এখন তেমনই কাজুদের দেখেই মানুষটা রেগে গেল। হাতের আধখাওয়া চায়ের গেলাসটা এমন ঠক করে টেবিলে রাখল যে, বাকি চা-টা চলকে পড়ে গেল টেবিলে!
কাজু একটু ঘাবড়ে গেল।
বিমল স্থান-কাল-পাত্র ভুলে চিৎকার করে উঠল, “শুয়ার, তুই হিরো হয়েছিস? তোকে বলেছি না, যে যাবি না গোপেনের কাছে। সেখানে গিয়েছিলি কেন তুই?”
কাজু থমকে গেল! দেখল সতুও ওর দিকে কেমন একটা চোখে তাকিয়ে রয়েছে!
কাজু সময় নিল একটু। এখানে মাথাগরম করলে বা ঘাবড়ে গেলে হবে না।
ও বলল, “আমি তো এমনি-এমনি যাইনি বিমলদা। আপনি বলেছেন যে, আপনি জুটমিলের ওই কাজের ঝামেলার ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন না। মালিক যদি মিল লকআউট করে দেয়, তারপর আপনি আন্দোলনে যাবেন। কিন্তু লক আউট করে দেওয়ার পর আর কতদিন খালি পেটে ওয়ার্কাররা আন্দোলন করবে? কতবার আর ওদের ওপর দিয়ে আমরা আমাদের পার্টির মাহাত্ম্য বোঝাব? আমি চাই শ্রমিকদের যাতে সুরাহা হয়। গোপেনদা যদি মালিককে বুঝিয়ে শ্রমিকদের ইনসেনটিভটা দেখে বা অন্তত কাজের কোথায় প্রবলেম হচ্ছে, কোথায় প্রোডাকশন মার খাচ্ছে, সেটা নিয়ে যদি শ্রমিকদের সঙ্গে বসে একবার! তাই… এ ছাড়া গোপেনদার সঙ্গে তো দেখা হয়নি আমার। তা হলে? এত রাগ করার কী আছে! পার্টি করছি তো মানুষের হকটা তাদের দেওয়ার জন্য। সেটা যদি দেওয়া যায় সেটাই তো আসল!”
“গান্ডু তুই? নাকি গোপেনের এজেন্ট?” বিমলদা দাঁতে দাঁত ঘষল, “এটা বুঝিস না যে, প্রবলেমটা যদি গোপেন সলভ করে দেয়, তা হলে আমাদের পার্টির কী হাল হবে? মাসকয়েক বাদে মজদুর ইউনিয়নের ভোট। আর কেউ আমাদের ভোট দেবে? আর গোপেনের সঙ্গে মালিকের ভালই আঁতাত আছে। ওরা যদি ইউনিয়নের দখল নেয়, তা হলে কী ভেবেছিস, শ্রমিকদের খুব সুরাহা হবে? ছাগল তুই? এমন দাড়ি রেখে কলির কেষ্ট সেজে ঘুরে কচি মেয়েদের মাথা আর বুক খেয়ে বেড়াচ্ছিস বেড়া, আমাদের পার্টির পেছনে কাঠি করতে এলে কিন্তু মেরে রেখে দেব একদম!”
“মানে?” কাজুর মাথায় আচমকা রক্ত চলকে উঠল, “কী বলছেন এসব? এমন নোংরা কথা বলছেন কেন?”
কাজু দেখল বিমলদার চিৎকারে আশপাশের টেবল থেকে সবাই ঘুরে তাকাচ্ছে! কী লজ্জার ব্যাপার!
“বেশ করেছি, বলেছি!” বিমলদা চেঁচাল, “খুব র্যালা নিয়ে ঘোরা হচ্ছে, না? রক্ত দিয়ে এই পার্টিকে সোনাঝুরিতে এই জায়গায় নিয়ে এসেছি আমি। তুমি হিরো সাজবে বলে সেটাকে আমি নষ্ট করব ভেবেছ? নাকি আমায় ল্যাং মেরে নিজে আমার জায়গাটা নিবি? কী ভেবেছিস, এই সব কেতাবি ঢ্যামনামি করে লোকের সামনে ভাল হবি? নেতা হবি? শালা, পাছায় লাথ মেরে তোকে বের করে দেব পার্টি থেকে!”
কাজু চোয়াল শক্ত করে বলল, “ইতরের মতো কথা বলবেন না। পার্টি কারও সম্পত্তি নয়। মানুষের যাতে ভাল হয় আমি সেটাই করব। তাতে পার্টির হাইকম্যান্ড আমায় কিছু বললে তাদের উত্তর আমি দেব। আপনার খেউড়কে আমি পাত্তা দিচ্ছি না।”
বিমলদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “শালা, খুব তেল হয়েছে, না? বিপ্লবী হবে? যদি আর-একবার তুই গোপেনের কাছে গিয়েছিস তো পার্টি থেকে তোকে লাথ মেরে বের করে দেব হারামজাদা!”
কাজু চোয়াল শক্ত করে একবার বিমলদাকে দেখল, আর-একবার তাকাল সতুর দিকে। দেখল, সতু মাথা নিচু করে একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কাজু আর না-দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এল দোকান থেকে। দোকানের বাইরে সাইকেল নিয়ে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিজন। পরিতোষ নেই। নিশ্চয় চলে গিয়েছে।
কাজুর মাথা দিয়ে মনে হল আগুন বেরোচ্ছে! আরে, ও কি আর সাধ করে গিয়েছিল নাকি গোপেনদার কাছে?
এই বিমলদাই তো বলেছিল, “এখন এসব করা যাবে না। আমরা আবেদন-নিবেদন করতে যাব কেন? আমরা আন্দোলন করব। কেন শুধু-শুধু মালিকের জুতো চাটতে যাব? দিক না বন্ধ করে মিল! আন্দোলনের জোর আমরা দেখিয়ে দেব। মালিকের কাছে গিয়ে মাথা নত আমি করতে পারব না।”
‘আমি’! এই আমিটাতেই আপত্তি কাজুর। যেখানে মানুষের হয়ে কাজ করার কথা সেখানে ‘আমি’ আসবে কেন? এত ইগো কীসের? কীসের এত অহং?
কাজু চোয়াল শক্ত করল। গোপেনদা কিছুদিনের জন্য দিল্লি গিয়েছে। সেখান থেকে ফিরলে ও আবার যাবে। এতজন শ্রমিকের রুজির ব্যাপার! সেখানে সামনের ইউনিয়নের ভোটে কে কী সুবিধে নেবে, সেটা পরে দেখা যাবে। আর বিমলদা যদি ওকে পার্টি থেকে বের করার ষড়যন্ত্র করে, তবে ও নিজেই পার্টি থেকে বেরিয়ে যাবে। মানুষের হয়ে কাজ করতে কোনও পার্টি না হলেও ওর চলবে!
“কাজু, কাজু! এই কাজু…” আচমকা একটা ডাকে ও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মুখ তুলে দেখল কাকিমা! মানে পেখমের মা! কেন কে জানে কাজুর শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল! কাকিমা তো এভাবে ওকে কখনও রাস্তায় ডাকে না! তা হলে!
কাকিমা কাছে এসে বলল, “কী হল? এতবার ডাকছি, শুনছ না যে বড়!”
“ডাকছেন?” কাজু কী বলবে বুঝতে পারল না। আসলে মাথা এমন গুলিয়ে আছে যে… ও খুব অন্যমনস্ক ছিল। তাই শুনতে পায়নি।
“হ্যাঁ,” কাকিমার গলাটা বেশ গম্ভীর!
কাজু এবার ভাল করে দেখল। কাকিমার হাতে একটা ঠোঙা। কাকিমা তো সচরাচর বাজারে বেরোন না!
“কিছু বলবেন?” কাজু নিজের গলাটা যথাসাধ্য নরম করার চেষ্টা করল।
কাকিমা কোনওরকম ভণিতা না করে বলল, “তুমি হস্টেলের পেছনের মাঠে পেখমকে ডেকে পাঠিয়েছিলে?”
