নিজেদের গাড়ি নেয়নি নোঈ। মোবাইল থেকে গাড়ি বুক করে নিয়েছিল। ভেবেছিল চাকরি পেলে তখন ভেবে দেখবে রোজ কী করে যাবে!
অফিসটা দেখে বেশ ভাল লেগেছিল নোঈর। বেশ বড়। অনেক উঁচুতে! আর, একদিকের কাচের দেওয়াল দিয়ে বহুদূর দিগন্ত দেখা যায়। বিকেল বলে ওই দৃশ্যটা যেন আরও সুন্দর লাগছিল। গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা রিসেপশন পেরিয়ে ওকে ওপরে পাঠানো হয়েছিল। সেখানেও আর-একটা রিসেপশন। গদি-আঁটা চেয়ার। কয়েকটা গাছ। সামনে টেবিলে জলের গেলাস। আর, একটা যেন চুপচাপ শীত-শীত ভাব! কেউ শ্বাস নিলেও শব্দ শোনা যায় এমন নিস্তব্ধতা! রিসেপশনে বসে সামান্য টেনশন হচ্ছিল ওর। কেন হচ্ছিল কে জানে! ইন্টারভিউ বলে, নাকি পুশকিনের সামনে যেতে হচ্ছে বলে!
প্রায় দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পরে ওকে ডাকা হয়েছিল একটা ঘরে। উঠে দাঁড়িয়ে পাশের কাচে একবার নিজেকে দেখে নিয়েছিল নোঈ। তারপর এগিয়ে গিয়েছিল।
“আরে, কোথায় তুমি?” লু থেকে বেরিয়েই সামনে স্মরণকে দেখল নোঈ। সেই সামান্য এলোমেলো চুল, জামাটা ঠিকমতো গোঁজা নয়, পায়ে স্নিকার! নোঈ মাথা নাড়ল। এই ছেলেটাকে বলে লাভ নেই! সেই একইরকম ভাবে থাকবে।
অফিসে গিয়ে প্রথম দিনেই স্মরণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নোঈর। এমন একটা ছেলে কী করে এই সংস্থায় কাজ করে! এমন ছন্নছাড়া, উসকোখুসকো একটা ছেলেকে কেউ কিছু বলে না!
বলে, আপন বলে। ও সুযোগ পেলেই ঝাড়ে স্মরণকে। কিন্তু ছেলেটা কী দিয়ে তৈরি কে জানে! গায়ে যেন কিছুই লাগে না! আপন যখন খারাপভাবে ওকে বলে, স্মরণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর বকাঝকা শেষ হয়ে গেলে নিজেই বলে, “আমি তবে যাই স্যার?”
আপন লোকটাকে প্রথম দিন দেখেই ভাল লাগেনি নোঈর। ইন্টারভিউ দিতে ঢুকেই আপনের মুখে এমন কিছু একটা দেখেছিল নোঈ যেটা ওর ভাল লাগেনি একদম! আর পাশে বসা পুশকিন ওর দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসেছিল মাত্র!
আপন সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বলেছিল, “সিট।”
নোঈ বসার পরে মাথা ঝুঁকিয়ে “গুড আফটারনুন” বললেও আপন উত্তর দেয়নি।
পুশকিন পালটা উইশ করে বলেছিল, “আমরা তোমার সিভি দেখেছি। সাপোর্টিং ডকুমেন্টসও দেখেছি। তুমি আগে যে-কোম্পানিতে কাজ করতে সেটার রেফারেন্সও দেখলাম। তবে একটা কথা, আমাদের এখানে কিন্তু অ্যাকাউন্টসে তেমন করে ভেকেন্সি নেই! তোমার তো মার্কেটিং-এ একটা ডিপ্লোমা আছে। প্রজেক্ট ওরিয়েন্টেড কাজ করতে অসুবিধে নেই তো?”
নোঈ কিছু বলার আগেই, আপন বলেছিল, “আরে, আপত্তি থাকলে এখানে কাজ করা যাবে না। সিম্পল। তা পুশকিন, তুই তো মোটামুটি ঠিক করেই রেখেছিস যে ওকে নিবি, তা এটা বসকে বলেছিস তো?”
আপনের কথার মধ্যে কেমন একটা খোঁচা ছিল। কিন্তু পুশকিন উত্তেজিত না হয়ে স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “না বলে, ওঁর সঙ্গে কনসাল্ট না করে কি আমি কাজ করছি নাকি?”
আপন কেমন একটা চোখে তাকিয়েছিল নোঈর দিকে। তারপর বলেছিল, “প্রজেক্টের কাজ কিন্তু কঠিন। এমনও হতে পারে অন সাইট গেলে সেখানে রাতে থাকতে হতে পারে। লেবারদের মধ্যে থাকা… হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দ্য সিচুয়েশন। তখন কিন্তু ট্যানট্রাম সহ্য করা হবে না। আর-একটা কথা, এখন প্রবেশনারি পিরিয়ড থাকবে ছ’মাস, এরপর তোমার জব ইভ্যালুয়েশন হবে, তারপর পারমানেন্ট। এটা যেন মনে থাকে।”
আপনের কথার ধরন মোটেও ভাল লাগছিল না নোঈর। কিন্তু পুশকিনের মুখে একটা সহজ হাসি ছিল। কোথায় যেন নিরুচ্চারে ভরসা দিচ্ছিল ওকে।
“ওকে স্যার,” নোঈ মাথা নেড়েছিল।
“ক্যান ইউ জয়েন টুমরো?” জিজ্ঞেস করেছিল পুশকিন।
“শিয়োর স্যার,” নোঈ উঠে দাঁড়িয়েছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় যেন আবছাভাবে আপনের মৃদু গলা শুনতে পেয়েছিল নোঈ। শুনেছিল আপন বলছে, “কেমন ননির পুতুলের মতো চেহারা! দেখ, কতদিন টেকে!”
সেদিন ইন্টারভিউ সেরে কয়েকটা পেপারে সই করতে-করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পুশকিন নিজেই বলেছিল যে, ও গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দেবে ওকে। নোঈ আপত্তি করেছিল, কিন্তু পুশকিন খুব একটা পাত্তা দেয়নি।
ফেরার পথে গাড়িতে পুশকিন প্রায় কথাই বলেনি। সামান্য একটু “হুঁ, হাঁ” করেছে। সামনের সিটে পুশকিনের পাশে বসে নোঈর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। এই গাড়িটায় একদিন উঠতে চায়নি ও। আর আজ এই গাড়িতেই ওকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। সত্যি, জীবন অদ্ভুত! কোন বাঁক থেকে সে যে মানুষকে কোন বাঁকে এনে ফেলে!
শুধু পাড়ার মুখে যখন নোঈ নেমে যেতে চেয়েছিল, তখন পুশকিন বলেছিল, “কেন? আমি ফ্ল্যাটের নীচ অবধি ছেড়ে দিচ্ছি। প্রবলেম আছে?”
নোঈ কী বলবে বুঝতে না পেরে ফস করে বলে ফেলেছিল, “মানে… মা একটু… আসলে…”
হেসেছিল পুশকিন, “উনি চান না তুমি আমাদের কোম্পানিতে জব করো, তাই না? ডিনোর সঙ্গের ব্যাপারটা ওঁর খুব একটা ভাল লাগেনি বোধহয়। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সঙ্গে, চলো। লেটস সর্ট ইট আউট। প্লাস, তোমার বাবাকে আমার চমৎকার লেগেছে।”
নোঈ কী বলবে বুঝতে পারছিল না। কেউ নিজে থেকে ওদের বাড়ি যেতে চাইছে! তাকে তো আর না বলা যায় না! আর অবাক হয়ে যাচ্ছিল দেখে যে, মনের মধ্যে অস্বস্তির সঙ্গে কেমন একটা ভাল লাগাও আসছিল নোঈর। পুশকিন বেশ সহজ-সরল মানুষ! জটিলতা যেন ঠিক পছন্দ নয় ওর!
