“শিয়োর,” পলি মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা নিজের ফাইলটা গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। শুধু যাওয়ার আগে সামান্য হাসল মাহিরের দিকে তাকিয়ে।
মাহির মাথা নামিয়ে নিল। সেই বিকেল। ভিড়ে ঝুঁকে যাওয়া গড়িয়াহাট আর একটা মেয়ের গম্ভীরভাবে মাথা নামিয়ে নেওয়া আবার মনে পড়ে গেল ওর।
মাহিরের মাথা নামিয়ে নেওয়ায় পলির ভুরুটা সামান্য কুঁচকে গেল।
পলি বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরটাকে অসম্ভব রকম নিস্তব্ধ মনে হল মাহিরের। শুধু এসির গুঞ্জন। ও দেখল রিতুদা তাকিয়ে আছে ওর দিকে। একদৃষ্টে।
মাহির কী করবে বুঝতে পারল না।
রিতুদা বলল, “তোর ভাইয়ের ডায়ালিসিস দরকার? কিডনি গেছে?”
মাহির মাথা নাড়ল শুধু।
রিতুদা মাথায় হাত বোলাল। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, “আমার একটা ভাই ছিল, জানিস। কথা বলতে পারত না। খুব ভালবাসত আমায়। আমি তেমন কিছু করতাম না তখন। বাবা তো অসুস্থ ছিল। মা লোকের বাড়িতে রান্না করত। ভাইয়ের টাইফয়েড হয়েছিল। সেটার ভাল করে চিকিৎসা করাতে পারিনি। এগারো দিনের মাথায় ভাইটা চলে গিয়েছিল। আজ আমার কী নেই বল! নেই, ভাইটা নেই আমার! তোর টাকার দরকার মাহির। আমার কাজের দরকার। যেসব ছেলে আমার আছে তাদের দিয়ে সবকিছু হবে না। প্লাস মনা পান্ডের কাছেও কেউ-কেউ যায়। তুই প্লেয়ার। প্লেয়াররা দু’মুখো হয় না বলে আমার বিশ্বাস। একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তোর আছে। তুই কাজ কর আমার কাছে। মারামারি করতে বলছি না। মাসে-মাসে টাকা পাবি। ভাইয়ের চিকিৎসা যাতে কম টাকায় হয় আমি দেখব। কী বলিস?”
মাহির তাকাল রিতুদার দিকে। ভাবল বলবে কি না। তারপর মনস্থির করে সব সংকোচ ঝেড়ে বলল, “আসলে মা রাগ করে। পার্টির কাজে রিস্ক। তাই… একটা প্লেয়ার কোটায় চাকরি পেলে সুবিধে হয়। বা যদি ফার্স্ট ডিভিশনে একটা চান্স…”
“ভাইটাকে হারাতে চাস? সোনাঝুরিতে হাউজ়িং-এর প্রসপেক্ট খুব ভাল। অত জায়গা! সঙ্গে আমাদের পার্টিরও ইন্টারেস্ট আছে। ওখানে তারক চক্রবর্তী বলে আমাদের একজন আছে। কিন্তু খুব ঘোড়েল জিনিস। আমায় বলা হয়েছে ওর ওপর নজর রাখতে। আমি যাব মাঝে মাঝে, কিন্তু আমি চাই তুই ব্যাপারটায় থাক। এটা আমার লাস্ট অফার। জোর করছি না। লজিকাল হতে বলছি। আর কিন্তু আমি ডাকব না। আবার ভরসা করছি তোর ওপর।”
“আমার ওপর?” মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না।
আগে খিদের জন্য পেটটা কেমন করছিল, এখন টেনশনে করছে। ও কী করবে? কোথায় জড়িয়ে পড়ছে? টেনশন কি খিদের মতোই কিছু!
রিতুদা বলল, “দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় এর চেয়ে বড় প্রজেক্ট নেই। অনেক টাকার ব্যাপার। ওখানে একটা বাড়ি আছে। বিশাল বড়। জুটমিল, বড় জায়গা, প্লাস ওই বাড়ি। নানা কোম্পানি যাচ্ছে। চড়চড় করে দাম বাড়ছে। তারকের পোয়াবারো। তাই আমায় ওটা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বুঝতে পারছিস? এই নে।”
মাহির দেখল রিতুদা টেবিলে ওর সামনে কয়েকটা পাঁচশো টাকার নোট রাখল।
“কী হল, নে!”
স্যার বলতেন, “সততার চেয়ে বড় কিছু হয় না মাহির। আর সততা আসে মনের শুদ্ধ ইচ্ছে থেকে। মন যাতে সায় দেয় না সেটা না করাই ভাল। আমাদের অজ্ঞাত মন, জ্ঞাত মনের চেয়ে শক্তিশালী! তাই তার ইশারা মানতে হয়। জানবি, কোনও কিছুর জন্য সততা বিসর্জন দেওয়া যায় না!”
স্যার মারা গিয়েছেন। কিন্তু আসলে স্যার এখনও বেঁচে আছেন মাহিরের মনের মধ্যে। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই মুখ বাড়ান। কিন্তু স্যার, আপনি কি দেখতে পান আমার ঘরটা? আমার মাকে? স্যার, আপনি কি জানেন আমার ভাইয়ের কী হয়েছে? কত টাকা লাগবে ভাইকে বাঁচাতে? ওই স্টার, লেটার এসব পাওয়া আমার খুব ভুল হয়ে গিয়েছে স্যার! ইংরেজিতে ওই নাম্বারটা পাওয়াও ঠিক হয়নি একদম। যারা এসব পায়নি, যারা নিজেদের বিজ্ঞাপন করতে পারে, হ্যাংলার মতো নিজেদের ঢাক পেটাতে দ্বিধা করে না, যারা পয়সা আর ক্ষমতা ছাড়া কিছু বোঝে না, তাদের মতো হতে পারলে খুব ভাল হত স্যার! আমার মাকে এই রাত অবধি আয়ার কাজ করতে হত না। আমার ভাইকে বাঁচাতে পারব কি না এই নিয়ে এত ভাবতে হত না। বন্ধুত্বের আড়ে অন্যের এঁটো খাবার খেয়ে খিদে মেটাতে হত না!
স্যার, আমাদের মতো যাদের কেউ ভালবাসেনি, যাদের মনে এত-এত সেন্টিমেন্ট, এত লজ্জা, যারা অভিমান করে আর কিছু করলই না জীবনে, তাদের ইংরেজিতে একাশি পাওয়া ঠিক নয়। তাদের আপনার মতো স্যার পাওয়াও মস্ত বড় ভুল। আপনি আমার মনের মধ্যে বসে এবার থেকে যতই চিৎকার করুন স্যার, আমি আপনার কথা আর শুনছি না। কিছুতেই আর আপনার কথায় কান দিচ্ছি না।
রিতুদার দিকে তাকাল মাহির। মোটা মানুষটা হাসছে ওর দিকে তাকিয়ে। সামনে, এসি থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়ছে নতুন পাঁচশো টাকার কয়েকটা নোট!
মাহিরের মনে পড়ল নিজের ঘরের জানলা দিয়ে দেখা সেই আকাশটাকে। ধুলোটে আকাশ। জেদি কিছু তারা মুখ বাড়িয়ে রেখেছে! জীবনও কি এমন? জেদি মানুষরাই কি তবে এই আবছা পৃথিবীর ধূলি-মলিন চাদর ছিঁড়ে মুখ দেখাতে পারে? আর ওই অনেক ওপরের সেই অলক্ষ্যে বসে থাকা মানুষ, সে কি দেখছে মাহিরকে? ফড়িঙের মতো সে-ই কি ফড়ফড় করে উড়ছে সামনে?
মাহির চোয়াল শক্ত করল। তারপর হাত বাড়াল এক জীবন থেকে অন্য একটা জীবনের দিকে।
