ওর মাঝে মাঝে রাগ হয়। কেন ও এমন হতে পারে না? এমন হতে পারলে কী যে ভাল হত! স্যার বলতেন, “অগভীর মানুষ অমানুষের মতো!”
এটা সত্যি না মিথ্যে জানে না মাহির, শুধু এটুকু মনে হয়, সেটা হতে পারলে ও হয়তো বেঁচে যেত। নিজের গভীরতায় মানুষ অধিকাংশ সময় নিজেই ডুবে মরে!
পতাদা আরও কিছু বলেছিল। কিন্তু সেসব আর ভাল করে শোনেনি! কী হবে শুনে? পেট ভরবে?
আজ সুমিত ওকে বাইকের পেছনে বসিয়ে লিফট দিয়েছিল। ময়দান থেকে বেরিয়ে হরিশ মুখার্জি দিয়ে ফিরছিল ওরা।
নিজের কথা অন্যকে বলতে খারাপ লাগে মাহিরের। কিন্তু একটা-একটা করে দিন চলে যাচ্ছে, এদিকে কিছুই হচ্ছে না! প্রতিটা দিন যেন ইটের মতো ওকে গেঁথে ফেলছে দেওয়ালের সঙ্গে!
বাইকের পেছনে বসে ও সুমিতকে বলেছিল, “আমার কোনও কাজকর্ম হতে পারে রে?”
মাথা না ঘুরিয়েই সুমিত বলেছিল, “কী কাজ করতে চাস?”
“যা বলবি,” মাহির বলেছিল, “আমার যা হোক একটা কাজ পেলেই হবে। তোর দাদার ফ্যাক্টরিতে কিছু একটা করে দে ভাই। ঝাঁট-টাট দিতে হলেও আমার আপত্তি নেই!”
“কী সব বলছিস তুই?” সুমিত অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি বিরক্ত হয়েছিল যেন!
“বাড়িতে খুব ঝামেলা রে। মানে টাকাপয়সার এমন অবস্থা! ভাইটা… ভাইটার কিডনির অসুখ ধরা পড়েছে। খালি ঘুরে-ঘুরে জ্বর আসছিল। ডাক্তার পরীক্ষা করতে দিয়েছিল নানারকম। সেখানেই ধরা পড়েছে। কিডনি কাজ করছে না। ডায়ালিসিস করাতে হবে। তারপর সম্ভব হলে কিডনি বদলাতে হবে।”
“সে কী রে!” সুমিতের গলা শুনে মাহির বুঝতে পেরেছিল যে ও সত্যি চমকে গিয়েছে!
সুমিত বলেছিল, “এসব কবে হল? বলিসনি তো!”
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “সারাক্ষণ আর কত খারাপ কথা বলি বল তো!”
সুমিত বলেছিল, “আমি দাদাকে বলছি। আমার এত খারাপ লাগছে শুনে! অন্য কোনও কাজ পাচ্ছিস না?”
সামনে বাঁকটা ঘুরলেই বাঁ হাতে মাহিরের বাড়ি। আজকাল বাড়িতে ফিরতে কষ্ট হয় ওর। ভাইটাও এমনিতেই স্বাভাবিক নয়। তারপর এমন অসুস্থ! পা ফুলে যাচ্ছে! চোখ-মুখ ফুলে যাচ্ছে! চোখে দেখা যায় না!
মায়ের আয়ার কাজ থাকে। সংসারের মূল রোজগার সেটাই। তাই মাকে তো বেরোতেই হয়। পাশের বাড়ির তুয়াদি ভাইয়ের কাছে থাকে।
তুয়াদি সেলাইয়ের কাজ করে। বিয়ে করেনি। প্রায় পঁয়ত্রিশ হল। আর বিয়ে করবে বলে মনেও হয় না। তুয়াদির একটা পা আর-একটা পায়ের চেয়ে সামান্য ছোট। দেখতে সুন্দর হলেও ওই কারণে তুয়াদির বিয়ে হয়নি।
তুয়াদি মুখরা খুব। কিন্তু ভাইকে ভালবাসে। তাই ভাইয়ের শরীর খারাপের কথা শুনে নিজেই বলেছিল যে, মা যতক্ষণ থাকবে না, ও ভাইয়ের কাছে থাকবে!
তুয়াদির ব্যপারাটা ঠিক বোঝে না মাহির। একদিকে মাহিরকে বকাঝকা করে। এই যে ফুটবল খেলে! এই যে এখনও ভাল করে কাজকর্ম পায়নি, এটা নিয়ে তুয়াদি খুব কথা শোনায়। আবার অন্যদিকে কেমন করে যেন তাকায়। গায়ে হাত দেয়। বুকে হাত বোলায়! আচমকা নিজের ভরাট বুকটা চেপে ধরে মাহিরের শরীরের সঙ্গে!
মাহিরের রাগ হয়। কিন্তু কিছু বলে না! এসব নিয়ে বলা যায় না কিছু। আর সত্যি বলতে কী, আজকাল কাউকেই কিছু বলতেও আর ইচ্ছে করে না ওর। কারও সঙ্গে দরকারের চেয়ে একটা বেশি শব্দও খরচ করতে ইচ্ছে করে না। যে যা বলে মেনে নেয়।
এখনও তুয়াদি ভাইয়ের কাছে আছে। আজ মায়ের দুটো দশটার কাজ। আসতে দেরি হবে। তুয়াদি আবার ওকে একা পেয়ে গালাগাল দেবে সেভাবে কাজের চেষ্টা করছে না বলে। নাকি অন্য কিছু করবে, জানে না!
মাহিরের আবার সুমিতের কথাটা মনে পড়ল। কাজ কি একদম পাচ্ছে না? পাচ্ছে, কিন্তু সেটা কেমন কাজ মাহির ভাল করে জানে!
রিতুদা ওকে আজকাল প্রায়ই ডেকে পাঠায়। সব সময় না গেলেও মাঝে মাঝে তো যেতেই হয়। তখন খুচখাচ কাজ করে দিতে বলে ওকে।
এই তো কিছুদিন আগে টিটির সঙ্গে ওকে রাজারহাটের ওদিকে যেতে হয়েছিল। একটা পেমেন্ট আনার ব্যাপার ছিল।
রিতুদা নিজেই ডেকে বলেছিল টিটির সঙ্গে যেতে।
মাহিরের ভাল লাগছিল না। কিন্তু ও বোঝে, রিতুদার মতো মানুষেরা ‘না’ শব্দটা শুনতে পছন্দ করে না।
তাও মাহির অনিচ্ছার গলায় বলেছিল, “দাদা, আমার তো আজ বিকেলে প্র্যাকটিস আছে… তাই…”
“তাতে কী?” রিতুদা হেসেছিল খুব। পান-খাওয়া দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছিল। কাঁধ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে মুখ মুছে বলেছিল, “ওই তো বালের খেলা তোদের! তার আবার প্র্যাকটিস! এতদিন খেলে কী করলি মাহির? আমাদের দেশে ইনডিভিজুয়াল স্পোর্টস ছাড়া কেউ কোনও কিছুতে সাকসেস পাবে না। ক্রিকেট টিম গেম হলেও দ্যাখ, ইন্ডিভিজুয়াল কিন্তু আসলে। এত চুকলিবাজি! এত পলিটিক্স! সেখানে ফুটবল! নিম্নমধ্যবিত্তদের খেলা! ছাড়, আজ যাবি টিটির সঙ্গে। আমার বাকি ছেলেপুলেরা আজ নেই। তুই যাবি, টাকাটা নিবি, তারপর মোবাইলে গাড়ি বুক করে চলে আসবি। ক্লিন কাজ। লাফড়া নেই। বুঝলি?”
টিটি বসেছিল ঘরের এক কোণে। ও বলেছিল, “হ্যাঁ রিতুদা, কোনও চাপ নেই। ও যাবে। আমরা ঠিক নিয়ে আসব!”
মাহির অনিচ্ছার সঙ্গে রাজি হয়েছিল।
রিতুদা একটা পাঁচশো টাকার নোট ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, “ধর এটা। আর-একটা জিনিস।”
কথাটা শেষ না করে রিতুদা পাশের ড্রয়ার টেনে তাতে হাত ঢুকিয়েছিল। তারপর হাতটা বের করে এনে টেবিলে রেখেছিল একটা খাপ। তার থেকে পিস্তলের বাঁটটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল মাহির! ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে গিয়েছিল! এসব কী!
