এসির মধ্যে বসেও নিমেষে ঘেমে গেল রাধিয়া! মুখ-চোখ ভয় আর কষ্টে লাল হয়ে গেল! বাবা মিথ্যে বলে এমন করে বাড়ির বাইরে আছে কেন? ওই মহিলাই-বা কে? বাবাকে সারাক্ষণ গম্ভীর দেখে! কিন্তু ওই গাড়িতে বসে বাবা তো রীতিমতো হাসছে! আশপাশে কিছু খেয়ালই করছে না। দু’জন মানুষকে দেখলে বোঝা যায় তাদের সম্পর্কের ধাঁচটা কী। এখানে বাবাকে ‘মোর ইগার’ লাগছে! মহিলাটি তো শান্ত মুখে বসে আছে। চোয়াল শক্ত করে রইল রাধিয়া। মনে মনে ঠাকুরকে ডাকতে থাকল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়াস ধড়াস করছে! এসব কতদিন ধরে চলছে? বাবা যে কাজে নেই সেটা তো স্পষ্টই। কাজে থাকলে আউট স্টেশন যাওয়ার নাম করে কলকাতায় থাকত না। এসব তো মা, ঠাকুমা জানে না। জানলে কী হবে! বাবা কি ওদের ছেড়ে চলে যাবে! আর মা? মা কী করবে?
“কী হয়েছে রে রাধি?” পলি পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল।
রাধিয়া উত্তর দেওয়ার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল। ও ঘাড় না ঘুরিয়েও চোখের আড় দিয়ে দেখার চেষ্টা করল গাড়িটা কোথায়। নাঃ, গাড়িটা পিছিয়ে আছে। সামনের বড় দুটো বাস গড়িমসি করছে স্টার্ট নিতে। ও মনে মনে বলল, গাড়িটা আরও পিছিয়ে যাক।
ও মধুদাকে বলল, “জোরে চালাও মধুদা। আমায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে।”
“হোয়াটস রং?” পলি এবার রাধিয়ার হাত ধরে জিজ্ঞেস করল।
সামান্য হেসে মাথা নাড়াল রাধিয়া। ওর এত কষ্ট হচ্ছে যে, মনে হচ্ছে বুকের পাঁজরগুলো ইমপ্লোড করবে এখনই! মনে হচ্ছে কেউ ওকে জলে ডুবিয়ে দিয়েছে! এটা কী দেখল ও? এত বছর তা হলে যে বাবা ওদের সঙ্গে আছে, সেটা অভিনয়? নাকি… নাকি অন্য কোনও গল্প আছে? মানে ও যা ভাবছে, সেটা ঠিক নয়। মানে… কী মানে? রাধিয়ার হাত-পা ঘেমে উঠেছে। এটা বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেলে সাংঘাতিক ব্যাপার হবে। তাই কাউকেই বলা যাবে না। কিন্তু ওকে তো জানতে হবে ব্যাপারটা কী! না জানলে ও নিজে শান্তি পাবে না। বাবাকে যে মুখোমুখি জিজ্ঞেস করবে, সেটাও ওর দ্বারা হবে না। বাবা এমন রাগী আর এমন করে নিজের রাগটা প্রকাশ করে যে, সেটার সামনে দাঁড়ানো ওর পক্ষে কঠিন।
এমন সুন্দর একটা বিকেল এক নিমেষে কী করে নষ্ট হয়ে গেল! সত্যি কোনও দিক দিয়েই জীবনে নিশ্চয়তা নেই। গাড়িটা যখন গিয়ে সিগনালে দাঁড়াল, তখনও কি ও বুঝতে পেরেছিল সামনে, এক মুহূর্ত পরে কী আসতে চলেছে ওর জীবনে?
পলি আরও কিছু জিজ্ঞেস করেছিল। বুদাও সামনের সিট থেকে পেছন ফিরে কিছু বলছিল। কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকছে না রাধিয়ার। সারা শরীরে যেন লক্ষ লক্ষ ঝিঁঝি পোকা ডাকছে ওর! ব্যাপারটা কী! ওকে জানতেই হবে। কিন্তু কীভাবে জানবে?
কালীঘাট ট্রাম ডিপোর কাছে গাড়ি থেকে বুদা আর পলি নেমে গেল। অন্য সময় হলে পলি হয়তো জোর করেই রাধিয়াকে টেনে নামাত। কিন্তু আচমকা রাধিয়ার পরিবর্তন দেখে আজ আর কিছু বলল না। শুধু বুদা একবার বলল, “আমি তোকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আসব?”
“আয়াম ওকে,” রাধিয়া ছোট্ট করে বলে গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিল।
রাধিয়া খুবই শান্ত ধরনের। কখনও কারও সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করে না। কিন্তু আজ কিছুতেই রাধিয়া নিজেকে সামলাতে পারছে না। কেবলই মনে হচ্ছে এটা কী দেখল ও!
কালীঘাট ট্রাম ডিপো থেকে আলিপুর খুব কিছু দূর নয়। কিন্তু যেহেতু অফিস ছুটি হয়েছে এখন, লোকজন গিজগিজ করছে কলকাতায়, তাই গাড়িটা গোঁত্তা খেতে-খেতে চলছে। কিন্তু রাধিয়ার কিছুই যেন মনে আসছে না।
আকাশে আলো কমে এসেছে বেশ। বাড়ি ফেরার তাড়ার মাঝে শহরের চোখে-মুখে কেমন যেন একটা মনমরা ভাব। ভিড়ে নুইয়ে যাওয়া বাস, বদমেজাজি অটোর যেখানে-সেখানে নাক গলানো আর মোটরবাইকের ছোঁকছোঁক। অন্যদিন এসব দেখে রাধিয়া, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ওর সামনের শহরটাকে কে যেন একটা ধূসর জলরং করে দিয়েছে!
জাজেস কোর্টের সামনে দিয়ে গাড়িটা ডান দিকে বাঁক নিল। হর্টিকালচার ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে ওদের বাড়ি।
মধুদা গাড়িটাকে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে হর্ন দিল। আর তার শব্দে কেঁপে উঠল রাধিয়া। বাড়ি চলে এসেছে। আরে গালে কী? হাত দিয়ে দেখল রাধিয়া। জল। ও কাঁদছে। কিন্তু মাথা তো পুরো খালি হয়ে ছিল। তা হলে চোখে জল এল কেন? চিরদিন মনে মনে বাবাকে একটু বেশি ভালবেসেছে বলেই কি আজ এমন একটা শূন্যতা এসে ঢুকে পড়েছে ওর মধ্যে!
গেটটা খুলে দেওয়ায় গাড়িটা ঢুকে গেল ভেতরে।
পাথর বিছানো রাস্তায় ধীরে-ধীরে গাড়িটা থামল পোর্টিকোর তলায়। মধুদা নেমে দরজা খুলে দেওয়ার আগেই ও নিজে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। অন্যদিন বাড়িতে ঢোকার আগে মধুদাকে ‘আসছি’ বলে। কিন্তু আজ সেটাও বেরিয়ে গিয়েছে মাথা থেকে।
চারটে শ্বেতপাথরের ধাপ পেরিয়ে বড় হলঘরটায় ঢুকল রাধিয়া। ওর মন খুব অস্থির হয়ে আছে। সোজা স্নান করবে ও। অন্য কোনওদিকে তাকাবে না।
বড় হলঘরের একপাশ থেকে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলার দিকে। রাধিয়া প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল।
“রাধিদি,” পেছন থেকে বুজু ডাকল ওকে।
রাধিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। মাথা রীতিমতো টলছে ওর। সব কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। গাড়ির ভেতর বসে থাকা খুব ছোট করে কাটা চুলের মহিলার মুখটা বারবার মনে পড়ছে ওর। কেন মনে পড়ছে? কেন আমরা যা ভুলতে চাই তাই বারবার মনে পড়ে? কেন খারাপ লাগাগুলো বস্তায় ভরে পার করে দেওয়া বিড়ালের মতো আবার ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে আমাদের কাছে? কেন বারবার খারাপ দৃশ্য বিরক্তিকর বিজ্ঞাপনের মতো মনের মধ্যে ভেসে ওঠে? আমাদের মন, কিন্তু আমাদেরই পোষ মানতে চায় না। কেন? কষ্টের মধ্যে জীবনের কোন মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে? কী শেখাতে চায় সে আমাদের?
