এসব অবস্থায় পলি সোজাসাপটা কথা বলতে পারে ভাল।
পলি বুঝল ইঙ্গিতটা। ও বলল, “ঠিক আছে স্মরণ, আমরা তা হলে আসি। আসলে উই আর ইন আ হারি।”
“তাই?” স্মরণ হাসল। যেন পলি খুব হাসির কথা বলেছে, “আমার কোনও তাড়া নেই। বসের পারসোনাল কাজে এসেছি। তোমরা মুড়ি খাবে? কলেজ স্কোয়ারে মাখে একজন। ওই দিকটায় বসে। খাবে?”
“আঃ,” নোঈ বলল, “ওদের তাড়া আছে স্মরণ!”
“ও আচ্ছা,” স্মরণ মাথা নাড়ল, “কিন্তু মুড়ি খেতে আর কতক্ষণ টাইম লাগবে?”
বুদা জিজ্ঞেস করল, “তোমার প্যাঁও কেমন আছে?”
“প্যাঁও দারুণ আছে,” স্মরণ আবার নতুন উদ্যমে শুরু করল, “আজ সন্ধেবেলাতেই দেখা হবে আমাদের। ও আসলে গান শেখে তো! ওই বেহালা চৌরাস্তার কাছে গান শিখতে আসে। আমি না গেলে খুব রাগ করে। মানে, ওখান থেকে ওকে পিক আপ করে বাড়িতে দিয়ে আসতে হয় আমায়! আসলে…”
“বাই স্মরণ,” পলি হাত নেড়ে বুদা আর রাধিয়াকে টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল।
স্মরণ থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। রাধিয়া যেতে-যেতে শুনল নোঈ চাপা গলায় স্মরণকে বলছে, “তোমার কাণ্ডজ্ঞান নেই? সব জায়গায় প্যাঁও প্যাঁও! যেন হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে! তুমি কি পাগল?”
ওদের গাড়িটা বেশ বড়। সরু রাস্তা ধরে আমহার্স্ট স্ট্রিটে বেরোনো অবধি গাড়িটা শামুকের মতো চলল। আশপাশের লোকজন যে বিরক্ত হচ্ছে, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল রাধিয়া। বড় আর সুন্দর গাড়ি দেখলেই রাস্তার লোকজন খেপে যায়। এটা দেখেছে রাধিয়া। আমাদের আশপাশটা হিংসুটেদের নিয়ে তৈরি।
বুদা গাড়ির সামনে বসেছে। ও মুখ ঘুরিয়ে বলল, “আচ্ছা, সুম্পাদের বাড়িতে সেই ছেলেটা ছিল না? সেই যে রে তোর সঙ্গে আলাদা হয়ে কথা বলছিল খাবারের সময়। কী যেন নাম!”
“নিশান!” রাধিয়া ছোট্ট করে বলল।
বুদা বলল, “রাইট। গতকাল ওকে দেখলাম নন্দনে। একটা ফিল্ম দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম ওকে। সঙ্গে একজন বেশ বয়স্ক মহিলা ছিলেন। ছোট করে কাটা চুল। সামান্য উইয়ার্ড ড্রেস করেছিলেন। সো আই সেড, হাই!”
পলি বলল, “ছেলেটা বেশ। দেখতে অনেকটা ক্রিকেটার মণীশ পাণ্ডের মতো, না?”
বুদা বলল, “কী একটা লিটল ম্যাগের জন্য এসেছিল বলল। আরে, আমি তো নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না! ও এদিকে আমায় ডেকে কথা বলছে! আই ফেল্ট সো অকোয়ার্ড!”
রাধিয়া চুপ করে রইল। ছেলেটা বুদার সঙ্গে কথা বলেছে! ওর কথা জিজ্ঞেস করেনি? কথাটা মনে হতেই নিজেকে ধমক দিল রাধিয়া। এসব কী ভাবছে ও! কেন জিজ্ঞেস করবে ওর কথা! একদিন স্টেশন থেকে নিয়ে একটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল আর একদিন একটা নেমন্তন্নে দেখা হয়ে টুকটাক একটু কথা বলেছিল। তাতে তেমন তো আর পরিচয় হয়নি যে, ওর কথা জিজ্ঞেস করবে! তবে একটা দীর্ঘশ্বাস মনে মনে চাপল রাধিয়া, ছেলেটার পারফিউমটা খুব সুন্দর! কথাটা মনে পড়তেই চোখ বুজে এল। আর ওর সামনে ভেসে উঠল সেই আধো অন্ধকারে জড়িয়ে থাকা একটা গলি। তার ভেতর দিয়ে ডুবে ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে একটা সাইকেল। আর সেই হলুদ পাঞ্জাবিটা হালকা হাওয়ায় উড়ছে প্রজাপতির মতো।
“তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল জানিস?” বুদা এবার পিছন ফিরে তাকাল রাধিয়ার দিকে।
রাধিয়া সামান্য হাসল। ওর জানতে ইচ্ছে করছে কী জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু ও জানে বেশি কৌতূহল দেখালে পলি আর বুদা ওকে খুব জ্বালাবে!
বুদা বলল, “নিশান বলল, ‘আপনার সেই অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বান্ধবী কেমন আছেন?’ তোকে এমন করে বলল কেন রে?”
রাধিয়ার ভুরু কুঁচকে গেল! এ আবার কেমন কথা! ও এর উত্তরে কিছু না বলে সামনে বসা মধুদাকে বলল, “ওই কালীঘাট ট্রাম ডিপো হয়ে যেয়ো তো মধুদা। পলি আর বুদা নামবে।”
“কেন, তুই নামবি না?” পলি পাশ থেকে অবাক হল।
“না রে,” ছোট করে বলল রাধিয়া, “আমার বাড়িতে একটু কাজ আছে। আসলে ঠাকুমাকে নিয়ে একটু বেরোব। ঠাকুমা বলেছিল, আমি ভুলে গেছি একদম।”
“যা,” পলি মাথা নাড়ল, “আমি জানি তুই মিথ্যে বলছিস। এত ঘরকুনো কেন রে তুই?”
“না রে, সত্যি বলছি,” রাধিয়া বলল, “ঠাকুমা একবার দোকানে যাবে জুতো কিনতে। আমাকেও যেতে হবে!”
“ও,” পলি চুপ করে গেল।
আচমকা গাড়িটা কেমন যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। গাড়ির কাচ তোলা। গুনগুন করে এসি চলছে। গাড়িটা টিপু সুলতান মসজিদের সামনের সিগনালে এসে দাঁড়িয়েছে!
বিকেল এবার ক্রমশ নরম হয়ে আসছে। সামনে গাড়ি আর বাস এমন করে গিঁট পাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে আর জীবনেও এই গিঁট খুলবে না!
জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল রাধিয়া। আর তখনই চমকে উঠল! আরে ওটা কে? বাবা না!
রাধিয়া ভাল করে ঘুরে বসল এবার। সত্যি দেখছে তো? বাবা-ই তো? হ্যাঁ, ঠিক। বাবা-ই! একটা সাদা সেডানের পেছনে বসে রয়েছে বাবা। কালো টি-শার্ট পরে আছে। আর পাশে ওটা কে? একজন মহিলা! ছোট করে, প্রায় ন্যাড়ার মতো করে কাটা চুল। শার্প ফিচার! বাবা মহিলার দিকে ফিরে কথা বলছে। কিন্তু বাবা এই শেষ বিকেলে কী করে কলকাতায় থাকতে পারে? বাবা তো বলেছে যে, ব্যাবসার কাজে নাগপুর গেছে। গত কালকেই তো বেরোল। তা হলে?
রাধিয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। ও সিগনালের দিকে তাকাল। এখনও লাল। ওঃ, কিছুতেই সিগনালটা খুলছে না! মনখারাপের সঙ্গে কেমন একটা টেনশনও হচ্ছে ওর। মধুদা যদি দেখে ফেলে! কী হবে তা হলে! কী লজ্জা, কী লজ্জা!
