পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় বেশ ভিড়। স্মরণ হাতে আর্টওয়ার্কের বড় ফোল্ডারটা নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আজ আর রাজারহাটের অফিসে যেতে হবে না। এই বিকেল সোয়া চারটের সময় অতদূরে গেলে পৌঁছতেই ছ’টা বেজে যাবে।
স্মরণ বলল, “আইসক্রিম তেষ্টা পেয়েছে, খাবে?”
“কী?” হাসল নোঈ।
স্মরণ বলল, “বলছি, আইসক্রিম খাবে? সামনেই হবি সেন্টার। খাবে?”
নোঈ বলল, “না, আমি ঠিক মানে…”
স্মরণ বলল, “আরে বাবা, আমি তোমায় এমনি খেতে বললাম। আমার অন্য উদ্দেশ্য নেই! তুমি যা ভালনারেবল স্টেটে আছ, তাই… প্যাঁও রেগে গেলে বা মনখারাপ করলেই আমি ওকে আইসক্রিম খাইয়ে দিই।”
“কে?” নোঈ বুঝতে পারল না ঠিক!
“আরে প্যাঁও! আমার প্রেমিকা!” স্মরণ বলল, “দারুণ সুন্দর দেখতে প্যাঁওকে। ছোট্ট মুকুট কপাল। এইটুকু ঠোঁট। জাপানি পার্লের মতো দাঁত। থুতনিতে একটা আলতো ডিপ্রেশন আছে। নাকের দু’পাশে ছোট্ট ফুলস্টপের মতো দুটো তিল। থুতনিতেও আর-একটা। আর হাতের আঙুলগুলো যা দারুণ না! ওঃ!”
স্মরণ বর্ণনা দিতে-দিতে নিজেই খুশি হয়ে উঠল। বলল, “তবে একটা ব্যাপার, প্যাঁও খুব রাগী কিন্তু। সিংহ লগ্ন তো! মানে আমার সিংহী আর কী। আমায় খুব বকে। মাঝে মাঝে তাড়িয়েও দেয়। পরে আবার কাছে ডাকে। মেয়ে নয়, পুরো মুডের স্পেকট্রাম। কতরকমের মেজাজ চাই? সব রকম দেখিয়ে দেবে। আসলে ও গান গায় তো খুব সুন্দর, তাই রাগটা একটু বেশি!”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। ওর মনটা মোটেই ভাল লাগছে না। বরং সেই নাম-না-জানা কোটর থেকে আবার পর্বতারোহীটি বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার মধ্যে স্মরণের এই সব কথা ভাল লাগছে না মোটেই।
স্মরণ বলল, “জয়ের জন্য তুমি বাথরুমে ঢুকে কান্নাকাটি করছিলে?”
“কী?” আচমকা এমন একটা কথায় নোঈ বেশ হকচকিয়ে গেল।
স্মরণ বলল, “ও তোমায় ‘তুই’ করে কথা বলছিল। এমন ভাব করছিল, যেন সব কিছু ঠিক আছে, আর তুমি ঠিক উলটোভাবে ওর সঙ্গে একটা আরোপিত দূরত্ব দেখাচ্ছিলে। স্ট্রেস দিচ্ছিলে ‘আপনি’ শব্দটার ওপর। ওর ওই ক্যাজ়ুয়াল বিহেভিয়ার আর তোমার অতিরিক্ত চোয়াল শক্ত করে ওর সঙ্গে দূরত্ব রাখার চেষ্টা তো একটা জিনিসই স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়।”
“কী বুঝিয়ে দেয়?” নোঈ ভুরু কুঁচকে তাকাল।
স্মরণ হেসে বলল, “এটাই বোঝায় যে, ও মোটেই ক্যাজ়ুয়াল নয়। অকোয়ার্ড সিচুয়েশানে পড়ে সেখান থেকে নিজের মুখ রক্ষা করছে। আর তুমি কিছুতেই ওকে সেই সিচুয়েশন থেকে বেরোতে দিতে চাও না। ওকে একটা গিল্ট দিয়ে কোণঠাসা করতে চাও।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না। এভাবে যে কেউ কলিগের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে পারে, ও ভাবতেই পারে না! কিন্তু স্মরণের এসব বোধ আছে বলে মনে হয় না!
স্মরণ আবার বলল, “ওই অনুস্বরের মতো টিপ মুছে ফেলে যখন বাথরুম থেকে বেরোলে, বুঝলাম কিছু কেস হয়েছে। তারপর জয়বাবুকে দেখে তো নিশ্চিত হলাম কী কেস।”
নোঈ আর নিতে পারল না। সামান্য গম্ভীর গলায় বলল, “প্লিজ়। তোমার মনে হচ্ছে না যে, তুমি বড্ড বেশি জাজমেন্টাল হয়ে যাচ্ছ?”
স্মরণ বলল, “দূর! এগুলো তো মনে এল বলে বললাম। সারাক্ষণ তোমরা ফেসবুকে সেলফি দেবে, কী করছ তার স্টেটাস দেবে। কেমন ফিল করছ তা বলবে। আর কেউ একটু কিছু বললেই এমন ভাব দেখাবে, যেন সবার মনের ভেতর একটা করে নিউক্লিয়ার বোমার লঞ্চ কোড লুকোনো আছে! সেটা জানার চেষ্টা চলছে। তোমার যা হয়েছে সেটা কমন ব্যাপার। এটাকে এত গুরুত্ব দিয়ো না। যাই হোক, তুমি যখন বাথরুমে ছিলে আমায় ফোন করেছিলেন পুশকিনস্যার। বলছিলেন, কাজ শেষ হলে একবার রাসেল স্ট্রিটের ওখানে যেতে। উনি আসবেন। আমি বলেছি আমায় ডালহৌসি যেতে হবে। তুমি চলে যাবে। এখান থেকে একটু হেঁটে গেলেই পেয়ে যাবে অফিসটা। দেখবে, একটা পুরনো চাইনিজ় লন্ড্রি আছে। তার পাশেই।”
নোঈ বলল, “ঠিক আছে। তুমি তা হলে কাল ওই আর্টওয়ার্কটা নিয়ে যেয়ো মনে করে। আমি আসছি।”
স্মরণ হেসে বুড়ো আঙুল তুলে ওকে দেখিয়ে পা চালিয়ে রাস্তা পার হয়ে গেল।
নোঈ দাঁড়াল একটু। এই পার্ক স্ট্রিটে আসতে নোঈর ভাল লাগে খুব। কেমন একটা পুরনো অভিজাত কলকাতা যেন আজও বেঁচে আছে এই পার্ক স্ট্রিটে। এই চওড়া রাস্তা। পুরনো ধাঁচের বাড়িঘর। কাঠের প্যানেলওয়ালা রেস্তরাঁ। সব মিলিয়ে সময়টা কেমন যেন কলোনিয়ান ক্যালকাটায় ফিরে যায়!
“দিদি, একটা চুইং গাম কিনবেন?” আচমকা সামনে একটা খয়াটে চেহারার লোক এসে দাঁড়াল।
লোকটাকে ভাল করে দেখল নোঈ। কালো, রোগা। কানে একটা ছোট্ট পাথরের দুল। গায়ের ডোরাকাটা গেঞ্জিটা কতদিন যে কাচে না কে জানে! লোকটার গা থেকে সস্তা মদের গন্ধ আসছে।
“দিদি, পিলিজ। খিদে পেয়েছে। দুটো পড়ে আছে চুইংগাম। পিলিজ!” লোকটা কেমন যেন এগিয়ে আসছে নোঈর দিকে। নোঈ ভয় পেয়ে গেল।
“এই ভাগ, ভাগ এখান থেকে!”
নোঈ সামান্য ঘাবড়ে গেল। দেখল পেছন থেকে এসে লোকটাকে কড়া ধমক দিল জয়।
লোকটা গুটিয়ে গেল কিছুটা।
জয় আবার বলল, “ভাগ বলছি না! পাতা খাবি এখন বসে আর বলছিস খিদে পেয়েছে! ভাগ!”
লোকটা চোয়াল শক্ত করে একবার দেখল জয়কে, তারপর মাথা নামিয়ে চলে গেল।
নোঈ তাকাল জয়ের দিকে। ও কী করছে এখানে?
জয় বলল, “আমি সিগারেট খেতে নীচে নেমেছি। তোর জন্য নয়।”
