বাড়িতে দরজা খুলেই মা পুশকিনকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল বেশ। নোঈর মাকে নিয়ে ভয় ছিল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখেছিল মা হেসে, নরম ভাবেই কথা বলছে পুশকিনের সঙ্গে।
তবে পুশকিন বসেনি বেশিক্ষণ। আইকা মাগোকে কোলে করে ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়েছিল। নোঈর কেমন যেন একটা লেগেছিল। আইকা ঘরে ঢুকতেই কি পুশকিন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল? কেন?
পুশকিন উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “আমি তা হলে আসি।”
মা এবার সামান্য হেসে বলেছিল, “আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব! আপনাদের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মীয়তা হতে পারত কিন্তু নোঈটা এমন…”
“ও ঠিক করেছে!” পুশকিন হেসে তাকিয়েছিল মায়ের দিকে, “ডিনো ইজ় নো ম্যাচ ফর হার। বিদেশে থাকে মানেই যে, সে সাংঘাতিক, সেটা কিন্তু ভাববেন না।”
“কিন্তু তাও…”
মাকে কথাটা শেষ না করতে দিয়ে পুশকিন বলেছিল, “আর নোঈ নিজের যোগ্যতাতেই চাকরিটা পেয়েছে! আমার কথায় নয় কিন্তু! আমাদের বস, তিনি নিজেও সব রিক্রুটের ব্যাপারে সিভি স্ক্রুটিনি করেন! আপনি মনে কোনও দ্বিধা রাখবেন না।”
“তুমি এতক্ষণ বাথরুমে কী করছিলে?” স্মরণ গোলগোল চোখ করে তাকাল ওর দিকে। এমনিতেই ছেলেটার চোখগুলো গোল্লা ধরনের। তার ওপর আবার ওরকম করে তাকিয়ে আছে! ছেলেটা সত্যি অদ্ভুত, একটা মেয়েকে যে এমন প্রশ্ন করতে নেই, সেটাও জানে না।
নোঈ কিছু না বলে হাসল।
স্মরণ বলল, “সে কী! হাসি প্র্যাকটিস করছিলে নাকি? আরে, ওই জয় রয় ডাকছে আমাদের। চলো।”
আবার জয়ের কথা ওঠায় নোঈর বুকের ভেতর যেন দশ কেজির বাটখারা আছড়ে পড়ল। আসলে ও রিসেপশনে বসে দূর থেকে জয়কে দেখেছিল। এবার যে একদম সামনে থেকে ফেস করতে হবে, সেটা ভাবলেই পেটের ভেতরে কেমন যেন পাক দিচ্ছে! তবু মনে মনে নিজেকে শক্ত করল নোঈ।
স্মরণ বলল, “তুমি মাঝে মাঝে পজ় মোডে চলে যাচ্ছ কেন আজ? আসার সময় তো ভালই ছিলে! তেমন হলে তুমি বোসো, আমি গিয়ে ওই কথাটা বলে আসছি। জাস্ট তো একটা লাইন। আপনস্যারের সঙ্গে দেখা করতে বলতে হবে। আমি বলে আসছি।”
স্মরণ নোঈর উত্তরের অপেক্ষা না করে এগোতে গেল। কিন্তু নোঈ স্মরণকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। বলল, “না। আমিই যাব। এটা কাজ। আমায় ঠিক থাকতে হবেই।”
“মানে?” স্মরণ চোখ গোলগোল করে তাকাল আবার, “কোনও কেস আছে নাকি? এমন করে বলছ কেন?”
নোঈ নিজেকে ঠিক করল। তারপর জোর করে হাসল। আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।
জয়ের কিউবটা রিসেপশন থেকে সামান্য দূরে। পেছন থেকে জয়কে দেখে নোঈর বুকটা কেঁপে গেল আবার। জয় বড় চুল রেখেছে। পাশ থেকে দাড়ির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চোখে চশমা। মাথা নিচু করে জয় কিছু একটা করছে।
নোঈ একবার আড়চোখে স্মরণকে দেখে নিল। ছেলেটা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। কী খুঁজছে কে জানে!
“এক্সকিউজ় মি!” নোঈ সাবধানে ডাকল।
জয় না তাকিয়েই প্রথমে “ইয়া,” বলে তারপর মুখ তুলে নোঈকে দেখে চমকে গেল!
“তু…” জয় কেমন যেন ঘাবড়ে গেল!
নোঈ দ্রুত স্মরণকে হাত দিয়ে টেনে সামনে এনে বলল, “আমরা এসেছিলাম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে। আপন বাসু আমাদের পাঠিয়েছেন। আর্টওয়ার্কের হার্ড কপিটা নেব। আর উনি আপনাকে একটা কথা বলতে বলেছেন।”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে নোঈ চোয়াল শক্ত করল। ও যতই চাইছে না, কিন্তু তবু ওর চোখ বারবার খুঁটিয়ে দেখছে জয়কে। চশমার ফ্রেমটা নতুন। শার্টের মাঝের বোতামটা অর্ধেক লাগানো। দাড়িটা ট্রিম করা। লম্বা চুলে বার্গেন্ডি কালার। নাকের ব্রিজের পাশে সেই তিল। কানের লতির নীচে একটা ছোট্ট জড়ুল। আঃ! কী করছে কী ও! আচ্ছা জয় কি বুঝতে পারছে এটা? ওকে কি হ্যাংলা ভাবছে?
জয়ও নিজেকে সামলাল। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন করে বলল, “বাবা, তুই এভাবে আমায় আপনি-আজ্ঞে করছিস কেন? আমি তোর ভাশুর নাকি?”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারল না।
স্মরণ বলল, “আপনারা একে অপরকে চেনেন?”
“চিনি মানে?” জয় হাসল, “চিনি, গুড়, সুগার, সুগার ফ্রি সব।”
নোঈ বলল, “এটা অফিস ম্যাটার। আমাদের কিছু প্রোটোকল মেনটেন করা উচিত।”
জয় হাসল, “দূর, কী যে বলিস! আমরা এখানে অত আপটাইট নই। তা তোদের আপন কী বলেছেন?”
নোঈ বলল, “স্যার বলেছেন আপনাকে একবার দেখা করতে। মানে ইন পার্সন।”
“অ,” মাথা নাড়ল জয়, “এই কেস। বুঝেছি। তা আর্টওয়ার্ক পেয়েছিস তো?”
স্মরণ বলল, “হ্যাঁ, ওই রিসেপশনে রাখা আছে, বেরোনোর সময় নিয়ে যাব। আপনি কিন্তু একবার গিয়ে দেখাটা করবেন। স্যার বলেছেন এটা আর্জেন্ট।”
“কফি খাবি?” জয় মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে হাসল।
নোঈর মনে হল বুকের কোনও এক সূদর খাতে ঝুপঝুপ করে নদীর পাড় ভেঙে পড়ল। নোঈ জানে হাসির সঙ্গে টোল জেগে উঠেছে। কিন্তু দাড়ি বলে বোঝা যাচ্ছে না।
“না, আমাদের যেতে হবে,” নোঈ মাথা নামিয়ে নিল, “আপনি শুধু একবার দেখা করে নেবেন, থ্যাঙ্কস।”
“আরে, তুই এমন করছিস কেন বল তো?” জয় এবার যেন সামান্য বিরক্ত হল, “আপনি-আপনি করছিস কেন? তোর এসব ওভার রি-অ্যাকশন আমার ভাল লাগে না!”
নোঈ আর পারল না। শুধু চাপা গলায় বলল, “ভাল যে লাগে না সেটা জানি। বাই।”
মে মাসের আঠারো তারিখ আজ। আকাশ থেকে কেউ যেন গলন্ত লাভা ঢেলে দিচ্ছে কলকাতার মাথায়। নোঈ আকাশের দিকে তাকাল। এই রংচটা নীল বেডকভারটা কবে থেকে যে টাঙানো আছে মাথার ওপর! ওর মনে হল পাখিরা যে রোস্ট হয়ে মাটিতে টুপটুপ করে খসে পড়ছে না, সেটাই অনেক ভাগ্যের।
