কাজু ঘাসে মোড়া মাটিতে বসে দেখছিল পেখম চলে যাচ্ছে। লাল-সাদা কোয়ার্টার্সের ফাঁক দিয়ে মাথা নিচু করে ওই চলে যাচ্ছে পেখম। বিকেলের আলো আকাশ থেকে চুঁইয়ে নেমে আসছে আর যেন ক্রমশ সেই আলোর মধ্যে মিশে যাচ্ছে ও!
আর তিতির উড়ছিল! বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে সারা মফস্সল জুড়ে তিতির উড়ছিল যেন! কাজু বুঝতে পারছিল, এই মেয়েটি ছাড়া ওর জীবনের আর কোনও অর্থ নেই। ভাবছিল পেখম যদি চলে যায়, তা হলে কি ওকেও ওরকম ঝিকুদার মতো রাস্তার পাশে বসে সব কিছুর এককথায় উত্তর দিতে হবে? বলতে হবে, “বিলকিস!”
“কী রে কী দেখছিস? ঝিকুদা বৈজয়ন্তীমালা নাকি?”
সতুর কথায় মুখ ফিরিয়ে তাকাল কাজু। বিড়িটা দু’আঙুলে ধরে মুখ তুলে ধোঁয়া ছাড়ল ও। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল, “এই নে তোর মৌরি লজেন।”
মৌরি লজেন্স হাতে নিয়ে হাসল কাজু। বলল, “মানুষটাকে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয় জানিস সতু। ভেবে দেখ, লোকটার কেউ নেই! কোথাও যাওয়ার নেই, ওর কোথাও থেকে ফেরার নেই। কেউ আসবে না ওর কাছে। ও যে কারও কাছে যাবে, তেমন কেউ নেই! সারা জীবন এই স্টেশন রোড, সোনাঝুরির বড় রাস্তা, গঙ্গার পাশের চৌধুরীদের পোড়োবাড়ির মধ্যে বসে থেকে থেকে সব শেষ হয়ে যাবে ওর!”
“শালা,” সতু ছিক করে থুতু ফেলল। তারপর বলল, “আলট্রা-ন্যাকা হয়ে যাচ্ছিস দিন-কে-দিন! শালা, তোদের এই যে লাউগাছের মতো ন্যাতপেতে মন, এটা এই যুদ্ধের বাজারে মেনটেন করিস কী করে?”
“বা রে, লোকটাকে দেখে কষ্ট হবে না?” অবাক হল কাজু।
“ওর তো বোধ নেই! খিদে পেলে খায়, হাগু পেলে হাগে, ঘুম পেলে ঘুমোয়। যে-কোনও প্রাণীর মতো হয়ে গিয়েছে! কিন্তু যেসব মানুষ সব বোধ নিয়েও দিনের পর দিন কষ্ট করছে, নিজের বাচ্চাদের মুখে ভাত তুলে দিতে পারছে না, তাদের কথা ভাব। জোতদার, দালাল, পুঁজির পুঁজ জমে যাওয়া, হাতে গোনা কিছু মানুষ, যাদের জন্য সৎ, গরিব মানুষগুলো সারা জীবন সার্ফদের মতো অত্যাচারিত হয়ে গেল, তাদের কথা ভেবে তোর মনখারাপ হয় না?” সতু স্ট্রিট কর্নার করার ঢঙে বলল, “আমি তো গিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গে। দেখে এলাম! ওদিকে ভিয়েতনামে যে-রেজ়িস্ট্যান্স চলছে, তেমন একটা যদি এখানে আমরা গড়ে তুলতে পারি, শালাদের মুতিয়ে ছেড়ে দেব! তোর ওই ন্যাকা প্রেম আর পাগলদের দেখে আহা-উহু-ই শালা বাঙালিদের শেষ করে দিল!”
কাজু কিছু বলতে গিয়েছিল, কিন্তু পারল না। বিজন আর পরিতোষ সাইকেল করে এসে থামল ওদের সামনে।
বিজন বলল, “আরে, তোমরা এখানে কী করছ? বিমলদা তোমাদের জন্য ওয়েট করছে তো!”
কাজু, বিজনের সাইকেলের সামনে বসা ছেলেটাকে দেখল। পরিতোষ। প্রায় বিজনের মতোই বয়স। ভাল ছেলে! ক্লাসে ফার্স্ট হয়। সোনাঝুরিতে ওর নাম আছে। কিন্তু বিজনের সঙ্গে ছেলেটা ঘুরছে কেন? বিজনটা নিজে লেখাপড়া করে না। এই বয়স থেকেই খালি পার্টি আর পার্টি! সেখানে পরিতোষের মতো ছেলেরা কেন ঘুরবে ওদের সঙ্গে?
কাজু এই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু আজ এত বিরক্ত লাগল যে বলল, “পরিতোষ, তুই কী করছিস বিজনের সঙ্গে?”
পরিতোষ ছেলেটা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল! আসলে সোনাঝুরিতে কাজুর খুব নামডাক। সেখানে সেই মানুষটা এমন করে ওর সঙ্গে নিজে থেকে কথা বলছে বলেই বোধহয় কিছুটা ঘাবড়ে গেল।
পরিতোষ বলল, “না, মানে… ইয়ে…”
“আরে, আমি বলছি,” বিজন বলল, “আমি ওকে বলেছি আমার সঙ্গে বিমলদার কাছে যেতে। সারাক্ষণ বই মুখে বসে থাকে! আরে বাবা দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কি কম আছে? যা কম আছে, তা হল প্রকৃত মানুষ। সেটা হতে হবে না? আমি ওকে বলেছি ট্রটস্কি পড়তে! গোর্কি পড়তে! তুমি বলো কাজুদা, গোর্কি গ্রেটেস্ট রাশিয়ান নভেলিস্ট না? ওর সমান আর কেউ আছে?”
কাজুর মনে হল, বিজনের কানটা পেঁচিয়ে ধরে। এত বাড়তি কথা বলে ছেলেটা! আর পরিতোষের সামনে জ্ঞান ফলাচ্ছে!
কাজু বলল, “আলেকজান্দার পুশকিন কি বানের জলে ভেসে এসেছে?”
“পুশ…” ঘাবড়ে গেল বিজন। পরিতোষের সামনে বিদ্যে জাহির করছিল ভালই, কিন্তু এই নামটা আর কমন পড়েনি!
কাজু বলেছিল, “ওকে মডার্ন রাশিয়ান লিটারেচারের জনক বলা হয়। কেন বলা হয় বড় হয়ে পড়বি। বুঝলি?”
পরিতোষ বলল, “পুশকিন! অদ্ভুত নাম তো!”
বিজন চোখ ঘুরিয়ে বলল, “নে পরিতোষ, তোর নামের খাতায় লিখে রাখ নামটা। পরে বাচ্চা হলে নাম রাখিস! হুঁ! পুশকিন! বিমলদা বলেছে, গোর্কি বেস্ট!”
সতু বলল, “শালা, মারব কানের গোড়ায়। ডেঁপোমি সব সময়।”
বিজন বলল, “সে মেরো পরে। আগে চলো চক্রবর্তীর চায়ের দোকানে। বিমলদা অপেক্ষা করছে।”
রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটা বেশ বড়। চক্রবর্তীকাকু আর কাকুর দুই ছেলে সারাদিন চা, ডিম টোস্ট, ভেজিটেবল চপ, ঘুঘনি, এসব বানিয়ে যায়। সোনাঝুরির কফি হাউস এই দোকানটা।
বিমলদাকে যদি কেউ পার্টি অফিসে না পায়, তা হলে এই দোকানটাতে পাবেই। বিমলদা মানুষটা বিয়ে করেনি। সারাক্ষণ পার্টির কাজে ঘোরে। একটা কাপড়ের ঝোলা সারাক্ষণ কাঁধে থাকে। তাতে রেড বুক থেকে সহজ হোমিওপ্যাথি শিক্ষা, সব থাকে! ঝোলাটা সব সময় হরিণ গিলে ফেলা অজগরের মতো ফুলে থাকে! সোনাঝুরির সবাই জানে বিমলদার মতো সন্ন্যাসী হয় না। কিন্তু কাছের লোকজন জানে বিমলদা কতটা বদমেজাজি মানুষ। কখন যে রেগে যাবে, কেউ জানে না।
