“অনেক টাকা… এটা রাখ, চালিয়েছিস কোনওদিন?” রিতুদা এমন করে জিজ্ঞেস করছিল যেন স্কুলপাঠ্যে এসব শেখানো হয়।
“না, না,” মাহির আঁতকে উঠেছিল, “এসব… প্লিজ় না…”
“যাঃ শালা! সতীপনা করছিস কেন? প্যান্টে মুতে দিলি নাকি যন্ত্র দেখে?”
“এর দরকার নেই রিতুদা, আমি এমনি নিয়ে আসব,” মাহির নিজেকে শান্ত করে কেটে-কেটে বলেছিল কথাগুলো।
রিতুদা তাকিয়েছিল মাহিরের দিকে। তারপর বলেছিল, “ডাইনোসর থেকে ম্যামথ থেকে সেবর টুথড টাইগার, সবাই এত শক্তিশালী হয়েও কেন বল তো পৃথিবী থেকে হাপিশ হয়ে গেল? কারণ, কেউ ওরা সময়ের সঙ্গে নিজেদের পালটাতে পারেনি। কেউ পারেনি। মানুষ এই একমাত্র একটা কারণে নিজেকে এত ভয়ংকর জন্তু আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচিয়ে সারা পৃথিবীকে কবজা করেছে। নিজেকে পালটাতে শেখ মাহির। না হলে জাস্ট হাওয়া হয়ে যাবি। বুঝলি!”
কাজটাতে গিয়েছিল মাহির। কোনও অসুবিধে হয়নি। ক্যাশ গুনে হিসেব মিলিয়ে টাকা নিয়ে ফেরার গাড়ি ধরেছিল।
টিটি ওর নতুন কেনা ফোন থেকে বুক করেছিল একটা গাড়ি। শেয়ারের গাড়ি। তারপর সারাটা পথ পুটুরপুটুর করে রিতুদার গুণকীর্তন করতে-করতে এসেছে! ওঃ, এত বিরক্ত লাগছিল মাহিরের!
মাঝপথে একজন খুব সুন্দরী স্টাইলিশ দেখতে ভদ্রমহিলা উঠেছিল গাড়িতে। মাহির সংকুচিত হয়ে বসেছিল। মেয়েদের দেখলেই কেমন যেন নার্ভাস হয়ে যায় ও। আসলে রেশমি চলে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েদের ব্যাপারে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে মাহির!
টিটিকে চাপা গলায় সাবধান করেছিল, টিটি যাতে গালাগালি না দেয়! কিন্তু টিটি কি আর ওর কথা শোনার ছেলে! এমন সব কথা বলছিল যে, কান লাল হয়ে গিয়েছিল মাহিরের। তবে কাজ সেরে ফেরার পর রিতুদা আরও পাঁচশো হাতে দিয়েছিল ওর। এবার আর আপত্তি করেনি মাহির। বুঝতে পারছিল, আপত্তি করে লাভ নেই।
দরজায় টোকা দেওয়ার একটু পরে তুয়াদি এসে খুলে দিল দরজাটা। লোডশেডিং-এর জন্য ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। ভাই পাশের খাটে চুপ করে শুয়ে আছে। দেওয়ালের দিকে মুখ। ঘুমোচ্ছে বোধহয়। পাশে রাখা হাতপাখা দেখে মাহির বুঝল তুয়াদি ভাইকে হাওয়া করছিল।
ওদের দুটো ঘর। এই ঘরটা বড়। পাশের ছোট ঘরে মাহির থাকে। সেখানে একটা চৌকি আছে। আর একটা আলনা। চৌকিটা একটু উঁচু। তার তলায় লোহার ট্রাঙ্কে মাহিরের জিনিসপত্র থাকে। বারবার ট্রাঙ্ক খুলে জিনিস বের করতে হয়। খুব অসুবিধে হয় মাহিরের। কিন্তু উপায় নেই।
বড় ঘরে ঢুকে একপাশে চটিটা খুলে রাখল। তারপর কিটব্যাগটা টিনের ভাঁজ করা চেয়ারের মাথায় ব্যালেন্স করে বসিয়ে তুয়াদিকে জিজ্ঞেস করল, “কারেন্ট কখন গেল তুয়াদি?”
তুয়াদি সেটার উত্তর না দিয়ে বলল, “তোর মোবাইল খারাপ?”
“কেন?” অবাক হল মাহির।
“আরে, ওই টিটিটা এসেছিল। তোকে নাকি মোবাইলে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না!” তুয়াদির গলায় হালকা বিরক্তি।
আসলে তুয়াদি টিটিকে পছন্দ করে না। কারণ, টিটি একবার মদ খেয়ে এসে তুয়াদিকে প্রপোজ় করে বসেছিল!
তুয়াদি এত রেগে গিয়েছিল যে, পায়ের চটি খুলে ছুড়ে মেরেছিল টিটিকে।
টিটির তাতে অবশ্য হেলদোল খুব কিছু হয়নি! টিটির নেশা কেটে যাওয়ার পরে মাহির খুব বকেছিল টিটিকে। বলেছিল, “এটা কী করেছিস তুই? এমন অসভ্যতা কেউ করে? কত বড় বল তো তোর চেয়ে?”
টিটি হেসে বলেছিল, “আরে, খচে যাচ্ছিস কেন? বড় তো কী হয়েছে! আজকাল ম্যাক্সিমাম ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বড়ই হয়! এতে তো অসুবিধে নেই। প্লাস ভাবলাম, বিয়ে-টিয়ে করেনি। বয়স বয়ে যাচ্ছে। ওসবের ইচ্ছে-ফিচ্ছে তো সবারই হয়। ওরও নিশ্চয় হয়। তাই আমি… মানে এটা সোশ্যাল ওয়ার্ক বলতে পারিস! আমার থোবড়টা আমির খানের মতো না হলেও ফিলিংস-এ আমি কিন্তু দিলীপ কুমার! তাই ওর কষ্টের কথা ভেবে…”
মাহির জানে টিটির সঙ্গে কথা বলা বৃথা!
“কী রে, কী বলছি?” তুয়াদি এসে ধাক্কা দিল।
“না গো, আসলে,” মাহির ঢোঁক গিলল, “আমার মোবাইলটা গেছে। এতদিন গার্টার বেঁধে কাজ চালাচ্ছিলাম। কিন্তু আজ আর কিছুতেই কাজ করছে না!”
“অপদার্থ একটা!” তুয়াদি দাঁতে দাঁত ঘষল।
মাহির মনে মনে বলল, নাও, শুরু হল আজকে! তুয়াদির ক্রিটিকাল অ্যাপ্রিশিয়েশান চালু!
তুয়াদি বলল, “এমন গাবুরের মতো চেহারা, কিন্তু একটা অপদার্থ! এখন তোর রেশমি কোথায়? যার জন্য সব ছেড়ে ক্যালানে হলি সে কোথায়! আমাদের বস্তিতে কেউ তোর মতো লেখাপড়ায় ছিল? ছিল না… শালা, একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে… আমি তোকে নিয়ে যে কী করব!”
“তুয়াদি, ভাই ঘুমোচ্ছে!” মাহির আর কীভাবে তুয়াদিকে চুপ করাবে ভেবে পেল না।
তুয়াদি অনেক কষ্টে নিজেকে আটকাল। আঁচল দিয়ে মুখের ঘামটা মুছে আচমকা এগিয়ে এসে প্যান্টের চেনের কাছটা খপ করে চেপে ধরে বলল, “তোর চেহারাটা এমন, কিন্তু ভেতরটা এমন ম্যাদামারা কেন? তোর সব যন্ত্রপাতি ঠিক আছে তো?”
এসব কী বলছে তুয়াদি! মাহির চমকে উঠে পিছিয়ে এল। দেখল, তুয়াদি কেমন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে ওর দিকে!
তুয়াদি চোয়াল শক্ত করে বলল, “একদিন দেখব তোর সব ঠিক আছে কি না। কতদিন পালিয়ে থাকবি! এখন আর না বসে ওই রিতুদার অফিসে যা একবার। ডেকেছে। টিটি সেই কথাটাই বলতে এসেছিল।”
