তখন তো আর নোঈ বুঝতে পারেনি এই মার্কেটিং-এর ছেলেটি আর কেউ নয়, জয়! নোঈ দেখেছে ও যা এড়িয়ে যেতে চায়, তাই এসে আছড়ে পড়ে ওর জীবনে। এই যে চাকরিটা, সেটাও কি আর ও চেয়েছিল! বরং ডিনোদের সঙ্গে আর যাতে দেখা না হয় সেটাই চেয়েছিল। বা আরও স্পষ্ট করে বলা ভাল, পুশকিনের সঙ্গে যাতে দেখা না হয় সেটাই চেয়েছিল। কেন কে জানে, পুশকিনকে দেখলেই কেমন একটা নাগরদোলা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো ফিলিং হয় নোঈর! কেন এমন হয়, কে জানে! আর সত্যি বলতে কী, কারণটা নিয়ে নিজেকে বেশি খোঁচাখুচি করতে চায় না নোঈ। মোদ্দা কথা পুশকিনের মুখোমুখি আর যেন না হতে হয়, সেটাই মনেপ্রাণে চেয়ে এসেছিল। তাই সেদিন আইকা কথাটা বলার পরে নোঈ থমকে গিয়েছিল একদম। কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারেনি। শুধু অবাক হয়ে ভাবছিল, আবার সেই কাণ্ডটাই ঘটল!
মা আপত্তি জানিয়েছিল এই কাজের ব্যাপারে। সব ব্যাপারেই মায়ের নিজস্ব লজিক থাকে। এই ব্যাপারেও আছে। আইকা বোঝানোর চেষ্টা করছিল মাকে যে, জীবনে এসব ভাবলে বা দেখলে চলে না। কিন্তু মা কিছুতেই মানছিল না। আর নোঈ সেই তর্কের ফাঁকে নিজে সময় নিচ্ছিল। নিজেকে প্রস্তুত করছিল। নিজেকে বোঝাচ্ছিল যে, সব কিছু থেকে জীবনে পালানো যায় না। ও যত পালাতে চাইবে তত সমস্ত অপ্রিয়, অস্বস্তিকর জিনিস আরও বেশি করে ছুটে আসবে ওর কাছে।
তাই শেষে নিজেই বলেছিল, সিভিটা দেবে।
পরের দিন সকালে ই মেলে সিভি পাঠিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত লাগছিল ওর। কেবলই মনে হচ্ছিল কাজটা হয়ে যাবে। পুশকিনের মুখটা মনে পড়ছিল। ওই এলোমেলো করে তাকিয়ে থাকা। চশমার ওপারের চোখ। ওই মাথা নামিয়ে সামান্য হাসি। তা ছাড়া ওর দিকে পুশকিনের তাকানোর মধ্যে একটা কেমন যেন ব্যাপার আছে। না, কোনও খারাপ কিছু নয়, কিন্তু কিছু আছে একটা। তাই তো ওই চোখের দিকে তাকালে নোঈর মনে হয় প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকা নাগরদোলা থেকে ছিটকে পড়ছে ও!
ডাকটা এসেছিল তার চারদিনের মাথায়। ছোট্ট এক লাইনের একটা ই মেল। ওর ইন্টারভিউয়ের তারিখ আর সময় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল ই মেল-এ।
মা তো প্রথম থেকেই গজগজ করছিল, কিন্তু তাও মনে একটু আশা ছিল যে, নোঈকে হয়তো ইন্টারভিউয়ে ডাকবে না। কিন্তু ওই ই মেলটা আসার পরে মা যেন খেপে উঠেছিল একদম।
সারাদিন নোঈকে বুঝিয়ে সফল না হয়ে রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে বাবাকে নিয়ে পড়েছিল।
বাবা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, “ইন্টারভিউয়ে গাড়ি নিয়ে যাবি কি? না ক্যাব ডেকে নিবি? অত দূর!”
মা ভাত দিচ্ছিল। বাবার এই একটা কথাতেই মা হাত থেকে ভাতের হাতাটা শব্দ করে টেবলে রেখে বলেছিল, “নাও, আরও মাথা খাও মেয়ের! এত আহ্লাদ করার কী আছে মেয়েকে? আদর দিয়ে তো মাথায় তুলে ফেলেছ! দেশে কি আর কোম্পানি নেই? সেখানে কি আর কেউ চাকরি পায় না? ওই কোম্পানিতেই ওকে কাজ করতে হবে?”
বাবা শান্ত গলায় বলেছিল, “তুমি ওকে কেন ওর মতো করে ডিসিশন নিতে বাধা দিচ্ছ? ও যদি নিজের মতো করে ঠিক-ভুল না শেখে, সারা জীবন তো কষ্ট পাবে! আমরা তো আর সারা জীবন ওকে গার্ড করে ঘুরে বেড়াব না!”
মা রাগে ফুঁসছিল, “সারাক্ষণ তোমার শুধু তত্ত্বকথা। আমেরিকার ছেলেটিকে না করার সময় মনে ছিল না যে, এটা একটা ভুল ডিসিশন নেওয়া হচ্ছে! আর এখন ওর দাদার কোম্পানিতে চাকরি করবে!”
বাবা আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল এবার। চিৎকার করে বলেছিল, “এনাফ! আমি সেদিন থেকে শুনছি এসব নিয়ে তুমি অশান্তি করছ! কেন করছ এমন? ওই ছেলেটাকে বিয়ে করেনি তো কী হয়েছে? কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাতে? সব কিছুর একটা লিমিট আছে! তোমার আমেরিকায় থাকা জামাই হলে কি সমাজে মান বাড়বে? মেয়ের পছন্দ নয় যাকে, তার সঙ্গে সে থাকবে কেমন করে? ওর ইচ্ছে হয়েছে এখানে কাজ করার ও করবে! আমি কিছু বলি না মানে এই নয় যে, অন্যায় দেখেও কিছু বলব না! এই নিয়ে আর যদি কোনও কথা হয়, তবে আমি কিন্তু আর চুপ করে থাকব না।”
বাবা আর ভাত না খেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল শব্দ করে। নোঈর খারাপ লাগছিল খুব। ওর খিদে পেয়েছিল, কিন্তু এসব দেখে ওরও আর খাবার মুখে তুলতে ইচ্ছে করছিল না। আস্তে করে প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে ও নিজেও উঠে গিয়েছিল।
মা বসেছিল একা। পাথরের মতো। নোঈর কষ্ট হচ্ছিল মায়ের জন্য। কিন্তু ও জানত মাকে এই সময়ে কিছু বললে আর রক্ষে থাকবে না!
আসলে বাবা সংসারের কোনও কিছুতে থাকে না। নিজের কাজ আর হবি নিয়েই থাকে। সেই মানুষটা যে এমন করে রেগে যেতে পারে সেটা নোঈ বুঝতে পারেনি। কোনওদিন বাবাকে রাগতে দেখেনি নোঈ। তাই ওর নিজেরও খুব খারাপ লেগেছিল। মনে হচ্ছিল ওর জন্য বাড়িতে একটা বাজে পরিস্থিতি তৈরি হল!
তবে পরের দিন ঘুম থেকে উঠে নোঈ অবাক হয়ে দেখেছিল যে বাড়ির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। বাবা আবার নিজের কাজে। মা আবার রোজকার মতো এই রাগছে, এই হাসছে!
ও অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে জিজ্ঞেস করেছিল, কী হয়েছে!
বাবা মুচকি হেসে ওর পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, “কাল রাতে আমার জামা টেনে ছিঁড়ে দিয়েছে রাগের চোটে। আমায় বালিশ দিয়ে খুব মেরেছে! তারপর কেঁদে শান্ত হয়েছে! জানিস তো তোর মাকে। পাগলি! আমি কোনওদিন তো বকিনি তাই খুব অভিমান হয়েছিল। তবে তোকে আর কিছু বলবে না। তোর যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই কর।”
