.
১৪. পেখম
শ্রীকৃষ্ণ বস্ত্রালয় থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল পেখম। বিকেল শেষ হচ্ছে সোনাঝুরিতে। এই রাস্তা ধরে সামনে গেলে গঙ্গার ঘাট। সেখানে নৌকো লেগেছে নিশ্চয়। পিলপিল করে মানুষ আসছে।
অধিকাংশই নিম্নবিত্ত মানুষ। রুজির জন্য গঙ্গার ওই পারে যায়। ওই পারে ইটখোলা আছে কিছু। একটা কটন মিলও আছে।
পেখম একটু সরে দাঁড়াল। রিকশা যাচ্ছে। সাইকেলও। ঘাটের পাশে সাইকেল রাখার একটা বড় জায়গা রয়েছে। ও জানে আর-একটু পরেই আবার সব ফাঁকা হয়ে যাবে।
ও আকাশের দিকে তাকাল। ওই ওপরে একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। ঠাকুরদা বলেন একটা তারা দেখে ঘরে ঢুকতে নেই। অমঙ্গল হয়।
পেখম এদিক-ওদিক তাকাল, আর-একটা তারা যদি চোখে পড়ে! কিন্তু না, আর কিছু ফোটেনি এখনও। একটা মাত্র তারা মিতুকাকিমার নাকছাবির মতো জ্বলজ্বল করছে আকাশে!
পশ্চিমে মেঘ ঘনাচ্ছে! বৃষ্টি হবে কি? এই শীতের শেষটায় মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। মা বলে এতে নাকি পুণ্য হয় খুব!
কীসের যে ভাল, কীসের যে পুণ্য, পেখম বুঝতে পারে না। আশপাশে আর কী ভাল হতে পারে। ওর তো সারাক্ষণ মনমেজাজ খারাপ হয়ে থাকে আজকাল। সারাক্ষণ মনে হয় বুকের ভেতর কে যেন পাথর বেঁধে রেখেছে। শরীরে যেন ঝিঁঝি পোকা ডাকে। একটা এমন বড় জঙ্গল যে শরীরের ভেতর ঘাপটি মেরে ছিল, সেটা এতদিন বুঝতেই পারেনি। পড়ায় মন বসে না। রাতে ঘুম হয় না ভাল। ভাল করে খেতে ইচ্ছে করে না। সাজতে ইচ্ছে করে না। বাড়িতেও আজকাল কারও সঙ্গে কথাই বলে না পেখম। ইচ্ছেই করে না।
টেটু এসে মাঝে মাঝে জ্বালায়। কেন চুপ করে আছে, সেই নিয়ে খোঁচায়। কিন্তু সামান্য হেসে দু’-একটা কথা বলে টেটুকে কাটিয়ে দেয় পেখম। এই কুড়ি বছর বয়সেই মনে হয় অনেকটা ক্লান্তি এসে গিলে নিয়েছে ওকে!
মা যে কাজুকে সরাসরি রাস্তায় ধরে ডেকে ওকে পড়াতে আসতে বারণ করে দেবে, সেটা ভাবতে পারেনি পেখম!
“কী রে, বললাম দোকানের ভেতরে দাঁড়াতে! না শুনে বাইরে এসে কী করছিস?”
নয়নার কথায় ওর দিকে ফিরল পেখম। আজ একটা পঞ্চো পরে আছে নয়না। শাড়ির ওপর ক্রুশের কাজ করা পঞ্চো। সুন্দর দেখতে। পুরী থেকে কিনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয়, পেখমের জন্যও এমন একটা কিনে এনেছে!
পেখম নিতে চায়নি। ও কিছু দিতে পারে না নয়নাকে। কখনও কিছু দিতে পারে না। সেখানে কী করে ওর কাছ থেকে এটা-ওটা নেবে ও?
কিন্তু নয়না শোনেনি কথা। আসলে নয়না কারও কথাই শোনে না। এত জেদি একটা মেয়ে যে, বলার নয়!
নয়না বলেছিল, “তুই নিবি না তো? ঠিক আছে আমারটাও তা হলে জ্বালিয়ে দেব। তোরটা আমারটা একসঙ্গে জ্বালিয়ে দেব। খুব দেমাক হয়েছে তোর, না? সব ঘুচিয়ে দেব একবারে!”
পেখম নয়নার সঙ্গে জেদ করে পেরে ওঠে না। আসলে কারও সঙ্গেই ও ঠিক জেদাজেদি করে পেরে ওঠে না। পারলে কি আর মা এমন করে কাজুকে আসতে বারণ করে দিতে পারত!
তাই নিয়েছিল পঞ্চো। কিন্তু আজকাল কিছুই যেমন ভাল লাগে না, কিছুতেই যেমন মন নেই, তেমন ওই পোশাকটাও পড়েই রয়েছে বাড়িতে।
“কী হল তোর? এমন মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কেউ মরে গিয়েছে নাকি?” নয়না ঠেলল ওকে।
পেখমের মনে হল বলে, হ্যাঁ, মরে গিয়েছে! পেখম মরে গিয়েছে!
নয়না আবার বলল, “কাজুদাকে কাকিমা বাড়িতে আসতে বারণ করেছে, তো কী হয়েছে? আচ্ছা, সব কিছুতে মেলোড্রামা না করলে তোর হয় না, না? আমি দেখেছি, যারাই প্রেম করে তাদেরই নানারকম ঝামেলা থাকে। আর ফ্র্যাঙ্কলি, কাকিমা ঠিকই করেছেন।”
“কী বললি?” পেখম ঘুরে তাকাল নয়নার দিকে। এটা কী বলল নয়না?
নয়না বলল, “ঠিক বলেছি। কাজুদা কে এমন যে, এভাবে হেদিয়ে মরছিস? কলেজে পড়িস, ওই বাংলা পড়ানোর জন্য কাজুদার দরকার হয় নাকি? কাকিমা ঠিক করেছেন। আর ভেবে দেখ, কোথায় তোরা আর কোথায় কাজুদা! কাজুদাদের ফ্যামিলি দেখেছিস? ওদের জোনাক-বাড়িতে গিয়ে দেখেছিস? কী চাস তুই এই সম্পর্ক থেকে? প্রেম প্রেম করে মাথা খারাপ করিস? আর কিছু নেই জীবনে? এমন করছিস যেন কী না কী হয়ে গিয়েছে!”
পেখম মাথা নিচু করে নিল। নয়নার গলায় অবিকল মায়ের গলাটা শুনতে পেল ও! সেদিন মা ঠিক এমন করেই বলেছিল।
পেখম ঘরে বসে হারিকেনের আলোয় পড়ছিল সন্ধেবেলা। মা ঘরে ঢুকে পাশে মুড়ির বাটি রেখে দিয়ে বলেছিল, “খেয়ে নে। আর, একটা কথা। কাজুকে আমি আসতে বারণ করে দিয়েছি। মাসে পনেরো টাকা করে আর দিতে পারব না।”
“মানে?” পেখম প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেনি, “কী বলছ মা?”
মা শাড়ির আঁচলে হাত মুছে বলেছিল, “বলছি, ওই কলির কেষ্টটিকে আমি আসতে বারণ করে দিয়েছি। কী করবে ও এসে? বেকার টাকার শ্রাদ্ধ! আর এই নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে দরবার করবি না। আমি বাবাকেও বলে দিয়েছি, উনি যেন এ ব্যাপারে আর কোনও কথা না বলেন।”
পেখমের গা-হাত-পা কাঁপছিল। এটা কী করেছে মা? এটা কেন করেছে? কাজুর টাকার দরকার। আর সেখানে ওর মা কাজুকে আসতে বারণ করে দিয়েছে!
মা বলেছিল, “প্রেম করা বের করছি তোর! ওই মাকাল ফল একটা! চাকরি-বাকরির নাম নেই! পার্টি করে। আমাদের কুল গোত্রের কেউ নয়। সেখানে প্রেম! পেখম, তোকে বলে দিচ্ছি, আর যদি ওর সঙ্গে দেখা করিস, তবে দেখিস কী হয়!”
