মাহির কী বলবে বুঝতে পারল না! এটা কী বলল তুয়াদি! কী করল! দিনকে দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে সব মানুষজন!
তুয়াদি বলল, “কী হল যা। দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? যা।”
মাহির আর কথা বাড়াল না। আবার বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। খিদে পেয়েছে ওর। আগে খেলার শেষে ওদের ক্লাব থেকে খাওয়াত। এখন সেটাও কয়েকটা ম্যাচ হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সুমিত বলেছিল রোল খাওয়ার কথা। কিন্তু বারণ করেছিল মাহির। এর আগেও দু’দিন রোল আর মোমো খাইয়েছে সুমিত। রোজ-রোজ একজনের কাছ থেকে খাওয়া যায় নাকি?
কিন্তু এখন পেটের ভেতর বেজি ঘুরছে মনে হচ্ছে। কেমন একটা চাপ লাগছে। কিন্তু পকেটে পড়ে আছে আঠারো টাকা। দু’টাকার মুড়ি আর একটু বাদাম খাওয়া যেতে পারে। মা এখনও মাইনে পায়নি এই মাসের।
মাহিরের মাঝে মাঝে মনে হয় বোমার মতো ও যদি ফেটে পড়তে পারত! শরীরে এত বারুদ জমে আছে! এত যন্ত্রণা ঠেসে ভরা আছে! তাই মনে হয় মাথাসমেত গোটা শরীরটা ফেটে পড়লে বেঁচে যেত ও। মনে হয় তা হলে হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেত।
আগে ভগবানে বিশ্বাস ছিল না মাহিরের। মনে হত ওসব দুর্বল মানুষের লাঠি! ভণ্ডদের ব্যাবসা করার হাতিয়ার! কিন্তু আজকাল কেবলই মনে হয় কেউ একটা তো আছে! না, সে ছেলে না মেয়ে সেটা জানে না, কিন্তু আছে তো কেউ!
যেদিন ভাইয়ের রোগটা ধরা পড়ল, সেদিন রাতে নিজের ওই খুপরিমতো ঘরের জানলার পাশে শুয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল মাহির। ছোট টালির একতলা বাড়ি পাশাপাশি গাদাগাদি করে আছে। তাই জানলা থেকে এখনও আকাশ দেখা যায়।
সেই ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল মাহির। সামান্য কিছু জেদি তারা ওই ধুলোর চাদর ভেদ করেও যে-সামান্য আলো পাঠাচ্ছিল, সেই আলোর দিকে তাকিয়ে মাহিরের মনে হয়েছিল, ভগবান নিশ্চয়ই আছে! এই ছাব্বিশ বছরের জীবনেই এমন নানা কষ্ট, যন্ত্রণা আর কঠিন সময় কখনও এমনি-এমনি হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর পেছনে কারও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা আছে। কথাটা ভেবে ওই অন্ধকারে, ওই বিপদের সময়ও হাসি পেয়েছিল মাহিরের। মনে হয়েছিল, মানুষ কিছু পেয়ে বা কোনও বিপদ থেকে বেরিয়ে এসে ভগবানের উপস্থিতিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু ওর জীবনে অসাফল্য, কষ্ট আর খারাপ হওয়ার পর ওর ঈশ্বরবিশ্বাস এল!
এখনও রাস্তায় বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল মাহির। লালচে হয়ে আছে আকাশ। তাই আগের চেয়ে অন্ধকার কিছুটা হলেও কেটেছে। ওদের অঞ্চলের লাগোয়া একটা বিহারি বস্তি আছে। এই আধো-অন্ধকারে কয়েকটা বাচ্চা রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এলোমেলোভাবে। দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ি ঘিরে ওরই বয়সি কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিরক্তি লাগল মাহিরের। সবাই জানে ওই ছেলেগুলো মদ আর গাঁজা খায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কিন্তু কারও কোনও হুঁশ নেই। প্লাস্টিকের বোতলে জলের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা মদ সকলের সামনেই খায়। হল্লা করে। কেউ কিছু বলে না ওদের। আসলে কে কী বলবে, এই ছেলেগুলোর মাথার ওপর রিতুদার হাত আছে!
ওর বাড়ি থেকে রিতুদার অফিস খুব কিছু দূর নয়। মাহির ধীরেসুস্থে হাঁটতে লাগল। খিদেটা চাগাড় দিচ্ছে ভালই। শরীরটাও বুজে আসছে ক্লান্তিতে! এখন কার ভাল লাগে এইসব লোকের সামনে যেতে! মা-ও জানলে রাগ করবে। মা কিছুতেই ওকে রিতুদার কাছে যেতে দেয় না। বলে, “একবেলা না খেয়ে থাকব, কিন্তু তুই যাবি না!” কিন্তু একবেলা না খেয়ে থাকা এক জিনিস, আর ভাইয়ের চিকিৎসা আর-এক জিনিস। টাকা খুব দরকার এখন ওদের।
মাহির আকাশের দিকে তাকাল। সেই জন কি সত্যি বসে, দাঁড়িয়ে বা শুয়ে আছে আকাশের ওপারে? ওকে কি দেখতে পাচ্ছে? কেন শুধু ওকে বাঁশ দিয়ে আনন্দ পায় মানুষটি? ওর জীবনে ভাল কিছু কি হতে পারে না? এমন কিছু কি ঘটতে পারে না, যার ফলে ওর মনে হবে সামান্য হলেও ওরও বেঁচে থাকার একটা মানে আছে? একটা কারণ আছে?
অফিসের বাইরে একটু দূরে টিটি দাঁড়িয়েছিল। আবছায়া হলেও মাহিরের চিনতে ভুল হল না। ওরকম ঝাঁকড়া চুল আর পাঁকাটির মতো শরীর কলকাতায় আর কারও আছে কি না সন্দেহ!
টিটিও দেখেছে ওকে, “ওই মাহির!” হাত তুলে ওর কাছে প্রায় দৌড়ে এল ছেলেটা। তারপর ওর হাত ধরে বলল, “শালা, তুই কী করছিস? তোকে ফোন করলে পাওয়া যায় না কেন?”
“জানিস না, খেলা ছিল আজ আমার?”
মাহির দেখল টিটির হাতে একটা রোল। সবে দু’-এক কামড় খেয়েছে।
টিটি বলল, “তোর ওই বেকার খেলা! আর খেলছিস তুই, তো ফোনটা অফ করে রেখেছিস কেন?”
মাহির সময় নিল একটু তারপর টিটির হাত থেকে রোলটা নিয়ে নিল আচমকা। কামড় মেরে বলল, “ফোনটা ভোগের বাসি হয়েছে! পরানদাকে দেখাব একবার।”
টিটি প্যান্টে হাত মুছে বলল, “শালা, হবে না? সিপাহি বিদ্রোহের সময়কার ফোন! একটা নতুন মোবাইল কিনে ফেল আমার মতো।”
“বোকার মতো কথা বলিস না!” মুখভরতি খাবার নিয়ে কোনওমতে বলল মাহির।
টিটি হাসল, “তোর খিদে পেয়েছে?”
মাহির রোলটা শেষ করে বলল, “আচ্ছা, মানুষ অন্য জিনিস এতগুলো করে খায়, কিন্তু কোল্ড ড্রিঙ্ক এক বোতল আর রোল একটা খায় কেন?”
“সে আমি কী জানি!” টিটি বলল, “তোকে ফোন করতে-করতে দিমাগ ঘেঁটে গিয়েছে আমার! ওদিকে নকুর শালা এক লোচা হয়েছে।”
নকু! মাহিরের সামান্য সময় লাগল ব্যাপারটা মনে করতে। ও, সেই ছেলেটা। বাইকে করে ওকে একদিন নিয়ে এসেছিল। সামনের চুলটা ব্রোঞ্জ রঙে রাঙানো!
