছিল খুলে রাখা বইয়ে, কাঠের টেবিলে!
মা পায়ের শব্দ তুলে এগিয়ে এসে তুলে ধরেছিল ওর মুখ। ঝাঁজালো গলায় বলেছিল, “এত বাড় বেড়ে গেছিস? এত নোংরা হয়ে গেছিস? এই বয়সেই এত! আর এমন মরাকান্না জুড়েছিস কেন? কে মারা গিয়েছে তোর?”
পেখম মাকে বোঝাতে পারে না, মানুষ বেশির ভাগ সময় অন্যের মৃত্যুতে কাঁদে না! কাঁদে নিজের মৃত্যুশোকে!
নয়না হাত তুলে একটা রিকশা দাঁড় করাল। তারপর নিজে তাতে উঠে পেখমের হাত ধরে টেনে তুলল।
পেখম বসতেই রিকশাটা চলতে শুরু করল।
নয়না বলল, “আমি দাদার দোকানে নেমে যাব। একটা কাজ আছে। তুই বাড়ি চলে যাস। আমি পরে দোকান থেকে তোর বাড়িতে যাব, কেমন?”
দাদা মানে পেখমের জ্যাঠার ছেলে। বারুদা। স্টেশন-রোডের ওপর ফোটোর দোকান আছে বারুদার। সোনাঝুরিতে বারুদার দোকানটাই একমাত্র ফোটো তোলার জায়গা। স্টুডিয়োকে এখানকার লোকজন ফোটোর দোকানই বলে।
নয়নার নতুন শখ হয়েছে ফোটো তোলা শিখবে। বারুদার দোকানে পেখমও গিয়েছে। দুটো ক্যামেরা আছে বারুদার। একটা রোলেইফ্লেক্স, আর-একটা পাজটাস। রোলেইফ্লেক্সটা দেখেছে পেখম। কেমন একটা ছোট বাক্সের মতো ক্যামেরা। মাথার ওপর একটা ঢাকনা খোলা যায়। তারপর সেটা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে হয় ভেতরে। অদ্ভুত লাগে পেখমের। বাইরের ছবি উলটো হয়ে যেন জলের ওপর ভেসে থাকে ক্যামেরার মধ্যে। বারুদা তো ছবিও তুলে দিয়েছে ওর। সাদা-কালো বড় ছবি। পেছনে স্টুডিয়োর দেওয়ালে আঁকা ঝরনা, পাহাড় আর নানা গাছ।
নয়না বলে, বারুদার দোকান দারুণ চলছে। অনেকে নাকি আসে ছবি তোলাতে। বিয়ের ছবিই নাকি বেশি। ও বলে, “ভাল করে শিখে নিই, তারপর দেখবি তোর বিয়ের ছবি আমিই তুলে দেব।”
স্টেশন রোড ধরে রিকশা চলেছে। শীতের শেষ। আশপাশের গাছেদের গায়ে খুব বেশি পাতা নেই আর। সবে সরস্বতী পুজো শেষ হয়েছে। সোনাঝুরিতে অনেক সরস্বতী পুজো হয়। কিন্তু সব ছোট-ছোট। রাস্তার ওপরে কয়েকটা প্যান্ডেল দেখতে পাচ্ছে ও। এখনও খোলা হয়নি।
তারই একটার সামনে ঝিকুদাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল পেখম। মলিন পোশাক, এলোমেলো চুল-দাড়ি। শূন্য প্যান্ডেলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ঝিকুদা।
পেখমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল দৃশ্যটা দেখে। এটাই তো ঝিকুদার জীবনের সত্যি! মেলা ভেঙে যাওয়া, প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পরের শূন্য প্যান্ডেল। এমনটাই তো বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝিকুদা! ওকেও কি এমন শুনশান একটা ম্যারাপবাঁধা শূন্যতা বুকে করে বেড়াতে হবে? মানুষের জীবনে এমন কেন হয়? যাকে সে চায়, তাকে না পেলে এমন ভেঙে যায় কেন সব? সব কিছু অর্থহীন হয়ে পড়ে কেন? কেন মনে হয় এক-একটা দিনের ওজন বিশাল পাথরের মতো? কেন মনে হয় সেই পাথর রোজ ঠেলে তুলতে হচ্ছে পাহাড়ের মাথায়? ভাঙা মানুষ কি আসলে সিসিফাস?
“ওই দেখ বিলকিস!” হিহি করে হাসল নয়না, “শালাটা প্রেম করে মায়ের ভোগে গেছে! ভাইরাও লাথি মেরে বের করে দিয়েছে!”
“তুই হাসছিস!” পেখম অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল নয়নার দিকে। আগে তো মেয়েটা এমন ছিল না! আজকাল কী হয়েছে ওর! কেমন যেন মুখের ভাষা! আর কেমন একটা চাপা হিংস্রতা কাজ করে কথাবার্তায়! মাঝে মাঝে এই নয়নাকে চিনতে পারে না ও।
“দেখ পেখম,” নয়না বলল, “জীবনে কেউ তোকে প্লেটে সাজিয়ে কিছু দেবে না। সব কিছুর একটা দাম দিতে হয়। বিনেপয়সায় কিছু হবে না। ঝিকুদার যা গল্প আমি শুনেছি, তাতে লোকটা ক্যালানে ছাড়া আর কিছু নয়।”
পেখম আর কথা বাড়াল না। ও একটা জিনিস আজকাল বুঝতে পারে— জীবনটা বীজগণিত বা পাটিগণিত নয়! লোককে বুঝিয়ে লাভ হয় না। যে যেটা ভাল মনে করে, সেটাই করে।
“কী হল, চুপ করে আছিস কেন?” নয়না খোঁচা দিল, “দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস তুই! কী হয়েছে তোর? কাজুদার কথা বাদ দে। কাকিমা বারণ করল আর ব্যস, সেও লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল! বোঝ, মানুষ কেমন বোঝ!”
কথাটা যে ঠিক নয়, সেটা জানে পেখম। কারণ, মায়ের ওই কথার পরে একদিন সোনাঝুরি পাম্প হাউসের পাশে কাজুর সঙ্গে দেখা করেছিল পেখম। মা বেরোতে দিচ্ছিল না। কিন্তু বিজনের সঙ্গে যাচ্ছে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল ও।
পাম্প হাউসের মাঠটা শেষ বিকেলে নির্জন থাকে। বিজনকে দিয়ে আগেই কাজুর কাছে খবর পাঠিয়েছিল ও। কাজু এসে অপেক্ষা করছিল পাম্প হাউসের কাছে।
বিজন ছেলেটার বয়স খুব বেশি না হলেও পরিণত অনেক। পেখমকে বলেছিল, “পেখমদি তুমি যাও, আমি ওই সামনের সিনেমা হলের কাছে তেলেভাজার দোকানে আছি। কথা হয়ে গেলে এসো ওখানে।”
পাম্প হাউসের কাছে পেখমকে ছেড়ে দিয়ে বিজন ওই চপের দোকানের দিকে চলে গিয়েছিল।
