নোঈ মাথা নিচু করে নিল। চলে যেতে হবে ওকে এখান থেকে। পুশকিন ডেকেছে। কিন্তু যেতে পারছে না। জয় এত কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর গায়ের সেই ‘হট ওয়াটার’ পারফিউমের সঙ্গে তামাক মেশানো গন্ধ! সেই বিকেলবেলা! নোঈর গায়ে নিজের অজান্তেই কাঁটা দিয়ে উঠল। জীবন খুব নিষ্ঠুর। সব কিছু সাজিয়ে সামনে মেলে ধরেও এমন একটা ফাঁক রেখে দেয় যে, জীবনটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে!
নোঈ চোয়াল শক্ত করে বলল, “এভাবে গায়ে পড়ে অপমান করছিস কেন? আমি কি বলেছি, তুই আমার জন্য নীচে নেমে এসেছিস?”
জয় হাসল। বলল, “দেখ, এভাবে যে দেখা হবে, সেটা তো আমরা জানতাম না। কিন্তু কোয়াইট ফ্র্যাঙ্কলি, আর দেখা না হলেই বোধহয় ভাল হবে। নেক্সট টাইম তুই আসিস না।”
“মানে?” নোঈর বিরক্ত লাগল, “আমি চাকরি করি। সেই কাজে দরকার পড়লে আবার আসব।”
জয় মাথা নাড়ল। হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে নিভিয়ে বলল, “চাকরি? হাঃ হাঃ! তোদের আবার চাকরি! টাইম পাস বল? শখ। আর আসবি মানে? মানে আবার সেই… ওঃ… অনেক তো হল নোঈ, এবার ছাড়। আর কতদিন? এটা প্রেম না, ইগো আর অবসেশন! প্লাস আমি চেষ্টা করছি, বিদেশে চাকরির কথা হচ্ছে। বাই বাই ক্যালকাটা। বুঝলি?”
জয় হেসে ওদের যা কিছু সম্পর্ক আর বিচ্ছেদ ছিল সব আকাশে ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। ঢুকে গেল বড় বাড়িটার মধ্যে। আর নোঈর মনে হল গোটা পার্ক স্ট্রিটটা যেন জয়ের সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল ওর সামনে থেকে! ওর মনে হল সামনের রাস্তাটা কেমন যেন টলছে! মনে হল, আসলে পাখি নয়, ওর নিজের ঝলসানো মাংস টুপটুপ করে খসে পড়ছে আকাশ থেকে! মনে হল এই গ্রীষ্মের যেন কোনও শেষ নেই। এক অক্লান্ত আগুন, যুগের পর যুগ ধরে, ঝলসে, পুড়িয়ে দিয়ে যাবে সবকিছু। আর সব শেষে মাটিতে পড়ে থাকবে ওই পিষে ফেলা সিগারেটের মতো কিছু আধপোড়া মানুষ আর তাদের নরম, একাকী ইচ্ছেগুলো।
নোঈ দেখল ওই চুইংগাম বিক্রেতা ছেলেটা আবার ফিরে আসছে। ও ব্যাগ খুলল এবার। কিছু কার্ড, কাগজ আর কয়েকটা একশো টাকার নোটের পাশে চারটে দশ টাকার নোট দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে একটা সেই পুরনো পাঁজর ওর।
নোঈ চোখ বন্ধ করে হাত বাড়াল। দেখা যাক কোন নোটটা হাতে ওঠে। যদি সেই নোটটা ওঠে, তবে সেটাই দিয়ে দেবে। আজ আর কোনও পিছুটান রাখবে না।
হাতে পাতলা কাগজগুলো ঠেকল নোঈর। ও চিন্তা না করে তুলে নিল একটা। কী উঠল হাতে? ও কী চায়? কোন নোটটা উঠুক? এখনও, আজকের পরেও কি ওর মনে হবে ‘রেখে দিই’ ওই কাগজের টুকরোটা?
আবার মদের গন্ধ নাকে আসছে। ঘ্যানঘ্যানে গলাটা শোনা যাচ্ছে। নোঈ নিজেকে প্রস্তুত করল। তারপর চোখ খুলে তাকাল হাতের নোটটার দিকে!
.
১২. রাধিয়া
উত্তর কলকাতাটাকে কেমন একটা বাতিল চিলেকোঠার মতো লাগে রাধিয়ার। ঘিঞ্জি রাস্তা, রংচটা বৃদ্ধ বাড়িঘর, ধুলোমাখা রুগ্ণ গাছ, ছেঁড়া পোস্টার, বেখেয়ালি হকার। সব নিয়ে মনে হয় বাতিল আর অতিরিক্ত জিনিসপত্র কে যেন দলামোচড়া করে ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা ঘরের ভেতরে! কেন এমন করে রাখা হয়েছে শহরটাকে? কেন এমন একটা শহর চলে যায় দখলদারদের হাতে?
রাধিয়ার মনে সারাক্ষণ এমন নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কাকে কী বলবে?
আজ ইউনিভার্সিটিতে পলি আর বুদা এসেছে, বাকিরা কেউ আসেনি। ক্লাসও তেমন ছিল না। তাই ভেবেছিল বাড়ি চলে যাবে। কিন্তু পলি তো ছাড়ার পাত্রী নয়।
বলেছে, “এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে কী করবি? আমার সঙ্গে চল। ‘ব্রোঞ্জ ইয়ার্স’-এ নিয়ে যাব চল তোকে। কতদিন যেতে বলেছি, তুই তো শুনবি না!”
কলেজ স্ট্রিটটা আজ যেন উপচে পড়ছে! সামনে জামাইষষ্ঠী, কিন্তু তাতে কী? আজকাল তো আর মানুষজন কেউ কাউকে খুব একটা বই-টই উপহার দেয় না! বই পড়াকে লোকে হয় অবজ্ঞার চোখে দেখে, নয়তো ভাবে শো অফ করছে! তাই পালাপার্বণে বইয়ের বাজারে ভিড় দেখলে খুব আশ্চর্য হয় রাধিয়া!
মধুদা গাড়িটা পার্ক করেছে সেই সূর্য সেন স্ট্রিটে বিখ্যাত শরবতের দোকানটার কাছে। এখানে থেকে ওই অবধি হেঁটে যেতে বেশ কসরত করতে হবে।
তবে তার আগে একটা কাজ আছে। ঠাকুরমা বলেছে কয়েকটা বইয়ের অর্ডার দিয়ে আসতে। কোন এক স্কুলে দিতে হবে। এসবের জন্য মধুদা আছে। বাবার অফিসের লোকজন আছে। কিন্তু ঠাকুরমা রাধিয়ার ওপরই জোর দেয় এসব করার জন্য। বলে, “তোর আপত্তি কোথায়? অত পুতুপুতু করে থাকতে হবে না। তুই কানাইয়ের দোকানে গিয়ে আমার নাম করে অর্ডার দিয়ে আসবি। অন্য লোক গিয়ে ডেলিভারি নিয়ে আসবে। বুঝলি?”
ঠাকুরমা অদ্ভুত মানুষ। ওদের বাড়িতে থাকলেও কেমন একা-একাই থাকে। বড় বাড়ি বলে অসুবিধেও হয় না। আসলে এইসব বাড়িঘর, নানারকমের ব্যাবসাপত্র, এই সবকিছু ঠাকুরমার নামেই। তবে বাবাও মালিক গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। আর রোজকার ব্যাবসা বাবাই দেখে!
ঠাকুরমা বলে, “এত নানা ধরনের ব্যাবসা, আমার আর ভাল লাগে না। সত্যি, বিষয় বিষ! জানিস রাধি, আমি শ্বশুরঠাকুরকে বলেছিলাম যে, আমার নামে এসব দিয়ে যাবেন না। কিন্তু উনি শোনেননি। নিজের ছেলের চেয়ে আমাকে বেশি বিশ্বাস করতেন। লোকটা শেষজীবনে কেমন পালটে গিয়েছিলেন। সেই রাগ বা তেজ, কিছুই ছিল না।”
