কফি হাউসটা বাঁ দিকে রেখে প্রথম বাঁ হাতের রাস্তাটা শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট। সেই রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই কানাইদার দোকান।
গল্পের বইটই এই মানুষটার কাছ থেকেই কেনে রাধিয়া। কানাইদা খুব ভাল মানুষ। সারাক্ষণ পান মুখে থাকে। রাজ্যের বাংলা বইয়ের নাম আর পাবলিশার্সের নাম মুখস্থ!
কানাইদা একটা প্লাস্টিকের টুলের ওপর বসে হাতপাখার হাওয়া খাচ্ছিল। কানাইদার দুই ছেলেই মূলত দোকান দেখে এখন।
রাস্তার ওপরেই দোকান। বেশ ভিড়। দাঁড়ানোর জায়গা নেই। তাও রাধিয়া দু’জন মানুষকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল কানাইদার সামনে।
কানাইদার হাতপাখা থেমে গেল। এক গাল হেসে বলল, “আরে, কেমন আছ? অনেকদিন আসোনি!”
রাধিয়া হাসল। তারপর ব্যাগের ভিতর থেকে চার ভাঁজ করা কাগজ বের করে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এখানে দুশোটা বই আছে। ঠাকুমা যেমন পাঠায় আর কী। কালকে এলে কি পাওয়া যাবে?”
কানাইদা কাগজটা হাতে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে বাইফোকাল চশমার তলা দিয়ে দেখল। তারপর বলল, “আচ্ছা, হয়ে যাবে। তোমাদের যে লোক আসবে তাকে বোলো আসার আগে একবার যেন আমায় ফোন করে নেয়। আসলে রাস্তার ওপরে তো এভাবে এত বই রাখা যায় না! তাই অন্য জায়গায় রেখে দেব। উনি এলে তখন দিয়ে দেব।”
“কিছু টাকা দিয়ে যাব?”
কানাইদা হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, “না গো দিদিমণি, যখন নেবে তখন দিয়ো।”
রাধিয়া আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পলি পাশ থেকে খোঁচা মারল। মেয়েটা খুব তাড়া দিচ্ছে আজ!
রাধিয়া হাসল কানাইদার দিকে তাকিয়ে তারপর বলল, “আমি তা হলে আসি?”
“গাড়ি কোথায় রেখেছ?” কানাইদা জিজ্ঞেস করলেন।
“ওই সামনেই… আসছি…” রাধিয়া হেসে পেছন ফিরল।
এই রাস্তাটা আরওই ঘিঞ্জি! তার মধ্যে একটা ঠেলাওয়ালা তার বিরাট বড় ঠেলা ঢুকিয়ে দিয়ে রাস্তার মুখটা বন্ধ করে দিয়েছে প্রায়।
বুদা বিরক্ত হয়ে বলল, “নাও ঠেলার জন্য এখন ঠেলা বোঝো!”
রাধিয়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ও দেখতে পেল ছেলেটাকে। রোগা-পাতলা, বেঁটে, এক মাথা উসকোখুসকো চুল। চোখে চশমা। শার্টটা অর্ধেক গোঁজা আর অর্ধেক বের করা।
আরে, এই ছেলেটাকে দেখেছিল না সুম্পার জন্মদিনে! কী যেন নাম! হ্যাঁ মনে পড়েছে। স্মরণ।
কিন্তু ছেলেটা করছে কী? রাধিয়া দেখল, বড় ঠেলাটার পেছনের দিকটা ধরে টানছে স্মরণ। ওর মনে হল, এই ভিড়টা থেকে ঠেলাটাকে বের করার জন্য এমন করছে ছেলেটা। এবার একটা মেয়েকে দেখল ও। ফরসা। কাটা-কাটা মুখ চোখ। চশমা পরা। একটা জিন্স আর সাদা কালো ডোরাকাটা একটা গোল গলা টি-শার্ট পরে রয়েছে মেয়েটা। আর স্মরণকে দু’হাত দিয়ে টেনে সরানোর চেষ্টা করছে ও।
পলি বলল, “ওই দেখ কোন মক্কেল! কী করছে মালটা?”
রাধিয়া দেখল বুদা হাসছে। আর সত্যি বলতে কী, আরও নানা লোকজন হাসছে।
রাধিয়ার খারাপ লাগল। সবাই ঠেলাওয়ালাটাকে গালাগালি করছে। কিন্তু সে বেচারা রুজির জন্য বেরিয়েছে। আর শুধু ঠেলাওয়ালার দোষ নয় মোটেই। রাস্তাটাকেই সবাই মিলে এমন করে রেখেছে যে, জট পাকিয়ে গিয়েছে। আর বেচারা স্মরণ সেই জট খোলার চেষ্টা করছে বলে সবাই ওকে দেখে হাসছে।
মাঝে মাঝে এইসব দেখে মনখারাপ হয়ে যায় রাধিয়ার। যে কোনও কিছু করার চেষ্টা করে তাকে নিয়েই পৃথিবীতে হাসাহাসি হয়। এখন যেমন হল।
ও দ্রুত এগোল। মানুষের ফাঁকফোকর দিয়ে গলে, দোকানের সিঁড়িতে উঠে, কাঠের টুল টপকে ও গিয়ে পৌঁছল ওদের সামনে।
“স্মরণ, কী করছ?”
স্মরণ ফিরে তাকাল। নাক থেকে পিছলে চশমাটা নেমে এসেছে নীচে। ও চশমাটা তুলে নাক কুঁচকে সেটাকে সেট করে বলল, “আরে রাধিয়া! দেখছ না কী কেস! এভাবে কেউ এখানে ঠেলা ঢোকায়! এটাকে বের না করে দিলে গোটা রাস্তাটা দাঁড়িয়ে যাবে!”
“ছাড়ো, ছাড়ো বলছি! ছাড়ো তুমি…” পাশ থেকে মেয়েটা আলতো করে এবার থাপ্পড় মারল স্মরণের কাঁধে।
স্মরণ তাও ছাড়ল না। তবে রাধিয়াকে এগিয়ে যেতে দেখেই বোধহয় এবার আরও কিছু মানুষজন মজা দেখা বাদ দিয়ে এসে হাত লাগাল। তার ফলে ঠেলাটা সোজা হয়ে এগিয়ে যেতে পারল। আর জট খুলে রাস্তাও স্বাভাবিক হয়ে গেল।
পলি আর বুদা এসে দাঁড়াল রাধিয়ার পেছনে। ওদের দেখে স্মরণ হাসল, “আরে, তোমরা সবাই এসেছ! দারুণ তো!”
জয়তী আর রাখি আসেনি। কিন্তু সেটা আর বলল না রাধিয়া।
ও শুধু বলল, “আমাদের তো ইউনিভার্সিটি এখানে। তোমরা? বই কিনতে?”
“আরে না, না,” স্মরণ হাসল, “কিছু স্টেশনারি কিনতে এসেছি। আমাদের আপনস্যার পাঠালেন। আর স্যারের কিছু বইও কিনতে হবে। যাই হোক, আলাপ করিয়ে দিই। ও আমাদের অফিসেই আছে। নাম নোঈ।”
নোঈ হেসে ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝোঁকাল। এবার মেয়েটাকে আরও ভাল করে দেখল রাধিয়া। খুব সুন্দর দেখতে। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন করতে পারে এমন স্কিন! এই বিকেলের ধুলোটে আলোতেও মুখটা ঝলমল করছে।
“আমি রাধিয়া।”
আশপাশ থেকে ভ্যান, গাড়ি, লোকজন ক্রমাগত ওদের ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে।
স্মরণ বিরক্ত হয়ে বলল, “এটা এমন একটা জায়গা যে, শান্তিতে হাঁটতেও পারবে না কেউ! তা সেদিনের পরে তো আর দেখাও হল না তোমাদের সঙ্গে!”
রাধিয়া বুঝল স্মরণের তেমন কোনও কথা নেই বলার। ও পলির দিকে তাকাল।
