কাজু ঘাবড়ে গেল। এটা কী হল? কাকিমা এটা জানল কী করে?
কাকিমা বলল, “তুমি এটা ঘোরতর অন্যায় করেছ। কিছুদিন আগে আমি বাড়ি ছিলাম না, তুমি পেখমের সঙ্গে লোডশেডিং-এ আমাদের ছাদে গিয়ে বসেছিলে। এতটা বাড়াবাড়ি না করলেই কি নয়? আমাদের সমাজ আর তোমাদের সমাজ এক নয়। এটা বোঝো না?”
কাজু কী বলবে ভেবে পেল না। ও তাকিয়ে রইল শুধু।
কাকিমা বলল, “আমার মেয়ে, তাই আমাকেই তার ভালমন্দ দেখতে হবে। ভাল বিয়ের সম্বন্ধ আসছে ওর। আমি চাই না ওর বদনাম হোক। তুমি আর আমাদের বাড়িতে এসো না। পেখমের সঙ্গে আর বন্ধুত্ব রেখো না। বুঝলে? এই আমি বলে দিলাম। আশা করি ভদ্রলোকের ছেলে তুমি, আমার কথা রাখবে!”
বন্দুকের গুলির মতো কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে কাকিমা চলে গেলেও কাজু নড়তে পারল না। দুপুরের মফস্সল ওর সামনে টলমল করতে লাগল। মাথার ওপরের আকাশটা যেন একবাটি গরম ডালের মতো ফুটছে! শীতের শহরতলি থেকে শিরশিরে হাওয়া যেন তার চাদর গুটিয়ে নিয়েছে ক্রমশ! যেন আর কিছু নেই চারপাশে! শুধু একখণ্ড নির্জন মৃত নগরের পথে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাজু! পেখমের সামনে ও আর যাবে না? পেখমের বিয়ে হয়ে যাবে? ও অন্য কারও হয়ে যাবে? এও সম্ভব! পেখম আছে বলেই তো ওর এই চারপাশের দম বন্ধ করা পৃথিবীটা তুচ্ছ! আর পেখম না থাকলে তো সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে যাবে!
কাজু এদিক-ওদিক তাকাল। কাউকেই যেন ঠিক চিনতে পারছে না ও। শুধু লোকজনের ভেতর থেকে ওর দিকে এগিয়ে আসা ঝিকুদাকে চিনতে পারল।
ঝিকুদা মাথা নাড়তে-নাড়তে কাজুর পাশ দিয়ে যেতে-যেতে ওর দিকে তাকাল একবার। তারপর ফিক করে একটু হেসে দিয়ে বলল, “বিলকিস! সব শালা বিলকিস!”
.
১১. নোঈ
বেসিনের কলটা খুলে চোখেমুখে ভাল করে জল দিল নোঈ। মাথাটা ঝাঁ-ঝাঁ করছে! এভাবে যে জয়ের সামনে পড়ে যাবে, ভাবতে পারেনি ও। জীবনে যা চায় না সেটাই কেন এসে পড়ে ওর সামনে? মনেপ্রাণে তো চেয়েছিল যে, জয়ের সামনে যেন ওকে পড়তে না হয় আর কোনওদিন! কিন্তু ঠিক সেটাই হল! জয় যে এই অফিসেই চাকরি করছে, সেটা তো আর জানত না ও। জয় বলেনি। কিন্তু সেভাবে দেখতে হলে জয় কিছুই বলেনি ওকে। কোনওদিনই কিছু বলেনি। নোঈই যা খবর নেওয়ার নিয়েছে। যা উতলা হওয়ার হয়েছে। কষ্ট পাওয়ার পেয়েছে। জয় সেসব খুব একটা পাত্তা দেয়নি। সেই কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকেই এমন। জয় যে কী চায়, কাকে চায়, সেটা জয় নিজেই জানে না। কলেজে পড়ার সময়ে ওর চেয়ে চার বছরের বড় এক মহিলার সঙ্গে জয়ের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু সেটাও সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে জয় আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেনি। বা করলেও সেটা জানতে পারেনি নোঈ।
কলেজের প্রথম দিন থেকে নোঈর ভাল লাগত জয়কে। মানে কিছু-কিছু জিনিস হয় না, মানুষ বোঝে যে এতে বিপদ বাড়বে কিন্তু তাও এড়াতে পারে না? এটাও সেরকমই ছিল। অনেকটা মাধ্যাকর্ষণ বলের মতো। কিন্তু দীর্ঘদিন সেটা জয়কে জানতে দেয়নি ও। শুধু সংগ্রহ করে গিয়েছে। জয়ের দেওয়া লজেন্সের র্যাপার, জ়েরক্সের বিল, ফেরত নিতে ভুলে যাওয়া ক্ষয়ে যাওয়া উড পেন্সিল, রাবার ব্যান্ড, বাসের টিকিট, খাতার লেখার লুজ় পৃষ্ঠা, আরও কত কী! ওই যে দশ টাকার নোট! ওটাও তো জয়েরই দেওয়া।
কিন্তু সেসব পেছনে ফেলে এবার এগিয়ে যেতে চায় নোঈ। নতুন করে দাঁড়াতে চায় জীবনে! কিন্তু পারছে কই? এখানে জয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা কি খুব জরুরি ছিল?
আয়নায় নিজের দিকে তাকাল নোঈ। ফরসা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে! কপালে অনুস্বর-এর মতো করে আঁকা টিপটা জলের ঝাপটায় মুছে গিয়েছে কিছুটা। চোখদুটোও লাল হয়েছে বেশ! নোঈ বুঝতে পারছে শরীর বেয়ে একটা কান্না উঠে আসার চেষ্টা করছে!
নোঈর মনে হয় কান্না যেন কোনও পর্বতারোহী। শরীরের অদৃশ্য কোটর থেকে তুষার-কুড়ুল, কাঁটাওয়ালা জুতো শরীরে গেঁথে উঠে আসে চোখের কাছে। এই বেসিনের সামনে দাঁড়িয়েও নোঈ বুঝতে পারল অদৃশ্য কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে সেই মানুষটি। নিজের শরীরে তার কাঁটাওয়ালা জুতো, বরফের কুড়ুলের আঘাত বুঝতে পারল।
নোঈ চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত করল। না, এখানে আর কান্নাকাটি করা যাবে না। খুব বাজে একটা ব্যাপার হয়ে যাবে।
ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে নিজের মুখটা ভাল করে মুছল নোঈ। পাশে রাখা চশমাটা পরল। তারপর পেছন ফিরে বেরিয়ে এল লু থেকে।
পার্ক স্ট্রিটের এই অফিসটা বিজ্ঞাপনের। ওদের কোম্পানির কিছু বিজ্ঞাপনের কাজ এই প্রোমোট নামে কোম্পানিটিকে দেওয়া হয়েছে! সোদপুরের কাছে একটি আর বারাসতের কাছে দুটি, মোট তিনটে হাউজ়িং প্রোজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু শুধু বাড়িঘর তৈরি করলেই তো হবে না, তার সঙ্গে বিজ্ঞাপন দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ!
অফিসে আপন এই কাজটা দেখছে। নোঈকে আপনই পাঠিয়েছে এখানে। আসলে প্রোমোট-এর লোকজন বলেছিল, ওরাই গিয়ে দিয়ে আসবে কিছু পেপার। কিন্তু আপন বারণ করেছে। বলেছে ওদের অফিস থেকেই লোক যাবে।
নোঈকে আপন বলেছিল, “তুমি পেপারগুলো নিয়ে আসবে। সঙ্গে ওদের মার্কেটিং-এ যে-ছেলেটা আছে, তাকে বলবে আমার সঙ্গে দেখা করতে। ওটা কিন্তু ইমপর্ট্যান্ট। কাজ নেওয়ার সময় এসে ‘স্যার’, ‘স্যার’ করছিল, এখন একে-ওকে পাঠিয়ে পাশ কাটানোর ধান্দা। বলবে আপ্রুভালটা আমি দেব। ওই ছেলেটি যেন এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়।”
