রাধিয়ার মনে হচ্ছে ও যেন এক অদৃশ্য জালে পেঁচিয়ে গিয়েছে। এই বাড়ি, এই বাবা-মা, এই সম্পর্ক। সব কিছুই যেন হাওয়ার তৈরি মনে হচ্ছে ওর।
“রাধিদি,” বুজু আবার ডাকল।
“ক-কী?” রাধিয়া কোনওরকমে পেছনে ঘুরল।
বুজু বলল, “দু’জন এসেছেন ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে। এই এলেন। ঠাকুমা তো পুজোয় বসেছে, আমি গেলে বকবে এখন। তুমি যদি একবার বলে…”
রাধিয়া সিঁড়ির ওপর থেকে বসার ঘরে দূরে বসে থাকা দু’জনের দিকে তাকাল। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর।
বুজু বলল, “একজন বললেন তোমায় চেনেন। ওই দূরে বসে আছেন। নাম বললেন…”
“আমি পারব না,” রাধিয়া কথাটা ছুড়ে দিয়ে কোনওরকমে দোতলায় নিজের ঘরের কাছে গেল। পেছন থেকে বুজু কিছু বলছিল, কিন্তু সেসব কথা কেমন যেন হাওয়ায় ভেসে গেল এদিক-ওদিক।
ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে কাঠের পাল্লায় মাথা দিয়ে দাঁড়াল রাধিয়া। এবার কী করবে ও? মায়ের সামনে যাবে কেমন করে? কার কাছে গিয়ে বলবে এসব কথা! এমন অবস্থায় কি অন্য কিছু মাথায় ঢোকে! বুজুদি কি ওকে দেখে বুঝতে পারেনি ওর মনের মধ্যে কী চলছে! সেখানে কারা এসেছে সেই নিয়ে… আচমকা থমকে গেল রাধিয়া। বুজু কী বলল? দু’জন এসেছে নীচে আর তার মধ্যে একজন ওকে চেনে? আর নামটা? নামটা যেন কী বলল? রাধিয়া দুদ্দাড় করে চলে এলেও বুজুর কথার একটা খণ্ড কী করে যেন কানে ঢুকে পড়েছে ওর।
হতভম্বের মতো ঘরের অন্যদিকে রাখা বিশাল বড় আয়নায় নিজেকে দেখল রাধিয়া! এমন একটা দিনে কে এল ওদের বাড়িতে! বুজু যে নামটা বলল, সেই কি এসেছে? নিশান কি এসেছে আজ ওদের বাড়ি?
.
১৩. মাহির
কোথাও একটা ট্রান্সফরমার বার্স্ট করেছে! সারা পাড়া ডুবে আছে রোঁয়াওঠা ফুটো কম্বলের মতো অন্ধকারের তলায়।
বোচনদার দোকানে একটা ব্যাটারির লাইট জ্বলছে। সামনের ধোপা বাড়িতেও হারিকেনের আলো দেখা যাচ্ছে! পরানদার দোকানে জ্বলছে ইমার্জেন্সি ছোট টিউব। এ ছাড়া আশপাশের বাড়ি থেকে ছিটকে আসা মোমবাতির আলোর কুচি ভেসে আছে দূরে।
আকাশে মেঘ করে আছে বেশ। জুনের আট তারিখ আজ। বর্ষা আসার কথা। কিন্তু আকাশে মেঘটুকুই করে আছে শুধু, বৃষ্টির দেখা নেই।
ক’দিন খুব ভ্যাপসা গরম পড়েছে। ওদের নিচু সিলিং-এর টালির বাড়িটা পুরো ফার্নেস হয়ে আছে যেন। ভাইয়ের এত কষ্ট হচ্ছে!
ওদের পাড়ায় বেশির ভাগই টালির বাড়ি। কিন্তু আজকাল দেখছে অনেকেই এসি লাগিয়ে নিচ্ছে। কোথা থেকে টাকা পায় এরা? এসি লাগায় কী করে? ওর তো নিজের হাতখরচ তুলতে কালঘাম ছুটে যায়!
কিটব্যাগটা এক কাঁধ থেকে অন্য কাঁধে নিল। আজ ম্যাচ ছিল। ড্র হয়েছে। সেকেন্ড ডিভিশনে এখন ওরা চতুর্থ হয়ে আছে। আজ ভালই খেলেছে মাহির। শুধু ম্যাচ শেষের একটু আগে ওদের ন’নম্বরটা এমন করে পা চালাল! শিন বোনের কাছে বেশ লেগেছে। কালশিটে পড়ে গিয়েছে।
মাহির শেষমুহূর্তে পা-টা সরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু তাতে খুব লাভ হয়নি কিছু।
ম্যাচের পরে মাঠের ধারে বসে কালশিটে পড়া জায়গাটা দেখছিল মাহির। বুট খুলে রেখেছিল পাশে। সুমিত টাকা না ধার দিলে এটা কিনতেই পারত না। দেখেছিল, পতাদা এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
মাহিরের মাথাটাই গরম হয়ে গিয়েছিল। এই এসে গিয়েছে ঢপবাজ! সারাক্ষণ বাতেলা! স্পনসর! রিক্রুট! শালা যেন নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি! আর এমন মাথার ওপর এসে দাঁড়ানোর কী হয়েছে? বুকে উঠে পড়বে নাকি?
পতাদা বলেছিল, “কী করিস? পা-টা সরাতে পারলি না? চোট খেয়ে গেলি? পরের ম্যাচে নামতে পারবি তো?”
“পরের ম্যাচ তো সামনের সপ্তাহে,” বিরক্তিটাকে লুকিয়ে কোনওমতে বলেছিল মাহির।
পতাদা মাথা নেড়ে বলেছিল, “তোদের ফিটনেস এত কম! আমাদের সময়ে আমরা যা ফিট ছিলাম না! দুটো-তিনটে ভল্ট মারা কোনও ব্যাপারই ছিল না! একবার সেই মজিদ বাসকারের পা থেকে এমন করে বল কেড়ে নিয়েছিলাম যে, মজিদ পরে বলেছিল আমায়, এমন স্ট্যান্ডার্ডের প্লেয়ার ও খুব বেশি দেখেনি!”
মাহির কী বলবে বুঝতে না পেরে পতাদার পেছনে বসা সুমিতকে দেখছিল। সুমিত মাটিতে শুয়ে পেটে হাত চেপে হাসছিল! পতাদা যে মারাদোনার নাম করেনি, এটা ওদের চোদ্দো পুরুষের ভাগ্য!
মাহিরের হাসি পাচ্ছিল না। পায়ের ব্যথা, বাড়িতে টেনশন, এসবের মাঝে এইসব আলুছালু কথা ভাল লাগছিল না ওর!
ও বলেছিল, “তোমার ক্লাবের স্পনসরের কী হল? সেই সিমেন্ট কোম্পানি আসবে না? আমরা তো জান-প্রাণ দিয়ে খেলছি। সেই বারো নম্বর থেকে চারে উঠে এলাম। প্লাস যারা ট্রায়াল দেখতে এসেছিল, তারা কই? এভাবে আর কতদিন যাবে পতাদা?”
পতাদা ভুঁড়িটাকে জামা দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে বলেছিল, “আরে, আসবে, হবে। এখনই অস্থির হলে চলবে? ফুটবল হল তপস্যা। সেখানে ফলের আশা করতে নেই। ধর্মকথায় পড়িসনি?”
মাহির মাথা নেড়ে উঠে পড়েছিল। একে বলে লাভ নেই। শালা, গোটা জীবনটা বেকার হয়ে গেল! এই ছাব্বিশেই মনে হয় ছেচল্লিশ হয়ে গিয়েছে ওর! সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হয় আজ কেন ঘুম ভাঙল? মনে হয়, আজকের দিনটা ও বাঁচবে কেন?
ওদের পাড়ায় ওর বয়সি ছেলেদের দেখে মাহির! সারাক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে। নানারকম স্টাইলে মাথার চুল কাটা। হাতে-পায়ে ট্যাটু। চোখে সন্ধেবেলাতেও সানগ্লাস! সারাক্ষণ হ্যা-হ্যা করে চলেছে।
