“কী হল আবার?”
টিটি বলল, “আরে, নকুর এক আধপাগলা দাদা আছে। বই বিক্রি করে। তাকে আজ পুলিশে ধরেছে। লেক মার্কেটে বই নিয়ে ঘুরছিল। কে একটা লোক নাকি বই কিনে কম পয়সা দিয়েছে। তাকে কলার ধরে মেরেছে পাগলাটা! কাছেই পুলিশ ছিল, মালটাকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়েছে। জানিস, লেখাপড়া করা মানুষ, কিন্তু মাথাটা মায়ের ভোগে পুরো! এইমাত্র ফোন করল নকু। রিতুদাকে বলতে হবে।”
মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না!
“যাক গে,” টিটি বলল, “চল। রিতুদা একটা কাজ দেবে তোকে। একজন এসেছে।”
ওই রোলটা খেয়ে খিদেটা যেন আরও চাগাড় দিয়ে উঠল। খিদে পেলে মাহিরের কষ্ট হয় খুব। ওর মনে হল আশপাশের গাছপালাগুলোকে ধরে ধরে খেয়ে নেয়! কিন্তু তারপরেই মনে হল, ভাই কি কিছু খেয়েছে! ওর তো খাবারের এখন খুব কড়াকড়ি। সব কিছু তো খেতে পারে না। মা রান্না করে রেখে যায়, কিন্তু তুয়াদি কি দিয়েছে খাবার?
“আর দাঁড়াস না, চল…” টিটি মাহিরকে ঠেলল।
আশপাশের অন্ধকারের মধ্যে রিতুদার অফিসটা যেন বিয়েবাড়ির প্যান্ডেল! দুটো ইনভার্টার আছে অফিসে। বেশ বড়। এসিও চলে। তবে এসিটা আছে রিতুদার ঘরে।
সত্যি বলতে কী, এইসব দেখে তাক লেগে যায় মাহিরের। ক্লাস নাইন পাশ রিতুদা। আগে ট্যাক্সি চালাত। সেখান থেকে কী করে যে আজ এই জায়গায় এল কে জানে! চারিদিকে এত মানুষের এত সাফল্য দেখে খুব অবাক হয় মাহির। কী করে লোকজন টাকা রোজগার করে ও জানে না। কোন পথে হাঁটলে বাধ্য ছেলের মতো টাকাপয়সা ঢোকে পকেটে?
অফিসের ভেতরে ঢুকল মাহির। আজও কয়েকজন বসে আছে। তবে বাইরে গুমোট বলে, আজ ভেতরে ফ্যানের তলায় বসে রয়েছে লোকজন।
মাহিরের বড়সড় চেহারাটা সবাই চেনে। সবাই জানে রিতুদা বিশেষ পছন্দ করে মাহিরকে। লোকজন একটু খাতিরের চোখে তাকাল মাহিরের দিকে। মাহির পাত্তা দিল না। এগুলোকে দেখলে গা জ্বলে! কাজের কাজ কিছু নেই শুধু বসে বসে বিনে পয়সায় চা-মুড়ি খাওয়ার ধান্দা! ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুধু নিজেদের মাতব্বর ভাবা!
মাহির রিতুদার চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করল।
“আয়,” রিতুদার গলা পেল মাহির।
দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল ও। আর সঙ্গে-সঙ্গে শরীর জুড়িয়ে গেল যেন। চেম্বারের ভেতরটা কী ঠান্ডা! নিজের অজান্তেই চোখ যেন বুজে এল মাহিরের। কিন্তু তারপর চোখ খুলেই কেমন একটা ধাক্কা লাগল! আরে বাবা, সামনে কে বসে রয়েছে! সেই মেয়েটা!
মাহিরের গলা শুকিয়ে গেল নিমেষে। মেয়েটা ওকে মাথা ঘু্রিয়ে দেখল। মেয়েটাকে দেখেছিল বেশ কিছুদিন আগে গড়িয়াহাটার কাছে। টিটির অটোয় বসে ছিল ও। আর মেয়েটা আরও কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায়! মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়েছিল। মাহিরের মনে হয়েছিল মেয়েটা চিনতে পেরেছে নিশ্চয়ই। তাই দোনোমোনো করে, সামান্য হেসেছিল মাহির। আর অবাক হয়ে দেখেছিল মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল। এত অপমান লেগেছিল ওর! মনে হচ্ছিল চলন্ত অটো থেকে লাফ মেরে মাটির তলায় ঢুকে যায়!
মনের ভেতরে বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল যেন! নিজেকে চড়াতে ইচ্ছে করছিল। পাশে বসা টিটিকে নিচু স্বরে বলেছিল কথাটা, “শালা, আমায় চিনল না!”
টিটি হলদে দাঁত বের করে বলেছিল, “কেন চিনবে? শালা, কুম্ভকর্ণের নাতির মতো বিলা জিয়োগ্রাফি! বার্নিশ করা মেয়েদের দিকে হিড়িক দিতে গিয়েছে! আবার অভিমান হচ্ছে! শোন, আমাদের মতো মালেদের কাছে অভিমান মানে অমিতাভ-জয়ার সিনেমা। বুঝেছিস?”
“তুই থাকিস কোথায়?” রিতুদার গলায় বিরক্তি টের পেল মাহির।
মাহির বলল, “খেলা ছিল রিতুদা।”
“তো, ফোনটা অফ রেখেছিলি কেন?”
এবার মাহির কিছু বলার আগেই টিটি বলল, “ওর মোবাইলটা ভোগের বাসি হয়েছে রিতুদা।”
সামনে একটি মেয়ে বসে রয়েছে। টিটির এমন ভাষায় রিতুদা বিরক্ত হল, “তুই এসেছিস কেন ভেতরে? বাইরে যা। ডেকেছি মাহিরকে, তুই এসে কী করছিস?”
টিটি থতমত খেল, “না মানে… রিতুদা ওই ইয়ে… নকুর দাদার ওই…”
রিতুদা চোয়াল শক্ত করে তাকাল টিটির দিকে, “বাইরে পানু আছে, ওকে বল। সব আমি করব? বেরো এখন ঘর থেকে।”
টিটি আর সময় নষ্ট না করে হেসে বেরিয়ে গেল। মাহির অবাক হল। ভাবল, এটাই হল স্ট্রেংথ! সবার সামনে খিস্তি খেয়েও পাবলিক ধন্য হয়ে যাচ্ছে!
রিতুদা সময় নষ্ট না করে মাহিরকে বলল, “শোন, ইনি হচ্ছেন পলি দে। নানা সমাজসেবামূলক কাজে জড়িয়ে আছেন। তার মধ্যে একটা হল, ওল্ড এজ হোম। কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছে ওঁদের হোম। কিছু ফিনানশিয়াল এড লাগবে ওঁদের। আমার তো যাওয়ার সময় নেই। তাই তুই যাবি ওঁদের ওখানে। সব দেখে আসবি।”
“আমি?” মাহির ঘাবড়ে গেল।
“পারবি না? শুনেছি তুই টুয়েলভ অবধি পড়েছিস। ইংরেজিতে ভাল ছিলি। আমার কাছে যেগুলো আছে সব টিটিএমপি!”
“মানে?” মাহির অবাক হল। দেখল, পলিও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“মানে টেনে-টুনে মাধ্যমিক পাশ। তাই তুই যাবি। বুঝলি?”
মাহির মাথা নাড়ল।
“ওর সঙ্গে কথা বলে নে কবে যাবি। গিয়ে সব দেখে এসে আমায় রিপোর্ট করবি। ভরসা করছি মাহির, ডোবাবি না!” শেষের কথাগুলো সামান্য শক্ত গলায় বলল রিতুদা।
মাহির পলির দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি বলুন কবে…”
“এখানে নয়, বাইরে গিয়ে কথা বলবি,” রিতুদা মাহিরকে এককথায় চুপ করিয়ে দিয়ে তাকাল পলির দিকে, “আপনি কাইন্ডলি একটু বাইরে গিয়ে বসবেন প্লিজ়? ওর সঙ্গে একটু কথা আছে আমার। সেরে নিয়ে ও বাইরে আপনার সঙ্গে কথা বলবে।”
