রাধিয়ার এসব শুনতে ভাল লাগে না। ওদের যে অনেক টাকা সেটা ও জানে। কিন্তু কী-কী ব্যাবসা আছে, কোথায়-কোথায় কী আছে সেসব নিয়ে ওর আগ্রহ নেই।
ঠাকুরমা যদিও বলে এসব একটু জেনে নিতে, কিন্তু রাধিয়া কিছুতেই কিছু শুনতে চায় না। কিছুদিন আগে ওই যে রাধিয়া সোনাঝুরিতে গেল, সেখানেও ওদের একটা জুটমিল আছে। ঠাকুরমা সোনাঝুরির কথা শুনে শুধু বলেছিল, “তুই যাচ্ছিস? যা। আমি যে কত বছর যাইনি!”
রাধিয়ার অবাক লেগেছিল, “কেন যাওনি ঠাকুমা? খুব তো কিছু দূর নয়। আর আমাদের তো একটা মিল আছে। তা হলে?”
ঠাকুরমা বলেছিল, “ওদিকে আর যাব না আমি। যে-জীবন ওখানে ফেলে এসেছি, সেই জীবন কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেয়নি আমায়।”
“কিন্তু ওখানে অনেক সম্পত্তি আছে না তোমার নামে?”
“শ্বশুরমশাই খুব ভালবাসতেন আমায়। তাই কিছু জিনিস আমার নামে করে গিয়েছেন। কিন্তু নামে করা মানেই তো সেটা আমার নয়! আমার আর কিছুই নয়। শুধু প্রশ্ন ছাড়া আমার আর কিছু নেই,” ঠাকুরমা আর কিছু না বলে চুপ করে গিয়েছিল।
“সোনাঝুরির কথা তুমি কিছু বলতে চাও না কেন ঠাকুমা?”
“কিছু বলার নেই রে রাধি। সেই জীবনটাই নেই তো আর কী বলব!”
রাধিয়া বোঝে না ব্যাপারটা কী। সোনাঝুরির প্রসঙ্গ উঠলেই এমন ম্রিয়মাণভাবে কেন কথা বলে ঠাকুরমা! তবে এই নিয়ে বেশি প্রশ্ন করে না ও। কাউকে কোনও ব্যাপারে জোর করা ওর পছন্দ নয়।
ঠাকুরমার দানধ্যানের হাত খুব। নিজের শ্বশুরমশাইয়ের নামে একটা বৃত্তি চালু করছে। বিভিন্ন অনাথাশ্রমে বার্ষিক একটা টাকা দেয়। আরও নানা কিছু করে। পলিদের এই ওল্ড এজ হোমটাতেও প্রতিমাসে একটা করে টাকা পাঠায় ঠাকুরমা।
ঠাকুরমা বলে, “ভগবান অনেক দিয়েছেন। আমি না হয় তার থেকে একটু দিলাম। তাতে আমার তো কমছে না!”
আজ যে এই বইয়ের অর্ডার দেওয়ার ব্যাপার আছে, সেটাও এমন একটা কাজের অঙ্গ।
রাধিয়া আপত্তি করেনি। ওর এসব ছোটখাটো কাজ ভালই লাগে। মা সারাক্ষণ ওকে আগলে রাখে। তুলোয় মুড়ে রাখে। কিন্তু রাধিয়ার সেটা ভাল লাগে না। ওরও ইচ্ছে করে আর-পাঁচজনের মতো ঘুরতে। কিন্তু পারে না। সারাক্ষণ গাড়ি করে ঘোরা! এসিতে বসে থাকতে-থাকতে মাঝে মাঝে ভুলে যায় কলকাতায় কোন ঋতু চলছে!
মায়ের কথা হল বাইরে এত পলিউশন, তোর স্কিন আর চুল খারাপ হয়ে যাবে। আরে বাবা, মানুষ কি শুধু রূপটুকু নাকি? ওর অন্য বান্ধবীরা কেমন প্রজাপতির মতো স্বাধীনভাবে উড়ে-ঘুরে বেড়ায়!
মায়ের তো কলকাতাতেও ওকে পড়তে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। ওর দুই মামা ইংল্যান্ডে থাকে। মা খুব জেদ ধরেছিল রাধিয়াকে ওখানে পড়তে পাঠাবে। কিন্তু রাধিয়াও জেদ করে যায়নি। আর শুধু রাধিয়াই নয়। ঠাকুরমাও রাধিয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আসলে ঠাকুরমাকে টপকে ওদের বাড়িতে কিছু হয় না। মা এই নিয়ে বাবার কাছে অনুযোগ করে। বলে, “আমরা এত বড় হলাম, তাও ওঁর কথামতো কেন আমায় চলতে হবে? আমার মেয়ে, তাকে আমি আমার ইচ্ছেমতো পড়াতেও পারব না! ওই দেশে গিয়ে পড়লে ওর কেরিয়ার কত ভাল হত!”
বাবা বেশি কথার মানুষ নয়। সঙ্গে কিছুটা রাগীও আছে। মায়ের এক কথা বারবার বলায় বলেছিল, “ওর যেখানে ভাল লাগবে পড়বে। তুমি এই নিয়ে আর অশান্তি কোরো না। আর রাধি তো নিজেই এখানে থাকতে চায়!”
রাধিয়া বোঝে কেন এমন বলে মা। আসলে মায়ের নিজের ইচ্ছে ছিল বিদেশে গিয়ে লেখাপড়া করার। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সেটা আর হয়নি। তবে ঠাকুরমা বা বাবা নিষেধ করেনি লেখাপড়া করতে। কিন্তু মায়ের খুব অভিমান হয়েছিল নিজের বাবা-মায়ের ওপর। তাই নিজেই আর পড়েনি।
মা ওকে বলে, “তোকে তো আমি বিয়ে করতে বলব না। তুই ইচ্ছে হলে বিয়ে করবি, না হলে করবি না। কিন্তু লেখাপড়া থামাবি না।”
মায়ের মধ্যে ওর মনে হয়, দুটো মানুষ আছে। একটা মানুষ কেমন যেন স্নব, অহংকারী। আর আর-একজন বুকের ভেতরে চাপা পড়ে যাওয়া মনখারাপ করা এক মানুষ। মাঝে মাঝে মাকে ঠিক বুঝতে পারে না ও।
“তুই কি রাস্তা ক্রস করবি? নাকি মোটামুটি রাত অবধি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকার প্ল্যান আছে তোর?”
পলির কথায় পাশে তাকাল রাধিয়া।
“হ্যাঁ, এই তো!” রাধিয়া হাসল।
পলি বলল, “তাড়াতাড়ি চল। আমায় হোমে ছ’টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। তারপর স্যারের বাড়ি যাব!”
“যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি। অমন তাড়া দিচ্ছিস কেন?” রাধিয়া হাসল, “আর রোজ স্যারের বাড়ি যাস কেন? রোজ পড়া থাকে?”
“কাজ থাকে, পড়া, নোটস… সে অনেক ব্যাপার, আমার কথা ছাড়, তুই চল,” পলি ওকে তাড়া দিল।
“তুই আজকাল মাঝে মাঝে কী চিন্তা করিস রে? অন্যমনস্ক হয়ে যাস হঠাৎ-হঠাৎ! কী হয়েছে তোর? জিতেনের ভাগ্য খুলল নাকি?” বুদা পাশ থেকে ফুট কাটল।
“খালি বাজে কথা,” রাধিয়া বিরক্ত হল, “কী সব বলিস না!”
জিতেন ওদের সঙ্গেই ইংরেজিতে এমএ করছে। আর সেই প্রথম থেকেই রাধিয়ার পেছনে পড়ে আছে। ইউনিভার্সিটির আর কারও জানতে বাকি নেই যে, জিতেন রাধিয়ার জন্য পাগল!
রাধিয়ার বিরক্ত লাগে এসব। এমন গায়ে-পড়া মানুষ দেখলে মনে হয় পালিয়ে যায়। জিতেন আবার বিশ্ব-আঁতেল! কীসব ম্যাগাজ়িন বের করে! ঘাড় অবধি লম্বা চুল রাখে ছেলেটা। মাঝে মাঝে আবার খোঁপাও করে। সারাক্ষণ রংবেরঙের পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে থাকে। কাঁধে একটা তাপ্পিমারা ঝোলা। স্নান করে কি না কে জানে! সারাক্ষণ সিগারেট জ্বলছে মুখে। দেখলেই ঘেন্না লাগে রাধিয়ার। আর মুখে সব সময় বড়-বড় কথা। জয়েস, কাফকা, বোর্হেস, লোরকা, কাম্যু, ইয়োসা… আরও কত কী নাম! এদিকে নিজেরা যা লেখে, সেসব ওদের ওই ধরাচুড়ো পরা গ্রুপটা ছাড়া আর কেউ বোঝে কি না কেউ জানে না। ভান দেখলেই গা-পিত্তি জ্বলে রাধিয়ার। ওর মনে হয় যারা অযোগ্য কিন্তু লোভী, তারাই ঘ্যাম আর ভান নিয়ে ঘোরে।
